সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলোতে চলমান পরিচালনগত বিধিনিষেধের কারণে গত ১০ অক্টোবর থেকে এ পর্যন্ত ঢাকা ও সৌদির মধ্যে চলাচলকারী ১৩৪টি সরাসরি ও ট্রানজিট ফ্লাইট বাতিল বা স্থগিত হয়েছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ২০ হাজার ২৫৪ জন যাত্রী। বুধবার (২১ অক্টোবর) বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) সর্বশেষ তথ্যের বরাতে এই সংখ্যা জানিয়েছে ঢাকা ট্রিবিউন, ইউএনবি, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ও দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস।
ক্ষতিগ্রস্ত ফ্লাইটের মধ্যে ৬১টি সরাসরি এবং ৭৩টি ট্রানজিট ফ্লাইট। সরাসরি ফ্লাইটের মধ্যে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ২২টি, সৌদিয়ার ১৯টি, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের ১০টি ও রিয়াদ এয়ারের ১০টি ফ্লাইট রয়েছে। ট্রানজিট ফ্লাইটের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ইন্ডিগোর ২৮টি ফ্লাইট; এরপর এমিরেটসের ১৪টি, কাতার এয়ারওয়েজের নয়টি, ফ্লাইদুবাইয়ের আটটি, সালামএয়ারের সাতটি, এয়ার ইন্ডিয়ার ছয়টি ও ইজিপ্টএয়ারের একটি ফ্লাইট বাতিল বা স্থগিত হয়েছে। মোট ১১টি এয়ারলাইনসের ফ্লাইট এই পরিস্থিতিতে আক্রান্ত হয়েছে।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সিকিউরিটি অ্যান্ড ফ্লাইট ম্যানেজমেন্ট উইংয়ের স্কোয়াড্রন লিডার সাকিব সাংবাদিকদের এই হিসাব দিয়েছেন। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, সৌদির বিমানবন্দরগুলোতে চলমান বিধিনিষেধের কারণেই ফ্লাইট পরিচালনায় এই ব্যাঘাত ঘটছে। ক্ষতিগ্রস্ত যাত্রীদের অনেকেই প্রবাসী কর্মী, যাঁদের একটি বড় অংশ চাকরিতে যোগ দেওয়ার নির্ধারিত সময় ও ভিসার মেয়াদ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন।
পরিস্থিতির সূচনা অক্টোবরের শুরুতে। ওই সময় সৌদি আরবের কয়েকটি বিমানবন্দরে ধারাবাহিক হামলা হয়। ইয়েমেনের ইরানসমর্থিত হুথি গোষ্ঠী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলার দায় স্বীকার করে। প্রথম আলোর ১১ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই সপ্তাহে এটি ছিল বিমানবন্দরটিতে তৃতীয় হামলা; হামলার পর বিমানবন্দরের কার্যক্রম স্থগিত করা হয় এবং সব ফ্লাইট অন্য দিকে সরিয়ে নেওয়া হয়। সৌদি কর্তৃপক্ষ ধাপে ধাপে বন্ধের মেয়াদ বাড়ায়, আর বিমানসহ একাধিক এয়ারলাইনস রিয়াদ ও দাম্মামগামী ফ্লাইট স্থগিত করে।
বাংলাদেশের জাতীয় বিমান সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ১৭ অক্টোবর এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, যাত্রীদের নিরাপত্তার স্বার্থে রিয়াদগামী ফ্লাইট অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত রাখা হয়েছে। ওই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, দাম্মাম বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের অনুমতি পেলে ২১ অক্টোবর থেকে দাম্মাম রুটে ফ্লাইট চালু করা হবে। জরুরি প্রয়োজনে যাত্রীদের জেদ্দা ও মদিনা বিমানবন্দর ব্যবহারের পরামর্শও দেওয়া হয়।
