কাগজে-কলমে শেয়ারের মালিক একজন, কিন্তু কোম্পানির প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ অন্য কারও হাতে—এমন গোপন মালিকানা ঠেকাতে ৩৫ বছর পর কোম্পানি আইন সংশোধন করতে যাচ্ছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। খসড়ায় কোম্পানির প্রকৃত মালিকের নাম ও পরিচয় প্রকাশ বাধ্যতামূলক করার পাশাপাশি জরিমানা, ডিজিটাল নিবন্ধন ও নথি সংরক্ষণের বিধান রাখা হয়েছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবিত ‘কোম্পানি (তৃতীয় সংশোধন) আইন, ২০২৬’ খসড়ায় নতুন ৩৪(ক) ধারা যুক্ত করা হচ্ছে। এতে বলা হচ্ছে, শুধু নিবন্ধিত শেয়ারধারী নন, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কোম্পানির মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণকারী ব্যক্তিকেও প্রকৃত মালিক হিসেবে গণ্য করা হবে। মালিকানা পরিবর্তন হলে ৩০ দিনের মধ্যে নতুন ঘোষণা দিতে হবে এবং নির্ধারিত ফরমে তথ্য নিবন্ধকের (আরজেএসসি) কাছে জমা দিতে হবে। ঘোষণা না দিলে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা, আর ব্যর্থতা অব্যাহত থাকলে প্রতিদিন ১০০ টাকা করে বাড়তি জরিমানা গুনতে হবে।
খসড়াটি এখন চূড়ান্ত হওয়ার পর্যায়ে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের সভাপতিত্বে আন্তমন্ত্রণালয়ের বৈঠক হওয়ার কথা আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে। এরপর খসড়াটি মন্ত্রিসভায় পাঠানো হবে। মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর আইন মন্ত্রণালয়ের যাচাই শেষে এটি সংসদে উত্থাপন করা হবে। এর আগে গত ৭ সেপ্টেম্বর খসড়াটি নিয়ে অংশীজনদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা করেছে মন্ত্রণালয়।
সংশোধনের পেছনে সাম্প্রতিক কিছু বড় ঘটনা রয়েছে। আন্তর্জাতিক গেটওয়ে কোম্পানি ইন্টারন্যাশনাল ভয়েস কে টেল লিমিটেডের প্রায় ১২৬ কোটি টাকার টেলিযোগাযোগ বিল বকেয়া ছিল। কোম্পানির মালিকানা হস্তান্তর দেখানো হয় এমন তিন ব্যক্তির নামে, যাঁরা বাস্তবে এ বিষয়ে কিছুই জানতেন না। ২০২৫ সালের ১৮ মার্চ হাইকোর্ট বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন ও পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগকে ৯০ দিনের মধ্যে তদন্ত করে প্রকৃত মালিককে খুঁজে বের করার নির্দেশ দেন। তদন্তে উঠে আসে, ঘটনার নেপথ্যে ছিলেন আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমান ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা।
একইভাবে এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলম ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে সরাসরি এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে শেয়ার ধারণ করেছিলেন। ইসলামী ব্যাংকে তাঁদের সম্মিলিত শেয়ার ছিল প্রায় ৩০ শতাংশ এবং সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকে প্রায় ২২ শতাংশ। ব্যাংকগুলোর পর্ষদে এস আলমের জামাতা বেলাল আহমেদসহ পরিবারের একাধিক সদস্য ছিলেন। নামে-বেনামে নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর ব্যাংকগুলো থেকে বিপুল অঙ্কের ঋণও বের করা হয়, যা এখনো উদ্ধার করা যায়নি।
খসড়ায় বলা হয়েছে, প্রকৃত মালিকানা-সংক্রান্ত তথ্য আইনানুগ অনুরোধে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ), দুর্নীতি দমন কমিশন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং বিদেশি কর্তৃপক্ষকে দিতে পারবে কোম্পানিগুলো। গোপনীয়তা বা কোম্পানির সম্মতির অজুহাতে এই তথ্য দেওয়া আটকানো যাবে না। তথ্য আদান-প্রদানের জন্য নিরাপদ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরির প্রস্তাবও আছে। বিএফআইইউর সুপারিশের ভিত্তিতে এই পরিবর্তনগুলো করা হচ্ছে বলে খসড়ায় উল্লেখ আছে।
