সৌদি আরবের মক্কায় দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট দূতাবাস ও কনস্যুলেটের জবাবদিহি এবং নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)। বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) সংগঠনটির নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলামের সই করা এক বিবৃতিতে এই দাবি করা হয়। সংগঠনটি বলেছে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও কূটনৈতিক মিশন বিষয়টি অবহিত ছিল না—এমন খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে, যা প্রবাসী নাগরিকদের সুরক্ষা ও কনস্যুলার সহায়তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করেছে।

সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে দেশটির সরকারি সংবাদ সংস্থা এসপিএ জানায়, গত ১৪ অক্টোবর মক্কা অঞ্চলে নজরুল ইসলাম ও সুইটি আক্তারের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, পবিত্র শহরের একটি মসজিদে তাঁরা ‘অনৈতিক কাজ’ করেছেন। মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, গ্রেপ্তারের পর তদন্ত শেষে মামলাটি আদালতে পাঠানো হয়, আদালত তাঁদের দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেন এবং পরে রাজকীয় আদেশে তা কার্যকর হয়। বিবৃতিতে ওই কাজের বিস্তারিত প্রকৃতি বা ঘটনার পরিস্থিতি সম্পর্কে কিছু বলা হয়নি। সৌদি কর্তৃপক্ষ বলেছে, তারা ইসলামি আইন প্রয়োগ এবং উপাসনালয়ের পবিত্রতা রক্ষা করছে এবং একই ধরনের অপরাধে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

নজরুল ইসলামের পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি ২০২২ সালের ১০ নভেম্বর সৌদি আরবে যান এবং মক্কার হারাম শরিফে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করতেন। সৌদি আরবে যাওয়ার আট মাসের মাথায় পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে; এরপর প্রায় তিন বছর তিনি কারাগারে ছিলেন। পরিবার তাঁর আটকের খবর জানতে পারে এক মাস পর। সর্বশেষ ১১ অক্টোবর দুই থেকে আড়াই মিনিট কথা হয় তাঁর সঙ্গে। গত ১৪ অক্টোবর বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে সৌদি আরব থেকে ফোন করে পরিবারকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়টি জানানো হয়। নজরুলের বাবা আবদুল বাছির আলো প্রথম আলোকে বলেছেন, আত্মীয়দের কাছ থেকে ছয় লাখ টাকা ঋণ নিয়ে ছেলেকে সৌদি পাঠিয়েছিলেন তিনি; ছেলে প্রথম সাত-আট মাসে প্রায় দেড় লাখ টাকা পাঠান। তিনি সরকারের কাছে ছেলের মরদেহ দ্রুত দেশে ফেরানোর দাবি জানিয়েছেন। নজরুলের মা রহিমা বেগম বলেছেন, ছেলের বিরুদ্ধে অভিযোগ মিথ্যা এবং তিনি শেষবারের মতো ছেলের লাশ দেখতে চান।

প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর প্রকাশের পর ১৫ অক্টোবর জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেট সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে একটি কূটনৈতিক পত্র দেয়। ১৮ অক্টোবর ঢাকায় সৌদি রাষ্ট্রদূতের কাছেও পত্রটি পুনরায় দেওয়া হয়। জেদ্দার আলোচনায় বাংলাদেশের কনসাল জেনারেল প্রশ্ন তোলেন, নিয়মিত পাঠানো বন্দিতালিকায় দুজনের নাম থাকলেও শাস্তির তথ্য কেন গোপন রাখা হলো। সৌদি পক্ষ ওই বৈঠকে জানায়, ২০২৩ সালের আগস্টে গ্রেপ্তারের পর নিম্ন আদালত দণ্ড দেয়, পরে ১৩ জন বিচারকের প্যানেল আপিলে মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখে এবং নারী ও পুরুষের জন্য নির্ধারিত পৃথক সেলে দণ্ড কার্যকর করা হয়। মামলার নথি, বিচারিক প্রক্রিয়া এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চেয়ে দ্বিতীয় পত্র দেওয়া হয়েছে।

