ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠী শনিবার সৌদি আরবের তেল স্থাপনা ও কয়েকটি বিমানবন্দরে হামলার দাবি করেছে। একই দিন সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মক্কা ও মদিনার দিকে ছোড়া দুইটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করা হয়েছে এবং ধ্বংসাবশেষ মক্কার বাইরে ওয়াদি আল-মুগাম্মাসে পড়েছে। হুতি অবশ্য বলেছে, তারা পবিত্র দুই শহরকে লক্ষ্য করেনি।
হুতির সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি বলেছেন, রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দুই দফায়, দাম্মাম ও নাজরানের বিমানবন্দর, ইয়ানবুতে সৌদি আরামকোর একটি স্থাপনা, রাবিগের তেল শোধনাগার, অপরিশোধিত তেলের পাম্পিং স্টেশন এবং পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইন লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে।
সৌদি সিভিল ডিফেন্স এক্সে জানিয়েছে, মক্কা ও মদিনা অঞ্চলের দিকে দুইটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়। সেগুলো প্রতিহত করার পর ওয়াদি আল-মুগাম্মাসে ধ্বংসাবশেষ পড়ে। সংস্থাটি জানিয়েছে, মক্কা ও মদিনা অঞ্চলে ধ্বংসাবশেষ পড়ার খবর পেয়ে উদ্ধারকর্মীরা ঘটনাস্থলে গেছেন। তবে তেল স্থাপনা বা বিমানবন্দরে হামলার বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষ সরাসরি কিছু বলেনি।
হুতি মুখপাত্র সারি পবিত্র দুই শহর লক্ষ্য করার অভিযোগকে ‘বড় ও গুরুতর মিথ্যা’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, হুতির লক্ষ্য ছিল তিনটি সৌদি বিমানবন্দর, তেল অবকাঠামো ও একটি বিমানঘাঁটি। মক্কা ও মদিনা লক্ষ্য করার অভিযোগ দিয়ে সৌদি ‘ভুল তথ্য’ ছড়াচ্ছে বলেও তিনি দাবি করেন।
উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের মহাসচিব জাসেম মোহাম্মদ আলবুদাইউই হামলাগুলোকে ‘জঘন্য’ বলেছেন। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, এসব হামলা বেসামরিক মানুষের জীবন ও নিরাপত্তার প্রতি ‘প্রকাশ্য অবহেলা’ দেখায়। অন্যদিকে ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার বলেছে, হুতিরা আদেন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দুইটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। সরকারের ভাষ্যে এটি চলতি মাসে ওই বিমানবন্দরে চতুর্থ হামলা।
ইয়েমেনি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আদেনে কোস্ট গার্ডের সদর দপ্তর ও আরেকটি ভবনেও আঘাত হানা হয়েছে। হুতি দাবি করেছে, তারা আল-নাসর ক্যাম্প ও আদেনের নৌঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে। ইয়েমেনি সেনাবাহিনী বলেছে, শুক্রবার সানায় একটি ক্ষেপণাস্ত্র ত্রুটির কারণে একটি পরিবারের বাড়িতে পড়ে তিনজন নিহত হন। হুতির আল-মাসিরাহ টিভি অবশ্য দাবি করেছে, সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের হামলায় সানা ও হোদেইদায় কয়েকজন বেসামরিক লোক নিহত হয়েছেন। এই দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি এবং রিয়াদ এ বিষয়ে মন্তব্য করেনি।
২০২২ সালের যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার পর থেকে হুতি সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামো ও বিমানবন্দরে দূরপাল্লার হামলা চালিয়ে আসছে। গত ১০ অক্টোবর রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলায় কমপক্ষে ১২ জন নিহত ও ৩০০-র বেশি মানুষ আহত হন। সৌদি কর্তৃপক্ষের বরাতে হিন্দুস্তান টাইমস জানিয়েছে, এক দশকের বেশি সময়ের মধ্যে সৌদিতে এটি ছিল সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলা। ওই হামলার পর বিমানবন্দরের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। রবিবার থেকে টার্মিনাল ১ অভ্যন্তরীণ ও টার্মিনাল ২ আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের জন্য চালুর পরিকল্পনা করা হয়েছে।
হুতির মুখপাত্র রবিবারও রিয়াদ বিমানবন্দরকে ‘সামরিক লক্ষ্য’ বলে উল্লেখ করেছেন। এয়ারলাইনস, বিমানবন্দর কর্মী ও যাত্রীদের ওই বিমানবন্দর ব্যবহার না করার সতর্কতা দিয়েছেন তিনি। এয়ার ইন্ডিয়া শনিবার জানিয়েছে, ২৪ অক্টোবর বা তার আগে ইস্যু করা টিকিটের যাত্রীরা বিনামূল্যে তারিখ বদলাতে বা টাকা ফেরত নিতে পারবেন।
তবে তেল স্থাপনা বা বিমানবন্দরগুলো প্রকৃতপক্ষে আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে কি না, ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা কত এবং হতাহতের সংখ্যা কত—এসব এখনো নিশ্চিত নয়। সৌদি কর্তৃপক্ষ হুতির নির্দিষ্ট দাবিগুলোর বিষয়ে সরাসরি মন্তব্য করেনি। মক্কা ও মদিনা লক্ষ্য করার বিষয়ে দুই পক্ষের বক্তব্যও পরস্পরবিরোধী। স্বাধীনভাবে যাচাইয়ের সুযোগও সীমিত।
সৌদি আরব বাংলাদেশি কর্মী ও হজ ও উমরাহ যাত্রীদের অন্যতম বড় গন্তব্য। হামলার ধারা অব্যাহত থাকলে ও বিমান চলাচল ব্যাহত হলে হাজারো বাংলাদেশি যাত্রী ভোগান্তিতে পড়বেন, প্রবাসীদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়বে। বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়লে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় ও জ্বালানি খাতে ভর্তুকির ওপর চাপ পড়বে। পরবর্তী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় হামলার ধারা ও বিমানবন্দর চালু হওয়ার পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে পরিস্থিতি কতটা স্বাভাবিক হয়।



