সৌদি আরবের দাম্মামে বিমানবন্দরে হামলায় আহত দুই বাংলাদেশি এখন ভালো আছেন এবং শুক্রবার হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেতে পারেন বলে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। একই দিন সকালে রিয়াদে আরেক হামলায় নিহত প্রবাসী শাহেদ আহম্মদের মরদেহ দেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের বৃহস্পতিবারের সংবাদ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ২১ অক্টোবর রাত আনুমানিক ৯টায় কিং ফাহদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর লক্ষ্য করে হামলার সময় আহত হন সজল চন্দ্র দাস ও মোহাম্মদ আবদুর রহিম। তাঁরা দাম্মামের সৌদি-জার্মান হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রতিনিধিরা হাসপাতালে গিয়ে তাঁদের সঙ্গে দেখা করেছেন এবং চিকিৎসার খোঁজখবর নিয়েছেন।
সজল কুমিল্লার বাঙ্গরাবাজার থানার রামচন্দ্রপুর ইউনিয়নের অনুকূল চন্দ্র দাসের ছেলে। আবদুর রহিম নোয়াখালী সদর উপজেলার দিনমনিরহাটের সিরাজুল হকের ছেলে। মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য, গরম ও ধোঁয়ায় তাঁরা জ্ঞান হারিয়েছিলেন, তবে শরীরে গুরুতর আঘাতের চিহ্ন নেই।
ওই হামলায় অন্তত দুজন নিহত ও আটজন আহত হয়েছেন। সৌদির বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের বরাতে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, নিহতদের একজন সৌদি নাগরিক ও অপরজন ভারতীয় প্রবাসী। আহতদের মধ্যে এক সৌদি, দুই ভারতীয়, দুই ইয়েমেনি, দুই বাংলাদেশি ও এক নেপালি নাগরিক রয়েছেন। কর্তৃপক্ষ বলেছে, হামলার পর বিমানবন্দরের কার্যক্রম স্বাভাবিক হয়েছে।
হামলার দায় কেউ সরাসরি স্বীকার করেনি। তবে ইরান-সমর্থিত হুথি গোষ্ঠীর ধারাবাহিক হামলার অংশ হিসেবে ঘটনাটিকে দেখছেন বিশ্লেষকেরা। গত ১০ অক্টোবর রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ১২ জন নিহত ও ৩০৯ জন আহত হন বলে সৌদি কর্তৃপক্ষের হিসাবে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম। বাংলাদেশ দূতাবাসের হিসাবে ওই ঘটনায় দুজন বাংলাদেশি নিহত এবং ২৪ জন আহত হন।
নিহত দুই বাংলাদেশির একজন বগুড়ার শাহেদ আহম্মদ, অন্যজন কুমিল্লার মো. নাসরুল্লাহ বদরপুরী। শাহেদের বয়স ছিল ৩৬ বছর। বাড়ি বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার মাদলা ইউনিয়নে। ২০১৩ সাল থেকে তিনি জেদ্দায় প্লাম্বার হিসেবে কাজ করছিলেন। এক মাসের ছুটি কাটিয়ে দেশ থেকে সৌদি আরবে ফিরেছিলেন। শনিবার বিকেলে স্ত্রী কোহিনূর আক্তার কাকলীকে ফোন করে জানান, তিনি নিরাপদে পৌঁছেছেন। এরপর তাঁর সঙ্গে আর যোগাযোগ হয়নি।
পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, শাহেদের বাবা রফিকুল ইসলাম দীর্ঘদিন সৌদি আরবে থাকেন। মা শাহেরা বেগম কয়েক মাস আগে ওমরাহ পালনের জন্য সেখানে গেছেন। শাহেদের স্ত্রী ও দুই সন্তান থাকেন দেশে।
প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, শাহেদের মরদেহ বহনকারী উড়োজাহাজ শুক্রবার সকাল ৮টা ৩৫ মিনিটে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করবে। বিমানবন্দরের ৮ নম্বর কার্গো গেটে মরদেহ গ্রহণ করবেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম।
সৌদি আরব বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রেমিট্যান্স উৎস। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশটি থেকে ৫৮৫ কোটি ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, আগের অর্থবছরে যা ছিল ৪২৬ কোটি ডলার। ওমরাহ ও হজযাত্রীর বড় অংশও সৌদি আরবে যান। তাই বিমানবন্দরগুলোতে হামলা শুধু ওই দেশের নিরাপত্তা নয়, বাংলাদেশের প্রবাসী শ্রমিক ও তাদের পরিবারের জন্যও সরাসরি উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
হামলার পর ঢাকা-রিয়াদ ও ঢাকা-দাম্মাম রুটে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ফ্লাইট কয়েক দফায় স্থগিত করা হয়। এতে হাজারো যাত্রী ভোগান্তিতে পড়েন। গত কয়েক দিনে রিয়াদ ও দাম্মামে একাধিক হামলার ঘটনায় যাত্রী ও প্রবাসী কর্মীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বেড়েছে।
এখনো যা স্পষ্ট নয়: নাসরুল্লাহ বদরপুরীর মরদেহ কবে দেশে আসবে, আহতদের চিকিৎসা খরচ ও ক্ষতিপূরণ কীভাবে হবে এবং হামলার তদন্তে কী তথ্য পাওয়া গেছে—এসব বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি। নতুন করে হামলা হলে ফ্লাইট পরিস্থিতি কেমন হবে, সে বিষয়েও কোনো নিশ্চিত ঘোষণা নেই।
আগামী দিনে শাহেদের মরদেহ গ্রহণ, আহত দুই বাংলাদেশির চিকিৎসার অগ্রগতি এবং সৌদিগামী ফ্লাইট স্বাভাবিক হওয়ার বিষয়টি নজরে রাখতে হবে। প্রবাসী কর্মীদের নিরাপত্তা ও দ্রুত প্রত্যাবর্তনের বিষয়ে সরকার ও দূতাবাস কী পদক্ষেপ নেয়, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।



