সাভার পৌর এলাকার উলাইলে আব্বাস স্পেশালাইজড হাসপাতালে নাকের পলিপাস ও টনসিলের অপারেশন চলাকালে ১১ বছর বয়সী এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। বুধবার দুপুরে এ ঘটনা ঘটে। শিশুটির স্বজনদের অভিযোগ, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ছাড়াই তাকে অপারেশনে নেওয়া হয় এবং চিকিৎসক ও হাসপাতালকর্মীর অবহেলায় তার মৃত্যু হয়।

শিশুটি প্রবাসী এক বাংলাদেশি শ্রমিকের ছেলে। পরিবারের বাড়ি মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইরে। বুধবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে শিশুটিকে হাসপাতালে নেওয়া হলে তাকে অপারেশন থিয়েটারে নেওয়া হয়। প্রায় দেড় ঘণ্টা পর হাসপাতালের চিকিৎসক ও নার্সরা থিয়েটারের বাইরে দৌড়াদৌড়ি শুরু করেন এবং স্বজনদের জানান, শিশুর অবস্থা খারাপ হয়েছে এবং তাকে আইসিইউতে নিতে হবে।

শিশুটির মা জানান, কয়েক দিন আগে নাকের পলিপাস ও টনসিলের সমস্যা নিয়ে ছেলেকে হাসপাতালের চিকিৎসক মো. সুমন হোসেনের কাছে দেখানো হয়। তখন চিকিৎসক অপারেশনের কথা বলে আগে ইসিজি ও ইকো পরীক্ষা করাতে বলেন। মঙ্গলবার হাসপাতালে ইসিজি করা গেলেও চিকিৎসক না থাকায় ইকো করা যায়নি। বাইরে থেকে ইকো করিয়ে আনার কথা বললে চিকিৎসক জানান, ইসিজি রিপোর্ট ভালো আছে, ইকোর প্রয়োজন নেই।

স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, এরপর চিকিৎসকের পরামর্শেই বুধবার শিশুটিকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। অপারেশনে জটিলতা দেখা দেওয়ার পর দুপুর ২টার দিকে তাকে সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউর মেডিকেল অফিসার ডা. আব্দুল আহাদ বলেন, শিশুটিকে আনা হলে তার হৃৎস্পন্দন বা জীবনের কোনো লক্ষণ ছিল না। পরীক্ষা করে মৃত্যু নিশ্চিত করে পরিবারকে জানানো হয়। মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, তিনি শুনেছেন ওই হাসপাতালে অজ্ঞান করার ইনজেকশন দেওয়ার পর শিশুটির অবস্থা খারাপের দিকে গেলে তার মৃত্যু হয়।

সাভার মডেল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) ফজর আলী বলেন, মরদেহের সুরতহালের সময় শিশুর শরীরে কোনো কাটাছেঁড়া পাওয়া যায়নি; তবে নাক ও মুখ দিয়ে রক্ত বের হওয়ার চিহ্ন ছিল। তিনি জানান, শিশুটি অজ্ঞান করার ওষুধ প্রয়োগের পর মারা গেছে বলে শোনা গেছে। ঘটনার পর ক্ষুব্ধ স্বজনেরা হাসপাতালে ভাঙচুর করেন। পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় এখনো লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়নি।

ঘটনার পর হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, কয়েকজন রোগী ভর্তি থাকলেও কোনো চিকিৎসক বা নার্স নেই। চিকিৎসাধীন এক রোগী সিরাজুল ইসলাম বলেন, দুপুরে ভাঙচুরের পর থেকে কোনো ডাক্তার-নার্সকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না; তাঁর নিজেরও অপারেশন হয়েছে, এই পরিস্থিতিতে কী করবেন তিনি বুঝতে পারছেন না। হাসপাতালের সামনে দায়িত্ব পালনরত এক নিরাপত্তাকর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ঘটনার পর চিকিৎসক, নার্স ও কর্মীরা চলে গেছেন; দুই-তিনজন রোগী এখনো হাসপাতালে আছেন।

হাসপাতালের মালিক ডা. মো. আব্বাস উদ্দিন ও অভিযুক্ত চিকিৎসক মো. সুমন হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি; তাঁদের দুটি মুঠোফোনই বন্ধ পাওয়া গেছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে ঘটনার বিষয়ে কোনো লিখিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. ফজলে বারী বলেন, আব্বাস স্পেশালাইজড হাসপাতালে এক শিশু অপারেশন থিয়েটারে মারা গেছে জানতে পেরেছেন; তবে এ বিষয়ে তাঁর কাছে কেউ অভিযোগ করেননি। অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।

এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি শিশুটির মৃত্যুর প্রকৃত কারণ কী। ময়নাতদন্ত করা হবে কি না, হাসপাতালটির নিবন্ধন ও অনুমোদনের অবস্থা কী, অপারেশনের আগে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা কেন বাদ পড়ল এবং ঘটনার দিন অপারেশন থিয়েটারে ঠিক কী ঘটেছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি। চিকিৎসক ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য না পাওয়ায় অভিযোগের বিষয়েও তাদের অবস্থান জানা যায়নি।

গুরুত্বপূর্ণ হলো, স্বজনদের অভিযোগ এখনো আদালত বা তদন্ত সংস্থার সিদ্ধান্ত নয়। পুলিশ ও স্বাস্থ্য বিভাগের প্রাথমিক যাচাই এবং প্রয়োজনে ময়নাতদন্তের পরই মৃত্যুর কারণ ও দায় সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।

পরিবারটি সুষ্ঠু বিচার চায় বলে জানিয়েছে। পুলিশ বলছে, লিখিত অভিযোগ পেলে মামলা ও তদন্তের প্রক্রিয়া শুরু হবে। স্বাস্থ্য বিভাগও অভিযোগের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছে। এর মধ্যে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীদের চিকিৎসা কে চালাবে এবং হাসপাতালটি চালু থাকবে কি না, সে বিষয়েও স্পষ্ট কিছু জানা যায়নি।