জর্ডানের দক্ষিণে কারাক গভর্নরেটের হামুদ গ্রামে ২৩ অক্টোবর শুক্রবার বিকেলে একটি গ্রিক অর্থোডক্স গির্জায় জানাজার অনুষ্ঠানে গুলি চালিয়েছে অজ্ঞাত বন্দুকধারীরা। কর্তৃপক্ষের হিসাবে ঘটনায় সাতজন নিহত এবং অন্তত ৩৪ জন আহত হয়েছেন।

পাবলিক সিকিউরিটি ডিরেক্টরেটের প্রধান ওবায়দুল্লাহ আল-মায়তাহ সাংবাদিকদের বলেন, আহতদের মধ্যে ২৭ জন হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। তিনি জানান, দুজন বন্দুকধারীকে ধরতে অভিযান চলছে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম আল-মামলাকার খবরে বলা হয়েছে, একটি গাড়ি থেকে নেমে দুজন গুলি চালায় এবং পরে পালিয়ে যায়।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে বিবিসি জানিয়েছে, গুলির সময় গির্জায় ১৫০ থেকে ২০০ মানুষ ছিলেন। অনেকে ভয়ে বেঞ্চের নিচে আশ্রয় নেন, কেউ কেউ শিশুদের বুকে জড়িয়ে ধরে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। এক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, গুলি চলেছিল টানা ১০ থেকে ১৫ মিনিট; বন্দুকধারীরা গির্জা থেকে বেরিয়ে একটি পিকআপে করে গুলি করতে করতে পালায়।

বিবিসি যাচাই করা সিসিটিভি ফুটেজের বরাতে জানিয়েছে, তিনজন বন্দুকধারীকে রাস্তা থেকে গির্জার দিকে যেতে দেখা যায়। তাঁদের হাতে হাতবন্দুক ছিল। তবে হামলায় ঠিক কতজন অংশ নিয়েছিল, তা এখনো নিশ্চিত নয়।

নিহতের সংখ্যা নিয়ে প্রাথমিকভাবে বিভ্রান্তি দেখা যায়। প্রথমে সাতজনের কথা বলা হলেও সরকারের এক মুখপাত্র ছয়জনের কথা জানান; পরে কর্তৃপক্ষ আবার সাতজনের সংখ্যায় ফিরে আসে। আহতের সংখ্যাও সব সূত্রে এক নয়; আল-জাজিরা ও বিবিসি ৩৪ জনের কথা বলেছে, অন্য কিছু সংবাদমাধ্যম বেশি সংখ্যার কথা জানিয়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মাজেন আল-ফারায়া সাংবাদিক সম্মেলনে হামলাকে ‘সন্ত্রাসী’ বলে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, এটি জর্ডানে ‘নজিরবিহীন’ এবং যারা এটি করেছে তারা ‘মানবতার সঙ্গে কোনো সম্পর্ক রাখে না’। মন্ত্রী আরও বলেন, জর্ডানকে সন্ত্রাস ও সহিংসতার দিকে টেনে নেওয়া যাবে না।

জর্ডানের বাদশাহ দ্বিতীয় আবদুল্লাহ এক্সে দেওয়া এক বার্তায় বলেছেন, কর্তৃপক্ষ হামলাকারীদের ‘সর্বোচ্চ শাস্তি’ দেবে। তিনি বলেন, জর্ডানিদের রক্ত মূল্যবান এবং যারা দেশের বিরুদ্ধে হাত বাড়াবে তাদের বিরুদ্ধে ‘লোহার মুষ্টি’ ব্যবহার করা হবে।

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের মুখপাত্র স্তেফান দুজারিক হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, উপাসনালয়ে এবং জানাজা চলাকালীন এমন হামলা বিশেষভাবে ঘৃণ্য। সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও হামলার নিন্দা করেছে। লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন একে ‘জঘন্য সন্ত্রাসী হামলা’ বলে উল্লেখ করেছেন।

জর্ডানে খ্রিস্টানরা সংখ্যালঘু; প্রায় এক কোটি ১৫ লাখ মানুষের দেশে তাদের সংখ্যা প্রায় তিন লাখ। কারাকেও উল্লেখযোগ্য খ্রিস্টান জনগোষ্ঠী বাস করে। দেশটিতে এ ধরনের হামলা বিরল হলেও ২০১৬ সালে কারাকের ক্রুসেড যুগের দুর্গে আইএসআইএসের হামলায় ১০ জন নিহত হন, যাঁদের মধ্যে নিরাপত্তাকর্মী ও এক কানাডিয়ান পর্যটক ছিলেন।

আল-জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কারাকের খ্রিস্টান ও মুসলিম পরিবারগুলো প্রজন্ম ধরে পাশাপাশি বসবাস করে। বিশ্লেষকদের মতে, হামলাটি শুধু ধর্মীয় সংখ্যালঘুর নিরাপত্তা নয়, জর্ডানের স্থিতিশীলতা ও সহাবস্থানের ভাবমূর্তিকেও চ্যালেঞ্জ করেছে।

এখনো জানা যায়নি, হামলাকারীরা কে, তাদের অনুপ্রেরণা কী এবং কোনো সংগঠনের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক আছে কি না। কোনো গোষ্ঠী হামলার দায় স্বীকার করেনি। নিহত ও আহতদের সংখ্যা, হামলাকারীর সংখ্যা এবং ব্যবহৃত অস্ত্রের ধরন নিয়েও কর্তৃপক্ষের বিবৃতিতে কিছুটা অস্পষ্টতা রয়েছে।

কর্তৃপক্ষ বলছে, জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। বাদশাহ দ্বিতীয় আবদুল্লাহ আহতদের দেখতে হাসপাতালে যাওয়ার আগে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। স্থানীয়দের মধ্যে শোকের পাশাপাশি ক্ষোভও দেখা গেছে; অনেকে নিরাপত্তা জোরদারের দাবি জানিয়েছেন। আগামী দিনে তদন্তের অগ্রগতি এবং কর্তৃপক্ষের পরবর্তী নিরাপত্তা সিদ্ধান্তই বলে দেবে, এই হামলা জর্ডানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিতে কতটা প্রভাব ফেলে।