উন্নয়নকাজের কারণে দীর্ঘ নয় বছর বন্ধ থাকার পর রাজধানীর গুলিস্তানের ওসমানী উদ্যান মঙ্গলবার সকাল থেকে সাধারণ মানুষের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে। তবে উদ্যানে ঢুকতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) জনপ্রতি ১০ টাকা ফি নিচ্ছে। সোমবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান উদ্যানটি এবং ভেতরে নির্মিত জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ উদ্বোধন করেন।

নগর ভবন ও বাংলাদেশ সচিবালয়ের মাঝখানে প্রায় ২২ একর জমিতে উদ্যানটি অবস্থিত। মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি জেনারেল মুহাম্মদ আতাউল গণি ওসমানীর নামে এর নামকরণ করা হয়েছে। নগরবাসীর একটি বড় অংশ এটিকে ‘ঢাকার ফুসফুস’ বলে ডাকে। অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে রাজধানীতে খোলা মাঠ ও পার্ক কমে আসছে; তাই এই উদ্যানের বন্ধ ও পুনরায় খোলা নগরবাসীর কাছে গুরুত্বপূর্ণ। সংস্কারের আগে উদ্যানে প্রবেশে কোনো ফি ছিল না; রমনা পার্ক ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানেও এখন প্রবেশ ফি নেই।

মঙ্গলবার সকালে উদ্যানের ফটকে টিকিট কাটতে দেখা যায়। আজিমপুরের বাসিন্দা রাবেয়া খাতুন সন্তানকে নিয়ে উদ্যানে এসেছিলেন। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ফেসবুকে উদ্যান খোলার খবর দেখে এসে গেটে দুইজনের জন্য ২০ টাকা চাওয়া হয়। নয় বছর বন্ধ থাকার পর উদ্যান খুললেও আবার টাকা লাগবে—এ নিয়ে তিনি অসন্তোষ প্রকাশ করেন।

ডিএসসিসির প্রশাসক আবদুস সালাম প্রথম আলোকে বলেন, উদ্যানের পরিবেশ ঠিক রাখা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্যই প্রবেশমূল্য রাখা হয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, আশপাশে হকারসহ বিভিন্ন মানুষ থাকেন; ফি না থাকলে অনেকে উদ্যান অপরিচ্ছন্ন করে ফেলতে পারেন। প্রতিদিন ১৫ থেকে ১৬ জন পরিচ্ছন্নতাকর্মী প্রয়োজন হয় বলেও তিনি জানান।

ফটকে টিকিট নিচ্ছিলেন নিজেকে ডিএসসিসির সম্পত্তি বিভাগের কর্মচারী হিসেবে পরিচয় দেওয়া মোহাম্মদ হানিফ। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, উদ্যানের উন্নয়নে অনেক টাকা খরচ হয়েছে; সেই ব্যয়ের বিষয়টি মাথায় রেখে সিটি করপোরেশন তাঁদের এই দায়িত্ব দিয়েছে।

নগর-পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান প্রবেশ ফি তুলে নেওয়ার পক্ষে নন। তিনি বলেন, পার্ক ও খেলার মাঠ জনস্বাস্থ্যের অবকাঠামো; এসব জায়গায় ফি নেওয়া অন্যায্য। নিয়মিত হাঁটতে আসা মানুষ ফি-এর কারণে আসা কমিয়ে দিতে পারেন। তাঁর মতে, ব্যয় ও কংক্রিটের ব্যবহার নিয়েও স্বাধীন তদন্ত হওয়া উচিত।

উদ্যানটি বন্ধ হয় উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ শুরুর পর। ডিএসসিসির তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালে ১০৮ কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হয়; ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে তৎকালীন মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন কাজের উদ্বোধন করেন। প্রকল্প শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২০ সালের ডিসেম্বরে। প্রথম ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান ‘দ্য বিল্ডার্স ইঞ্জিনিয়ার্স’-এর কার্যাদেশ বাতিলের পর ২০২৩ সালে পিএফ করপোরেশনকে কাজ দেওয়া হয়।

পরে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদের স্মরণে স্মৃতিস্তম্ভ ও দুটি প্রবেশফটক নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের প্রকল্পের ব্যয় ৪৬ কোটি টাকা থেকে কমে ৩৯ কোটি টাকায় নামে। প্রথম আলোর হিসাবে, নয় বছরে উদ্যানে বিভিন্ন স্থাপনায় প্রায় ১৪৭ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। স্মৃতিস্তম্ভটির উচ্চতা ৯০ ফুট; এতে ৮৩৪ জন শহীদের নাম খোদাই করা হয়েছে।

প্রকল্পের আওতায় সীমানাপ্রাচীর, নগর জাদুঘর, গ্রন্থাগার, ১২টি দোকান, জিমনেশিয়াম, গাড়ি পার্কিং, হাঁটার পথ, জলাশয় ও বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র নির্মিত হয়েছে। তবে উদ্বোধনের দিনও জাদুঘর, গ্রন্থাগার, জিমনেশিয়াম ও দোকানগুলো চালু হয়নি। হাঁটার পথের কাজও অসম্পূর্ণ। দুটি জলাশয়ের একটি শুকনো; অন্যটির পানিতে কচুরিপানা ও প্লাস্টিক বর্জ্য দেখা গেছে।

প্রকল্প পরিচালক সাইফুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, উদ্যানটি ডিএসসিসির সম্পত্তি বিভাগকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। কোনো প্রতিষ্ঠানকে ইজারা বা পরিচালনার দায়িত্ব না দেওয়া পর্যন্ত সিটি করপোরেশনই রক্ষণাবেক্ষণ করবে—এমন সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে ফটকে টিকিটের ব্যবস্থা। আজকের পত্রিকাকে তিনি বলেন, আগের ঠিকাদার হাঁটার পথের কাজ করেছে; মানের কারণে তাদের বাদ দেওয়ার পর নতুন ঠিকাদার ওই কাজ করেনি।

প্রবেশ ফি কতদিন থাকবে, তা নিয়ে ডিএসসিসির কোনো লিখিত সিদ্ধান্ত প্রকাশ্যে আসেনি। দিনে কতজন দর্শনার্থী আসছেন, ফি থেকে কত আয় হচ্ছে, তা নিয়েও কোনো হিসাব দেওয়া হয়নি। জাদুঘর, গ্রন্থাগার ও জিমনেশিয়াম কবে খুলবে, সে সময়সূচিও জানানো হয়নি। পরিচ্ছন্নতাকর্মীর সংখ্যা বা রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয়ের স্বাধীন যাচাইও এখনো হয়নি।

ডিএসসিসি বলছে, তারা উদ্যানের রক্ষণাবেক্ষণ চালিয়ে যাবে। দর্শনার্থীদের একটি অংশ ফি প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন; নগর-পরিকল্পনাবিদরা চাইছেন ব্যয় ও নির্মাণকাজের পুনর্মূল্যায়ন। আগামী কয়েক সপ্তাহে দর্শনার্থীর ভিড়, পরিচ্ছন্নতার অবস্থা এবং ফি বহাল থাকে কি না—এসবই বোঝাবে উদ্যানটি কেমনভাবে পরিচালিত হবে।