এইচআরএসএস পাঁচ দফা দাবি তুলে ধরেছে। এর মধ্যে রয়েছে—সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে মামলা, বিচার, দণ্ডাদেশ ও মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পূর্ণাঙ্গ নথি সংগ্রহ করে জনসমক্ষে প্রকাশ; সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর ভূমিকা ও দায়িত্ব পালনের ঘাটতি ব্যাখ্যা এবং অবহেলা প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা; সৌদিসহ বিভিন্ন দেশের কারাগারে আটক বাংলাদেশিদের হালনাগাদ তালিকা তৈরি; মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ও গুরুতর মামলায় অভিযুক্ত নাগরিকদের জন্য যোগ্য আইনজীবী নিয়োগ, কনস্যুলার যোগাযোগ ও আইনসম্মত আপিলের সুযোগ নিশ্চিত করা; দুই পরিবারকে প্রয়োজনীয় তথ্য ও সহায়তা দেওয়া এবং কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা সংগ্রহ করা। ইজাজুল ইসলাম বলেছেন, প্রবাসী নাগরিকদের অধিকার রক্ষায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর দায়িত্ব কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না।

ঘটনাটি বৃহত্তর প্রেক্ষাপটেও গুরুত্বপূর্ণ। ইউরোপীয় সৌদি অর্গানাইজেশন ফর হিউম্যান রাইটসের (ইএসওএইচআর) হিসাবে, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে সৌদি আরবে অন্তত ১০৮ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। এর মধ্যে ৫৯ জন বিদেশি নাগরিক, যাঁরা ১৭টি দেশের। তালিকায় বাংলাদেশও রয়েছে। ওই ছয় মাসে কতজন বাংলাদেশির দণ্ড কার্যকর হয়েছে, তা জানা যায়নি। সংস্থাটির হিসাবে, ১০৮টি দণ্ডের ৭১টি মাদক-সংশ্লিষ্ট, ২৫টি হত্যার মামলায় এবং ৯টি রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত মামলায় দেওয়া হয়। ৮৩টি মামলায় হত্যার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক ছিল না। ৯১টি মৃত্যুদণ্ডের আগে সংস্থাটি বা সংশ্লিষ্ট অন্য সংস্থা আগাম তথ্য পায়নি। সৌদি বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ ও যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের আমলে মোট মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সংখ্যা দুই হাজারে পৌঁছেছে বলে সংস্থাটির দাবি।

ঘটনাটি ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পুরোনো ও ভিন্ন ঘটনার ভিডিও ছড়িয়েছে। প্রথম আলোর ফ্যাক্ট চেক অনুযায়ী, ২০১৫ সালে সৌদিতে এক নারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পুরোনো ভিডিও দুই বাংলাদেশির ঘটনার নামে প্রচার করা হচ্ছে। অন্য এক প্রবাসীর মরদেহবাহী কফিনের ছবিকেও তাঁদের মরদেহ দেশে আসার দৃশ্য বলে দাবি করা হচ্ছে। হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের উপপরিচালক (কল্যাণ) ও অফিসপ্রধান শরিফুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেছেন, মরদেহ এখনো দেশে আসেনি। দুই ব্যক্তি স্বামী-স্ত্রী ছিলেন বা ওমরাহ করতে গিয়েছিলেন—এমন দাবিরও সত্যতা পাওয়া যায়নি। নজরুলের বাবা বলেছেন, ছেলে অবিবাহিত ছিলেন।

এখনো জানা যায়নি, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছিল কি না, পরিবার কোনো আইনজীবীর মাধ্যমে আপিলের সুযোগ পেয়েছিল কি না এবং মরদেহ কবে দেশে ফিরবে। এইচআরএসএসের দাবির ব্যাপারে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির ঘটনাটিকে ‘আমাদের জন্য হতাশার’ বলে মন্তব্য করেছেন—প্রথম আলোর ১৯ অক্টোবরের প্রতিবেদনে এমনটি বলা হয়েছে। এখন দেখার বিষয়, সৌদি কর্তৃপক্ষ মামলার পূর্ণ নথি দেয় কি না এবং দুই পরিবার কবে মরদেহ ফেরত পায়।