চলতি ২০২৬–২৭ অর্থবছরে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি, খাদ্য নিরাপত্তা, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার ও বড় অবকাঠামো প্রকল্পে সহায়তার জন্য বিশ্বব্যাংকের কাছে মোট ৩.৭৭ বিলিয়ন ডলার চেয়েছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে ২.৭৭ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ৩৪ হাজার কোটি টাকা) প্রকল্প অর্থায়ন এবং ১ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা) সরাসরি বাজেট সহায়তা হিসেবে চাওয়া হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের হিসাবে এই অর্থ দিয়ে চলতি অর্থবছরের জরুরি আমদানি ও সংস্কার কাজ এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা আছে।

অর্থ মন্ত্রণালয় ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে ঢাকা ট্রিবিউন ও দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড বৃহস্পতিবার জানিয়েছে, চলতি অর্থবছরের প্রকল্প তালিকায় ১০টি প্রকল্প রয়েছে। এর মধ্যে ৩৫০ মিলিয়ন ডলার চাওয়া হয়েছে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার (আইডিএ) গ্যারান্টি সহায়তা হিসেবে, যাতে তুলনামূলক কম খরচে দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি আমদানি করা যায়। ব্যাংক ও আর্থিক খাতের সংস্কারে ৪৫০ মিলিয়ন ডলার এবং খাদ্য নিরাপত্তার জরুরি সহায়তা প্রকল্পে ৩০০ মিলিয়ন ডলার চাওয়া হয়েছে।

খাদ্য নিরাপত্তার এই অর্থ মূলত সার আমদানির কাজে ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া ঢাকা-চট্টগ্রাম রেল করিডর, ঢাকা-চট্টগ্রাম এক্সপ্রেসওয়ে ও ঢাকা ইনার সার্কুলার রিং রোড নির্মাণে বিশ্বব্যাংকের সহায়তা চেয়েছে সরকার। ঢাকার আশপাশের নদী ও খাল পুনরুদ্ধার এবং দূষণ নিয়ন্ত্রণে একটি ছাতা প্রকল্পে অর্থায়নের বিষয়েও প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে।

কেন এই অর্থ চাওয়া

সরকারি হিসাবে জ্বালানি আমদানিতে প্রতি বছর বড় অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয়। এলএনজি আমদানি কমে গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প উৎপাদনে চাপ পড়ে; অন্যদিকে সারের সরবরাহ ব্যাহত হলে আমন ও বোরো মৌসুমে কৃষকের উৎপাদন খরচ বাড়ে। বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানির দাম ও সরবরাহে অনিশ্চয়তা থাকায় আমদানি ব্যয় এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতাও বিনিয়োগ ও ঋণপ্রবাহে প্রভাব ফেলছে। এই পরিস্থিতিতে বহুপক্ষীয় ঋণদাতার কাছ থেকে দীর্ঘমেয়াদি ও তুলনামূলক সহজ শর্তে অর্থ সংগ্রহের চেষ্টা করছে সরকার।

তিন বছরে আরও ১০ বিলিয়ন ডলারের আলোচনা

চলতি অর্থবছরের চাওয়ার বাইরে ‘রেজিলিয়েন্স, রিফর্ম অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট পার্টনারশিপ’ (আরআরআইপি) নামের একটি কাঠামোর আওতায় আগামী তিন বছরে নিয়মিত বরাদ্দের অতিরিক্ত ১০ বিলিয়ন ডলার ঋণ সহায়তা চেয়েছে সরকার। প্রস্তাবটি প্রথম উত্থাপিত হয় গত ২২ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনের ফাঁকে নিউইয়র্কে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্টের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে। এরপর ১২ থেকে ১৮ অক্টোবর ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সম্মেলনে প্রকল্পের রূপরেখাসহ বিষয়টি বিস্তারিত আলোচনা হয়।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১০ বিলিয়ন ডলারের প্রস্তাবিত ব্যবহার চার ভাগে ভাগ করা হয়েছে। জ্বালানি ও সারসহ জরুরি আমদানিতে ৪ বিলিয়ন ডলার, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ব্যবসা ও কর্মসংস্থান ধরে রাখতে ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার, আর্থিক খাতের পুনরুদ্ধার ও ব্যাংক সংস্কারে ৩ বিলিয়ন ডলার এবং আকস্মিক ও যৌথ অর্থায়নের জন্য ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার রাখা হয়েছে।