বুধবার বিমান নতুন এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, পরিস্থিতির ক্রমাগত উন্নতির পরিপ্রেক্ষিতে ২৫ অক্টোবর রিয়াদে একটি ফ্লাইট পরিচালনা করা হবে। বাংলাদেশ সময় ওই দিন রাত ১টা ২৫ মিনিটে ফ্লাইটটি ঢাকা থেকে রিয়াদের উদ্দেশ্যে ছাড়বে। সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে রিয়াদগামী অন্য ফ্লাইট চালুর বিষয়ে পরে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এ ছাড়া দাম্মামগামী ফ্লাইট বুধবার থেকে পুনরায় চালু হয়েছে; ২৬ অক্টোবর পর্যন্ত প্রতিদিন সকাল ৮টায় ঢাকা থেকে একটি ফ্লাইট বোয়িং ৭৭৭ বিমানে দাম্মামের উদ্দেশ্যে ছাড়বে।
জেদ্দার ক্ষেত্রে ২২ অক্টোবর ঢাকা থেকে দুটি ফ্লাইট পরিচালনার কথা বলা হয়েছে। ২৩, ২৪ ও ২৫ অক্টোবর প্রতিদিন সন্ধ্যা ৭টা ২০ মিনিটে একটি করে জেদ্দাগামী ফ্লাইট ছাড়বে। মদিনাগামী ফ্লাইট ১৮ অক্টোবর থেকে বোয়িং ৭৮৭ বিমানে স্বাভাবিকভাবে চলছে এবং পরবর্তী নির্দেশনা না আসা পর্যন্ত এই সময়সূচি অপরিবর্তিত থাকবে। টিকিট, বুকিং ও যাতায়াতসংক্রান্ত তথ্যের জন্য যাত্রীদের নিকটতম বিমান বিক্রয় কেন্দ্রে যোগাযোগ করার পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি।
এখনো যা অজানা: রিয়াদে সব ফ্লাইট কবে স্বাভাবিক হবে, ২৫ অক্টোবরের ফ্লাইটের পর অন্য ফ্লাইট চালুর সিদ্ধান্ত কবে হবে, বাতিল হওয়া টিকিটের ক্ষেত্রে টাকা ফেরত বা নতুন করে বুকিংয়ের নিয়ম কী—এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর এখনো নেই। ট্রানজিট এয়ারলাইনসগুলো কবে নিজেদের সময়সূচি পুরোপুরি স্বাভাবিক করবে, তাও নিশ্চিত নয়। বিমান শুধু বলেছে, পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
ক্ষতিগ্রস্ত যাত্রীর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে, কারণ বিধিনিষেধ পুরোপুরি প্রত্যাহার হয়নি এবং অনেক ফ্লাইট আগামী দিনগুলোতেও বাতিল বা সময় পরিবর্তনের মুখে পড়তে পারে। প্রবাসী কর্মী, ব্যবসায়ী ও ধর্মীয় উদ্দেশ্যে সৌদি যাওয়া যাত্রীদের জন্য ঢাকা-সৌদি রুট একটি ব্যস্ত করিডোর। ফলে ফ্লাইট বন্ধ দীর্ঘ হলে শুধু যাতায়াত নয়, কর্মজীবন ও পারিবারিক পরিকল্পনাও ব্যাহত হবে।
সৌদি আরব বাংলাদেশি কর্মীদের অন্যতম বড় গন্তব্য। নির্মাণ, সেবা, পরিবহন ও ব্যবসাসহ বিভিন্ন খাতে বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি সেখানে কাজ করেন। এ কারণে বিমানবন্দরের সাময়িক বিধিনিষেধও হাজারো পরিবারের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে ২৫ অক্টোবরের রিয়াদ ফ্লাইট, ২৬ অক্টোবর পর্যন্ত দাম্মাম সূচি এবং জেদ্দা ও মদিনার বর্ধিত ফ্লাইট কার্যক্রমের ওপর নজর রাখছেন যাত্রীরা।



