কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) জন্য বিশ্বজুড়ে ডেটা সেন্টার তৈরির প্রতিযোগিতা বাংলাদেশের খুচরা কম্পিউটার বাজারে সরাসরি প্রভাব ফেলছে। মেমোরি চিপ, এসএসডি ও প্রসেসরের সরবরাহ কমে যাওয়ায় গত এক বছরে ল্যাপটপ ও ডেস্কটপের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ঢাকার কম্পিউটার মার্কেটগুলোতে ক্রেতারা এখন একই কনফিগারেশনের ডিভাইসের জন্য আগের চেয়ে অনেক বেশি টাকা গুনছেন।

দ্য ডেইলি স্টার ১৫ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানিয়েছে, দেশের বাজারে এন্ট্রি-লেভেল ল্যাপটপের দাম এক বছরের ব্যবধানে প্রায় ৪৮ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ৬৫ হাজার থেকে ৭০ হাজার টাকায় পৌঁছেছে। সাধারণ ল্যাপটপের দাম বেড়েছে ৩৫ থেকে ৪৯ শতাংশ। আগে যে মধ্যম মানের ল্যাপটপ ৬৫–৭০ হাজার টাকায় পাওয়া যেত, সেটির দাম এখন ৮০–৮৫ হাজার টাকা। আর উচ্চমানের মডেল, যেগুলো আগে ৮০–৯০ হাজার টাকায় বিক্রি হতো, সেগুলোর দাম এখন কনফিগারেশন অনুযায়ী ১ লাখ ১০ হাজার থেকে ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা বা তার বেশি।

রায়ানস কম্পিউটার্সের কর্ণধর আরিফুজ্জামান বিপ্লব দ্য ডেইলি স্টারকে বলেছেন, কভিড-১৯ মহামারির সময় কারখানা বন্ধ থাকার চেয়েও এখন পরিস্থিতি খারাপ। তাঁর ভাষায়, বিশ্ববাজারে দাম বাড়ছে, তাই বাংলাদেশেও কম্পিউটারের দাম শিগগিরই কমার কোনো সম্ভাবনা নেই। মেমোরি চিপ, এসএসডি ও প্রসেসরের পাশাপাশি গ্রাফিকস কার্ডের দামও বেড়েছে।

দাম বাড়ার মূল কারণ এআই ডেটা সেন্টারের চাহিদা। ওপেনএআই, মেটা, গুগলসহ বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের এআই অবকাঠামোর জন্য বিপুল পরিমাণ উচ্চক্ষমতার মেমোরি ও চিপ কিনছে। বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ জহিরুল ইসলামের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্ববাজারে সরবরাহকারী সেমিকন্ডাক্টর নির্মাতার সংখ্যা কম; তাঁরা বেশি লাভজনক এআই পণ্যে উৎপাদন সরিয়ে নিচ্ছেন। ফলে সাধারণ কম্পিউটারের জন্য যন্ত্রাংশের সরবরাহ সংকুচিত হয়ে আমদানিকারক ও বিক্রেতাদের ক্রয় খরচ বাড়ছে।

আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান ট্রেন্ডফোর্স সেপ্টেম্বরে পূর্বাভাস দিয়েছে, ২০২৬ সালের অক্টোবর–ডিসেম্বর প্রান্তিকে প্রচলিত ডিআরএএমের চুক্তিমূল্য আগের প্রান্তিকের তুলনায় ১০–১৫ শতাংশ এবং ন্যান্ড ফ্ল্যাশের দাম ১৫–২০ শতাংশ বাড়তে পারে। এটি পূর্বাভাস, চূড়ান্ত মূল্য নয়; তবে বাস্তবায়িত হলে কম্পিউটারের খুচরা দাম আরও বাড়ার চাপ তৈরি হবে।

বাংলাদেশের বাজারে এই চাপ বেশি লাগছে কারণ দেশে কম্পিউটার পুরোপুরি আমদানিনির্ভর। ঢাকা ট্রিবিউনের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে ১৬ জিবি ডিডিআর৫ র‍্যামের একটি স্টিক ৭–১০ হাজার টাকায় পাওয়া যেত; ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সেটি ২০–২৫ হাজার টাকায় উঠেছে। টাকার অবমূল্যায়ন এবং আন্তর্জাতিক বাজারের দৈনিক ওঠানামাও আমদানি খরচ বাড়িয়েছে।

