মিয়ানমারের একটি স্ক্যাম কম্পাউন্ড থেকে পালিয়ে থাইল্যান্ডে আশ্রয় নেওয়া আট বাংলাদেশির মধ্যে তিনজন ২২ অক্টোবর বৃহস্পতিবার দেশে ফিরছেন। তাঁরা বিকেল ৪টা ২০ মিনিটে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের বিএস-২১৮ ফ্লাইটে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছাবেন বলে জানিয়েছে অনির্বাণ সারভাইভার ভয়েস ফাউন্ডেশন। বাকি পাঁচজনের ফেরার আইনি প্রক্রিয়া এখনো চলছে।
ভালো বেতনের চাকরির আশায় এই আটজন কম্বোডিয়া ও লাওসে গিয়েছিলেন এবং তাঁদের বৈদেশিক কর্মসংস্থানের সরকারি ছাড়পত্র ছিল বলে ফাউন্ডেশনের বরাতে জানিয়েছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর। সেখানে কাজ শুরু করার পর দালালচক্র তাঁদের আরও ভালো কাজের প্রলোভন দেখিয়ে থাইল্যান্ডে নিয়ে যায়। এরপর মিয়ানমার সীমান্তে জোর করে পার করিয়ে চীনা নাগরিকদের পরিচালিত একটি স্ক্যাম ক্যাম্পে বিক্রি করে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেছেন আটজনের একজন।
ওই ব্যক্তির ভাষ্য অনুযায়ী, ক্যাম্পে তাঁদের অনলাইনে প্রতারণার কাজে বাধ্য করা হতো। নির্ধারিত লক্ষ্য পূরণ না হলে শারীরিক নির্যাতন চালানো হতো এবং ক্যাম্পের ভেতরে ‘ব্ল্যাক রুম’ নামে একটি ঘরে নিয়ে নির্যাতন করা হতো। তাঁর পরিবার ১০ হাজার ডলার মুক্তিপণ দিয়ে তাঁকে ছাড়িয়ে নেয় বলেও তিনি জানান। এই বর্ণনা স্বতন্ত্রভাবে যাচাই করা যায়নি; ভুক্তভোগীর অভিযোগ হিসেবেই তা তুলে ধরা হয়েছে।
অন্যরা সুযোগ পেয়ে ক্যাম্প থেকে পালিয়ে সীমান্ত পেরিয়ে থাইল্যান্ডে যান। বৈধ থাই ভিসা না থাকায় তাঁরা মায়ে সটের ইমিগ্রেশন পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেন। পুলিশ তাঁদের একটি সেফ হাউসে রাখে। মায়ে সট ইমিগ্রেশন অফিসের রেফারেল ব্যবস্থার আওতায় ওই আট বাংলাদেশি সেখানে ছিলেন বলে জানিয়েছে ঢাকা ট্রিবিউন।
দেশে ফেরার উদ্যোগ শুরু হয় গত ২৪ আগস্ট। ভুক্তভোগী ও তাঁদের পরিবারের অভিযোগ পেয়ে অনির্বাণ সারভাইভার ভয়েস ফাউন্ডেশন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রবাসী কর্মী কল্যাণ বোর্ডে আবেদন করে। বোর্ডের পরিচালক মো. সাইদুর রহমান ব্যাংককে বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রম শাখার প্রথম সচিবকে চিঠি দিয়ে আটজনের মুক্তি ও প্রত্যাবাসনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলেন।
ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, চিঠির পর দূতাবাস ও থাই কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে তিনজনের ফেরার ব্যবস্থা হয়েছে। বাকি পাঁচজনের ফেরার আইনি প্রক্রিয়া চলছে। ফেরার অপেক্ষায় থাকা তিনজন কত দিন সেফ হাউসে ছিলেন বা তাঁদের কোথায় রাখা হয়েছিল, সে সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।
মিয়ানমার, কম্বোডিয়া, লাওস ও ভিয়েতনামে গত কয়েক বছরে সাইবার স্ক্যাম সেন্টারের সংখ্যা বেড়েছে। বিদেশে ভালো চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে বাংলাদেশি কর্মীদের এসব কেন্দ্রে পাচার করা হয়, তাদের পাসপোর্ট ও মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া হয় এবং অনলাইন প্রতারণার কাজে বাধ্য করা হয়—এমন অভিযোগ আগেও উঠেছে। চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি মিয়ানমারের একটি স্ক্যাম সেন্টার থেকে আট বাংলাদেশি এবং ২০২৫ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর ১৮ জন দেশে ফিরেছিলেন।
সরকার ও ব্র্যাকের পক্ষ থেকে বারবার বলা হয়েছে, থাইল্যান্ড, মিয়ানমার, লাওস, ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার জন্য চাকরির প্রস্তাব গ্রহণের আগে নিয়োগকারী সংস্থা ও চাকরির সত্যতা যাচাই করা জরুরি। বৈধ ছাড়পত্র থাকলেও প্রতারণার শিকার হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
এ ঘটনায় স্ক্যাম ক্যাম্পের নাম ও অবস্থান, আটজনকে ঠিক কত দিন আটকে রাখা হয়েছিল, দালালচক্রের বিরুদ্ধে কোনো মামলা হয়েছে কিনা এবং পাঁচজনের ফেরার নির্দিষ্ট সময়সীমা কী—এসব বিষয়ে প্রকাশ্য প্রতিবেদনে বিস্তারিত কিছু জানা যায়নি। মিয়ানমার বা থাইল্যান্ডের কর্তৃপক্ষও এই নির্দিষ্ট ঘটনায় তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।
বৃহস্পতিবার তিনজনের ঢাকায় পৌঁছানোর পর তাঁদের পরিবারের কাছে ফেরার প্রক্রিয়া শুরু হবে। বাকি পাঁচজনের ফেরার বিষয়ে দূতাবাস ও ফাউন্ডেশনের সমন্বয় চলছে। ভুক্তভোগীদের পরিবারগুলো কয়েক মাস ধরে স্বজনদের ফেরার অপেক্ষায় ছিলেন।
বিদেশে কর্মসংস্থানের প্রস্তাব নেওয়ার আগে সরকারি ছাড়পত্র, চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠানের বৈধতা ও ভিসার ধরন যাচাই করার পরামর্শ দিয়ে আসছে সরকার। দালালের মাধ্যমে টাকা দিয়ে চাকরি নেওয়ার প্রস্তাব এড়িয়ে চলা এবং সন্দেহ হলে দূতাবাসের সহায়তা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।



