ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা রোববারের দ্বিতীয় দফা ভোটে বিজয়ী হয়েছেন। ২৫ অক্টোবর অনুষ্ঠিত রানঅফে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বী সিনেটর ফ্লাভিও বোলসোনারোকে হারিয়েছেন। দেশের নির্বাচনী আদালত জানিয়েছে, শতভাগ ভোট গণনা শেষে লুলার এগিয়ে থাকার ব্যবধান আর ঘোচানোর মতো অবস্থায় নেই প্রতিদ্বন্দ্বী। আল জাজিরার লাইভ প্রতিবেদন অনুযায়ী, লুলা পেয়েছেন ৫১ শতাংশের বেশি ভোট, ফ্লাভিও বোলসোনারো পেয়েছেন ৪৮ শতাংশ।

নির্বাচনের দিন ভোট গ্রহণের সময় শেষ হওয়ার পর আরও দুই ঘণ্টা বাড়ানোর নির্দেশ দেন সুপ্রিম কোর্টের একজন বিচারপতি। এ সিদ্ধান্তের পর ভোটকেন্দ্রে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হয়। বার্তা সংস্থা এপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই নির্দেশের বিরুদ্ধে ফ্লাভিও বোলসোনারো আইনি পদক্ষেপ নিতে পারেন। ফলে ফল ঘোষণার পরও নির্বাচনের চূড়ান্ত বৈধতা নিয়ে আইনি বিতর্ক তৈরি হতে পারে।

ফ্লাভিও বোলসোনারো সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বোলসোনারোর ছেলে এবং সিনেটর। প্রথম দফার ভোটে তিনি এগিয়ে ছিলেন। এপির হিসাব অনুযায়ী, প্রথম দফায় ফ্লাভিও পেয়েছিলেন ৪৭ শতাংশ, লুলা পেয়েছিলেন ৪৫ শতাংশ; ভোটের ব্যবধান ছিল প্রায় ২২ লাখ। ১৯৮৫ সালে ব্রাজিলে সামরিক শাসন শেষ হওয়ার পর এই প্রথমবারের মতো প্রথম দফায় দ্বিতীয় স্থানে থাকা প্রার্থী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী হলেন।

লুলার রাজনৈতিক জীবন শুরু হয় শ্রমিক আন্দোলন থেকে। সত্তরের দশকে তিনি ট্রেড ইউনিয়নের নেতা ছিলেন। পরে ওয়ার্কার্স পার্টি গঠনে যুক্ত হন এবং দলটির প্রার্থী হিসেবে কয়েকবার নির্বাচনে লড়েন। ২০০২ সালে প্রথমবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন, ২০০৬ সালে পুনর্নির্বাচিত হন। ২০১০ সালে তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্য দিলমা রুসেফ প্রেসিডেন্ট হন। ২০১৬ সালে অভিসংশনের মুখে রুসেফের ক্ষমতা শেষ হয়।

দুর্নীতির মামলায় ২০১৮ সালে লুলার কারাদণ্ড হয় এবং তিনি ৫৮০ দিন জেলে থাকেন। পরে সুপ্রিম কোর্ট তাঁর সাজা বাতিল করে। ২০২২ সালে তিনি জাইর বোলসোনারোকে অল্প ব্যবধানে হারিয়ে আবার ক্ষমতায় ফিরেন। এবারের জয় তাঁর চতুর্থ মেয়াদ, যা পরপর নয়। তাঁর নতুন মেয়াদ শুরু হবে ২০২৭ সালের ৫ জানুয়ারি।

এই ফলাফল ব্রাজিলের বাইরেও গুরুত্বপূর্ণ। লাতিন আমেরিকার সবচেয়ে বড় অর্থনীতির দেশ ব্রাজিল, যার বার্ষিক জিডিপি প্রায় ২ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ডলার। এপির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, লুলার জয় লাতিন আমেরিকায় ডানপন্থী প্রার্থীদের জয়ের ধারাকে ব্যাহত করেছে এবং ওয়াশিংটনের চাপ ও শুল্কের মধ্যেও ব্রাজিলকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে কিছুটা দূরে রাখবে। মেক্সিকো ও ব্রাজিল—দুই দেশেই এখন বামপন্থী নেতৃত্ব থাকবে।

প্রথম দফায় পিছিয়ে পড়ার পর লুলা তাঁর প্রচারাভিযান নতুন করে সাজান। এপি জানিয়েছে, তিনি তরুণ ভোটারদের কাছে আবেদন জানান, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ রক্ষার বিষয়টি সামনে আনেন এবং নিজের উত্তরাধিকারকে প্রচারের কেন্দ্রে রাখেন। তিনি সতর্ক করেন, ফ্লাভিও বোলসোনারো প্রেসিডেন্ট হলে যুক্তরাষ্ট্র ব্রাজিলের ওপর আরও প্রভাব বিস্তার করতে পারবে।

ফল ঘোষণার সময় দুই প্রার্থীই তাঁদের সমর্থকদের উদ্দেশে বক্তব্য দেননি বলে এপির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সাও পাওলোর যে হোটেলে লুলা ভোট গণনা পর্যবেক্ষণ করছিলেন, সেখানে তাঁর সমর্থকরা জয় উদযাপন শুরু করেন। অন্যদিকে ভোট গ্রহণ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত এবং ফল ঘোষণার পর আইনি চ্যালেঞ্জের সম্ভাবনা নিয়ে রাজনৈতিক টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে।

এখনো কিছু বিষয় নিশ্চিত নয়। ফ্লাভিও বোলসোনারো আনুষ্ঠানিকভাবে ফলকে চ্যালেঞ্জ করেন কি না, তা স্পষ্ট নয়। নির্বাচনী আদালতের চূড়ান্ত সনদ কবে জারি হবে এবং আইনি প্রক্রিয়ায় ফল বদলানোর কোনো সুযোগ থাকবে কি না, তাও জানা যায়নি। এছাড়া নতুন পার্লামেন্টে দুটি পক্ষের শক্তি কেমন হবে, সে বিষয়ে এই প্রতিবেদনে বিস্তারিত তথ্য নেই।

পরবর্তী ধাপ হলো ২০২৭ সালের ৫ জানুয়ারি নতুন প্রেসিডেন্টের শপথ গ্রহণ। লুলার বয়স এখন ৮০ বছর; শিগগিরই তিনি ৮১ বছরে পা দেবেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, এটি তাঁর শেষ মেয়াদ হতে পারে। তবে ফল ঘোষণার পর আইনি বিতর্ক কতদূর গড়ায়, তার ওপর নির্ভর করবে আগামী সপ্তাহগুলোর রাজনৈতিক পরিস্থিতি।