তবে একটি বিষয়ে কিছুটা স্বস্তি আছে। বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির তথ্য অনুযায়ী, আগে কম্পিউটার ও ল্যাপটপের যন্ত্রাংশে ১৫–২০ শতাংশ আমদানি শুল্ক ছিল। ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকার সেই শুল্ক পুরোপুরি প্রত্যাহার করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুল্ক কমানো না হলে দাম আরও বেশি হতো।

বিক্রির পরিমাণ কমলেও মোট বেচাকেনার মূল্য বেড়েছে। কম্পিউটার সমিতির সভাপতি জানিয়েছেন, গত এক বছরে ল্যাপটপ ও ডেস্কটপের বিক্রি ২০–২৫ শতাংশ কমেছে। শিল্পসংশ্লিষ্টদের হিসাবে এখন মাসে দেশে ল্যাপটপ ও ডেস্কটপ বিক্রি হয় প্রায় ২০ হাজার ইউনিট। আন্তর্জাতিক ডেটা কর্পোরেশন (আইডিসি) জুনে পূর্বাভাস দিয়েছিল, ২০২৬ সালে বিশ্বে পিসি সরবরাহ ১১ দশমিক ৩ শতাংশ কমবে এবং গড় বিক্রয়মূল্য ১৮ দশমিক ৩ শতাংশ বাড়বে। সংস্থাটি বলেছে, মেমোরি সংকট ২০২৭ সালের শেষ পর্যন্ত থাকতে পারে।

ক্রেতাদের ওপর প্রভাব ইতিমধ্যে স্পষ্ট। ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের (আইইউবি) শিক্ষার্থী আল আমিন মোল্লা তিন বছর আগে ৬০ হাজার টাকায় একটি ল্যাপটপ কিনেছিলেন। নতুন চাকরির জন্য একই ধরনের ল্যাপটপ খুঁজতে গিয়ে তিনি দেখেন, একই মডেলের দাম চাওয়া হচ্ছে ৯০ হাজার টাকা। অফিসের বরাদ্দের চেয়ে বেশি হওয়ায় তিনি ল্যাপটপ না কিনেই ফিরে যান।

প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রেও হিসাব বদলে যাচ্ছে। স্টিল নির্মাতা রহিম গ্রুপ নতুন অফিসের জন্য বিপুল পরিমাণ কম্পিউটার ও আইটি সরঞ্জাম কেনার পরিকল্পনা করেছিল। আইটি খরচ ও ঋণের সুদ একসঙ্গে বাড়ায় প্রতিষ্ঠানটি পরিকল্পনা স্থগিত করেছে। গ্রুপের আইটি প্রধান আসাদুজ্জামান শওন বলেন, বাড়তি খরচের কারণে সম্প্রসারণ পরিকল্পনা আপাতত থামিয়ে রাখতে হয়েছে।

কোনো সরকারি সংস্থা কম্পিউটারের দাম নিয়ে আলাদা কোনো সূচক প্রকাশ করে না, আর পরিস্থিতি কত দিন চলবে তা নিয়েও স্পষ্ট কোনো সরকারি পূর্বাভাস নেই। আন্তর্জাতিক পূর্বাভাসে ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ নতুন উৎপাদন সক্ষমতা চালু হওয়ার কথা বলা হচ্ছে, তবে কতটা সরবরাহ বাড়বে এবং তার প্রভাব দেশের খুচরা বাজারে কত দ্রুত পৌঁছাবে, তা এখনো অনিশ্চিত। খুচরা বিক্রেতারা কতটা বাড়তি খরচ গ্রাহকের ওপর চাপাবেন, সে বিষয়েও কোনো সুস্পষ্ট হিসাব নেই।

আপাতত ক্রেতাদের জন্য বাস্তব পরামর্শ হলো, প্রয়োজন ও কাজের ধরন বুঝে ডিভাইস কেনা। সাধারণ লেখাপড়া, অফিসের কাজ বা অনলাইন ক্লাসের জন্য সর্বোচ্চ ক্ষমতার ডিভাইস দরকার নেই। প্রসেসর, র‍্যাম, স্টোরেজ, ওয়ারেন্টি এবং ভবিষ্যতে আপগ্রেডের সুযোগ বিবেচনা করে কেনা ভালো। কম্পিউটার সমিতির সভাপতির ভাষ্য অনুযায়ী, শুল্ক কমানোয় সরকার তার অংশ করেছে; কিন্তু বৈশ্বিক সরবরাহ সংকটের কারণে অন্তত ২০২৭ সাল পর্যন্ত দাম উঁচুতে থাকার আশঙ্কা রয়েছে।