আগামী ১ নভেম্বর থেকে দেশের নির্ধারিত শ্রেণির খাদ্য ব্যবসা ও খাদ্যপণ্যের জন্য বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের (বিএফএসএ) নিবন্ধন ও লাইসেন্স বাধ্যতামূলক হবে। বুধবার কর্তৃপক্ষের জারি করা এক বিজ্ঞপ্তিতে সব সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও প্রতিষ্ঠানকে ওই তারিখের আগে প্রয়োজনীয় আবেদন সম্পন্ন করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩ ও ‘নিরাপদ খাদ্য (রেজিস্ট্রেশন ও লাইসেন্স) প্রবিধানমালা, ২০২৬’ অনুসারে চার ধরনের লাইসেন্স নিতে হবে—ব্যবসার লাইসেন্স, প্রতিষ্ঠান বা প্রিমিসেসের লাইসেন্স, উৎপাদিত ও আমদানিকৃত পণ্যের লাইসেন্স এবং লাইসেন্সপ্রাপ্ত পণ্যের নিবন্ধন। এর পাশাপাশি তফসিলে উল্লেখ করা ১৬ শ্রেণির খাদ্য ব্যবসা ও প্রতিষ্ঠানের জন্য নিবন্ধন লাগবে।
যাদের নিবন্ধন লাগবে তাদের মধ্যে রয়েছেন রেস্তোরাঁ, বেকারি, ফলের রসের দোকান, পেস্ট্রি শপ ও ক্যাটারিং সেবাদাতা। একই নিয়ম প্রযোজ্য হবে প্যাকেটজাত খাবার উৎপাদনকারী, মিষ্টির দোকান, দুগ্ধপণ্য প্রস্তুতকারী এবং কাঁচা ও তাজা খাদ্য ছাড়া অন্য খাদ্য আমদানিকারকদের ক্ষেত্রেও। রাস্তার ধারে পিঠা, পুরি ও পেঁয়াজু বিক্রি করা ভ্রাম্যমাণ ও অস্থায়ী দোকানকেও নিবন্ধনের আওতায় আনা হয়েছে।
নিবন্ধনের তালিকায় আরও আছে পাইকারি মুদি ব্যবসা, কাঁচা ও তাজা খাদ্য আমদানি, খাদ্য সংরক্ষণাগার ও কোল্ড স্টোরেজ, ভোজ্যতেল ও ভোজ্য লবণ উৎপাদন এবং বিভিন্ন ধরনের প্রক্রিয়াজাত ও বিশেষ খাদ্যপণ্যের উৎপাদন, মজুত, আমদানি, রপ্তানি ও বিপণন।
বিশেষ ধরনের খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রে নিবন্ধনের বদলে লাইসেন্স নিতে হবে। এর মধ্যে আছে শিশুর ফর্মুলা দুধ, বয়স্ক ও নির্দিষ্ট রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য তৈরি খাবার, স্বাস্থ্য সহায়ক ও সম্পূরক খাদ্য, বিশেষ পথ্য ও চিকিৎসাসংক্রান্ত পথ্য, প্রোবায়োটিক ও প্রিবায়োটিক, নিউট্রাসিউটিক্যাল, জিনগতভাবে পরিবর্তিত খাদ্য, জৈব খাদ্য, কিরণ-সম্পাতকৃত খাদ্য এবং স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত দাবি সম্বলিত খাদ্য।
আবেদন করতে হবে প্রবিধানের তফসিল-১০-এ নির্ধারিত ফি দিয়ে। লাইসেন্সের ক্ষেত্রে ফরম ৬.১, ৭.১, ৮.১ ও ৯.১ এবং নিবন্ধনের ক্ষেত্রে ফরম ৫.১ ব্যবহার করতে হবে। নিবন্ধন ও লাইসেন্স তিন বছর মেয়াদি হবে; মেয়াদ শেষে নবায়ন করতে হবে। প্রতিটি খাদ্যপণ্যের প্যাকেটে বিএফএসএ নিবন্ধন নম্বর উল্লেখ করতে হবে, যাতে ভোক্তা পণ্য দেখেই প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন আছে কি না বুঝতে পারেন এবং প্রয়োজনে ওই নম্বর উল্লেখ করে অভিযোগ করতে পারেন।
বিএফএসএ বলেছে, নিবন্ধন বা লাইসেন্স নেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকা সত্ত্বেও তা ছাড়া খাদ্য ব্যবসা পরিচালনা করা নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩ অনুযায়ী দণ্ডনীয় অপরাধ। প্রাথমিকভাবে সংশ্লিষ্ট জেলা কার্যালয়ে আবেদন করা যাবে; কর্তৃপক্ষ ধাপে ধাপে শতভাগ অনলাইন আবেদন চালুর পরিকল্পনা নিয়েছে।
