দেশের সব সার কারখানা চালু করার লক্ষ্যে কাজ করছে সরকার; এতে ইউরিয়া আমদানিতে বছরে প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হবে বলে আশা করছে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশন (বিসিআইসি)। বৃহস্পতিবার দুপুরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ সার ও রাসায়নিক কোম্পানি লিমিটেড (এএফসিসিএল) পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বিসিআইসি চেয়ারম্যান মো. বাবুল মিঞা এ কথা বলেন।
তিনি বলেন, দেশে বছরে ২৬ থেকে ২৭ লাখ মেট্রিক টন ইউরিয়া সার আমদানি করতে হয়। কারখানাগুলো পর্যাপ্ত গ্যাস নিয়ে চালু থাকলে দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে সার রপ্তানির সক্ষমতাও দেশের আছে। তাঁর ভাষায়, এখন প্রধান সমস্যা গ্যাসের সংকট; গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করাই মূল লক্ষ্য।
গ্যাস সংকটের কারণে ২০২৫ সালের ১ মার্চ থেকে বন্ধ আছে আশুগঞ্জ সার কারখানা। চলতি বছরের মধ্যেই গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করে সেখানে উৎপাদন শুরু করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। কারখানা পরিদর্শনের সময় এএফসিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শেখ মো. আলী আশরাফ, উপ-মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) তাজুল ইসলাম ভূঁইয়াসহ অন্য কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সার কারখানা চালুর লক্ষ্য নতুন নয়, তবে বাস্তবায়নই প্রশ্নের মুখে। গত ১৩ অক্টোবর ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের পাঁচটি বড় সার কারখানা আবার চালু হয়েছে; এগুলোর মিলিত দৈনিক সক্ষমতা ৮ হাজার ৪০০ টন। কারখানাগুলো হলো ঘোড়াশাল-পলাশ, কাফকো, শাহজালাল, যমুনা ও চট্টগ্রাম ইউরিয়া ফার্টিলাইজার।
ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঘোড়াশাল-পলাশের দৈনিক সক্ষমতা ২ হাজার ৮০০ টন, কাফকোর ২ হাজার টন, শাহজালালের ১ হাজার ৩০০ টন, যমুনার ১ হাজার ২০০ টন এবং চট্টগ্রাম ইউরিয়া কারখানার ১ হাজার ১০০ টন। ২০২৫ সালের মার্চে গ্যাস সংকটে বিসিআইসির চারটি ইউরিয়া কারখানা ও কাফকো বন্ধ হয়ে গিয়েছিল; বড় কারখানাগুলোর মধ্যে চালু ছিল কেবল শাহজালাল।
মিলিত সক্ষমতা মানেই নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন নয়। যমুনা সার কারখানা প্রায় সাড়ে সাত মাস বন্ধ থাকার পর গত ৬ অক্টোবর উৎপাদনে ফেরে, কিন্তু ৮ অক্টোবর বয়লার লিকের কারণে আবার বন্ধ হয়ে যায়। কারখানা কর্তৃপক্ষের হিসাবে নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদনের জন্য দৈনিক প্রায় ৪৬ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস দরকার; ৪২ থেকে ৪৩ মিলিয়ন ঘনফুট দিয়েও কিছুটা উৎপাদন সম্ভব। আগে সেখানে ২৭ থেকে ২৮ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসই সরবরাহ করা হচ্ছিল।
বিসিআইসি কর্মকর্তারা আগে জানিয়েছিলেন, রাষ্ট্রীয় মালিকানার পাঁচটি ইউরিয়া কারখানা পূর্ণ সক্ষমতায় চালাতে দৈনিক প্রায় ১৯৭ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস লাগে। গ্যাসের যোগান বাড়লেও পুরোনো যন্ত্রপাতি ও বারবার যান্ত্রিক ত্রুটি উৎপাদন ধরে রাখার পথে বড় বাধা।
দেশে বছরে ৬৫ লাখ টনের বেশি রাসায়নিক সার দরকার, যার ৩০ লাখ টনের বেশি ইউরিয়া। সরকারি হিসাব অনুযায়ী প্রতি বছর ২০ লাখ টনের বেশি ইউরিয়া ও সাড়ে ৩৫ লাখ টন নন-ইউরিয়া সার আমদানি করতে হয়। কৃষি মন্ত্রণালয় সম্প্রতি জানিয়েছে, দেশে এখন ১৫ লাখ টন সার মজুত আছে।
কী এখনো স্পষ্ট নয়: কোন কারখানায় কবে থেকে কত গ্যাস দেওয়া হবে, আর ২২ হাজার কোটি টাকার সাশ্রয় কীভাবে হিসাব করা হয়েছে, সে বিষয়ে বিসিআইসি চেয়ারম্যান বিস্তারিত বলেননি। কেবল গ্যাসের যোগান নিশ্চিত হলে এই লক্ষ্য পূরণ হবে—এই শর্তই তিনি বারবার তুলে ধরেছেন।
সরবরাহ শৃঙ্খল বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. রশিদুল হাসানের মতে, দেশীয় উৎপাদন ব্যাহত হলে আমদানি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও সারের ভর্তুকির ওপর চাপ বাড়ে। কারখানা নিরবচ্ছিন্নভাবে চললে কৃষকের জন্য সারের জোগান বাড়বে; তবে তা নির্ভর করবে নির্ভরযোগ্য গ্যাস, সময়মতো রক্ষণাবেক্ষণ ও বারবার যান্ত্রিক ত্রুটি ঠেকানোর ওপর।
সামনে শীত মৌসুমের বোরো আবাদ, যখন সারের চাহিদা সবচেয়ে বেশি থাকে। সরকারি হিসাবে ডিসেম্বরের মধ্যে ৯ লাখ ৫০ হাজার টন নন-ইউরিয়া সার আমদানির লক্ষ্যও রয়েছে। কারখানাগুলো চালু রাখা গেলেই কেবল আমদানি নির্ভরতা কমানো সম্ভব হবে।