আইন সহজ করার অংশ হিসেবে সংঘস্মারক (মেমোর্যান্ডাম অব অ্যাসোসিয়েশন) সংশোধনের অনুমোদন আদালতের বদলে আরজেএসসির নিবন্ধকের কাছে নেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। নিবন্ধকের সিদ্ধান্তে কেউ সংক্ষুব্ধ হলে নির্ধারিত মাশুল দিয়ে ৩০ দিনের মধ্যে সরকারের কাছে আপিল করতে পারবেন। শেয়ার হস্তান্তরে সশরীরে স্বাক্ষরের পাশাপাশি ইলেকট্রনিক যাচাইয়ের সুযোগ, বিদেশে অবস্থানকারীদের জন্য দূতাবাসের অনুমোদিত কর্মকর্তার মাধ্যমে নথি সত্যায়নের বিধানও রাখা হচ্ছে। নথি সংরক্ষণের সময় বাড়ানো হচ্ছে; বিলুপ্ত কোম্পানির নথি তিন বছরের বদলে পাঁচ বছর রাখতে হবে।
এক ব্যক্তির কোম্পানির ক্ষেত্রে ন্যূনতম পরিশোধিত মূলধন ২৫ লাখ টাকা থেকে কমিয়ে ৫ লাখ টাকা করার প্রস্তাব আছে। সর্বোচ্চ পরিশোধিত মূলধন ৫ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫০ কোটি টাকা করা হচ্ছে। ৫০ কোটি টাকার বেশি পরিশোধিত মূলধন ও ১০০ কোটি টাকার বেশি বার্ষিক লেনদেন থাকলে সেই এক ব্যক্তির কোম্পানিকে প্রাইভেট বা পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিতে রূপান্তর করতে হতে পারে। তালিকাভুক্ত পাবলিক কোম্পানি এবং ৫০ কোটি টাকার বেশি পরিশোধিত মূলধন থাকা কোম্পানিকে যোগ্য কোম্পানি সচিব নিয়োগ ও অন্তত তিন সদস্যের করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা কমিটি গঠন করতে হবে, যার একজনা স্বতন্ত্র পরিচালক।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক শীর্ষ কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেছেন, আইন সংশোধন হলে কাগজে-কলমে কোম্পানির শেয়ারের মালিক একজন আর বাস্তবে অন্যজন—এমন পরিস্থিতি আর থাকবে না। প্রকৃত মালিকের নাম, পরিচয় ও প্রয়োজনীয় তথ্য প্রকাশ করতে হবে। অন্যদিকে এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক ফজলুল হক বলেছেন, কোম্পানি আইন যুগোপযোগী করা আরও আগেই দরকার ছিল। তিনি বলেন, ‘এক যুগের বেশি সময় ধরে এ নিয়ে কাজ চলছে। তবে এবার যে গতিতে এগোচ্ছে, আইন সংশোধন হবেই।’ তাঁর মতে, আইনের সঠিক প্রয়োগে আরজেএসসিকে শক্তিশালী করা জরুরি এবং শেয়ার হস্তান্তরসহ সব কাজ অনলাইনে হওয়া উচিত।
এখনো কিছু বিষয় স্পষ্ট নয়। ‘নিয়ন্ত্রণ’ বলতে ঠিক কী বোঝানো হবে—শেয়ারের নির্দিষ্ট শতাংশ, পর্ষদ নিয়ন্ত্রণ, নাকি চুক্তিভিত্তিক ক্ষমতা—তা খসড়ায় কতটা বিস্তারিত ব্যাখ্যা করা হয়েছে, তা প্রকাশ্যে পুরো খসড়া না থাকায় জানা যাচ্ছে না। শাস্তি কতটা নিরুৎসাহিতকারী হবে এবং আরজেএসসি এই তথ্য যাচাই ও প্রয়োগের সক্ষমতা কতটা পাবে, তাও পরিষ্কার নয়। বিদেশি ও বহুস্তরীয় শেল কোম্পানির ক্ষেত্রে তথ্য কীভাবে মিলিয়ে দেখা হবে, কিংবা আগের ঘটনাগুলোর দায়ভার নিয়ে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না, সে প্রশ্নের উত্তরও এখনো নেই।
সংশোধনী আইন পাস হলে প্রতিটি কোম্পানিকে প্রকৃত মালিকানার হালনাগাদ নথি রাখতে হবে এবং পরিবর্তনের ৩০ দিনের মধ্যে তা নিবন্ধকের কাছে জানাতে হবে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, গঠনমূলক খসড়া হলে স্বচ্ছতা বাড়বে এবং ব্যাংকঋণ, বিদেশি বিনিয়োগ ও শেয়ার লেনদেনে ঝুঁকি কমবে। তবে ছোট উদ্যোক্তাদের ওপর অতিরিক্ত কাগজপত্রের বোঝা না পড়ে সে দিকেও নজর রাখতে হবে। পরবর্তী ধাপ হলো আন্তমন্ত্রণালয় বৈঠক, মন্ত্রিসভার অনুমোদন, আইন মন্ত্রণালয়ের যাচাই এবং সংসদে উত্থাপন। এই ধাপগুলো কত দ্রুত শেষ হয়, তার ওপরই নির্ভর করছে কবে নতুন আইন কার্যকর হবে।