বাংলাদেশ ও বিশ্বব্যাংক সম্মত হয়েছে, আগামী ৬০ দিনের মধ্যে ইআরডি, বিশ্বব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের প্রতিনিধি নিয়ে একটি যৌথ কারিগরি দল গঠন করা হবে। আগামী বছরের জুনের মধ্যে এই অংশীদারত্বের কাঠামো চূড়ান্ত করার লক্ষ্য রাখছে সরকার। কাঠামোটি দেশের পরবর্তী কান্ট্রি পার্টনারশিপ ফ্রেমওয়ার্কে যুক্ত করার বিষয়েও দুই পক্ষ একমত হয়েছে।

‘চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি’

ব্যাংককে ১২ সদস্যের বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে তিনি বলেন, বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা চলছে এবং তা অব্যাহত থাকবে। তবে তিনি স্পষ্ট করেন, এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

সম্মেলনের ফাঁকে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দল বিশ্বব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (অপারেশনস) আনা বেয়ার্দে ও দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের ভাইস প্রেসিডেন্ট জোয়েল বুয়ারলির সঙ্গে আলাদা বৈঠক করে। কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের ১০টি প্রকল্প নিয়ে আলোচনা ইতিবাচক হয়েছে।

আইএমএফের সঙ্গে ৪.৫ বিলিয়ন ডলারের আলোচনা

একই সফরে আইএমএফের সঙ্গে বাংলাদেশের চাওয়া ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের ঋণ প্যাকেজ নিয়েও আলোচনা হয়েছে। সংস্থাটি কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো এবং ব্যাংকিং খাতে মূলধনের ঘাটতি মেটানোর মতো কাঠামোগত সংস্কারের ওপর জোর দিয়েছে। অর্থমন্ত্রী স্বীকার করেছেন, আইএমএফের ঋণে কঠোর পারফরম্যান্স শর্ত থাকবে। তিনি জানান, আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে আইএমএফের একটি কারিগরি দল ঢাকায় আসবে।

বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা

নতুন ঋণের প্রসঙ্গে সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন বলেছেন, দেশের জরুরি অর্থনৈতিক চাহিদা মেটানোর মতো রাজস্ব সুযোগ সরকারের নেই। তবে তিনি সতর্ক করেছেন, বিদ্যমান ঋণের বোঝা আর না বাড়াতে হলে অর্থ স্বচ্ছ ও দক্ষতার সঙ্গে খরচ করতে হবে এবং তার পরিমাপযোগ্য ফলাফল নির্ধারণ করতে হবে।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেছেন, বিশ্বব্যাংকের তিন বছর মেয়াদি আইডিএ কর্মসূচিতে বাংলাদেশের বার্ষিক বরাদ্দ কখনো ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়ায়নি। তাই আরআরআইপির আওতায় অতিরিক্ত ১০ বিলিয়ন ডলার অন্য উৎস থেকে আসতে পারে। তিনি বলেন, অর্থায়নের উৎস, পরিমাণ ও শর্ত এখনো নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। বড় প্রকল্পে অর্থায়ন নির্ভর করবে প্রকল্পের নকশা ও বাস্তবায়ন সক্ষমতার ওপর।

এখনো যা অজানা

চূড়ান্ত ঋণ চুক্তি হবে কি না, হলে কোন শর্তে হবে—তা এখনো নিশ্চিত নয়। ১০ বিলিয়ন ডলারের অর্থ কতটা নতুন এবং কতটা আগের প্রকল্পের পুনর্বিন্যাস, তাও স্পষ্ট নয়। প্রতিটি প্রকল্পের সুদহার, পরিশোধের মেয়াদ ও শর্ত বিশ্বব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে অনুমোদনের পর জানা যাবে। এসব ঋণ দেশের ঋণবোঝা কতটা বাড়াবে, তার হিসাবও এখনো প্রকাশ করা হয়নি।

পরবর্তী ধাপ

আগামী ৬০ দিনের মধ্যে যৌথ কারিগরি দল গঠন, আগামী জুনের মধ্যে আরআরআইপি কাঠামো চূড়ান্ত করা এবং দুই সপ্তাহের মধ্যে আইএমএফের কারিগরি দলের ঢাকা সফর—এই তিনটি কাজ এখন সামনে রয়েছে। এরপর প্রতিটি প্রকল্প আলাদাভাবে বিশ্বব্যাংকের অনুমোদন প্রক্রিয়ায় যাবে। সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, আলোচনা ইতিবাচক হলেও চূড়ান্ত ফলাফল নির্ভর করছে সংস্কারের অগ্রগতি ও প্রকল্পের প্রস্তুতির ওপর।