পটভূমি হলো, নতুন প্রবিধানমালাটি গত ১৬ জুলাই সরকারি গেজেটে প্রকাশিত হয়। কর্তৃপক্ষ বলছে, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণ এবং খাদ্য ব্যবসায় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠাই এর উদ্দেশ্য। তবে নিয়মটি ব্যবসার ওপর বাড়তি বোঝা ফেলবে বলে এর আগেই উদ্বেগ জানিয়েছিলেন শিল্প ও রেস্তোরাঁ মালিকদের প্রতিনিধিরা।
দ্য ডেইলি স্টারকে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের বিপণন পরিচালক কমরুজ্জামান কামাল বলেছিলেন, ব্যবসা শুরুর জন্য তাঁদের ইতিমধ্যেই ১৭টি সরকারি দপ্তর ও সংস্থার লাইসেন্স ও নিবন্ধন নিতে হয়। নতুন নিয়মকে তিনি কার্যত ‘১৮ নম্বর লাইসেন্স’ হিসেবে বর্ণনা করেন এবং প্রশ্ন তোলেন, বিএফএসএর এই নিয়ম কার্যকর করার সক্ষমতা আছে কি না। মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফা কামালও বলেছিলেন, একের পর এক সংস্থার তদারকি এলে এক্তিয়ার ও দায়িত্ব নিয়ে সংঘাত তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ইমরান হাসান দ্য ডেইলি স্টারকে বলেছিলেন, শুধু একটি প্রবিধান বা গেজেট জারি করে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় না। সমিতির হিসাবে দেশে রেস্তোরাঁর সংখ্যা প্রায় ৪ লাখ ৮১ হাজার। তাঁর মতে, পরিকল্পনাহীনভাবে একসঙ্গে নিয়ম চাপালে ব্যবসার ওপর চাপ বাড়বে এবং অনিয়মের সুযোগও তৈরি হতে পারে।
এই উদ্বেগের জবাবে বিএফএসএর সদস্য (এনফোর্সমেন্ট) মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেছেন, প্রাথমিকভাবে বড় আকারের শিল্পোৎপাদন ও বড় প্রতিষ্ঠানের ওপর নজর দেওয়া হবে। বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনসহ (বিএসটিআই) স্বীকৃত সংস্থার সনদ থাকা প্রতিষ্ঠানের ওপর এখনই অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ করা হবে না। তবে বিএফএসএ আলাদাভাবে খাদ্যের মান ও উৎপাদন প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করবে। তিনি জানান, চারটি বন্দরে ২৫ জন সিনিয়র ফুড সেফটি অফিসার নিয়োগের কাজ চলছে, যাতে আমদানিকৃত খাদ্যপণ্যে ভুল ঘোষণা ও ভেজাল ধরা যায়।
এখনো যা স্পষ্ট নয়: দেশে কত খাদ্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে নিবন্ধন বা লাইসেন্সের জন্য আবেদন করেছে, তার সরকারি হিসাব পাওয়া যায়নি। নিবন্ধন ফি নিয়ে প্রতিবেদনেও ভিন্ন তথ্য এসেছে—গত জুলাইয়ে দ্য ডেইলি স্টার নিবন্ধন ফি ১ হাজার টাকা বলে জানিয়েছিল, আর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর লিখেছে প্রথম দফায় ১৬ শ্রেণির নিবন্ধন বিনামূল্যে রাখা হয়েছে। প্রবিধানের ফি-তালিকা সহজ ভাষায় প্রকাশ করেনি কর্তৃপক্ষ।
ছোট ও অস্থায়ী দোকানগুলো কীভাবে আবেদন করবে, জেলা কার্যালয়ে সারি ও ঝামেলা এড়াতে অনলাইন ব্যবস্থা কবে পুরোপুরি চালু হবে, আর ১ নভেম্বরের পর কতটা কঠোরভাবে অভিযান শুরু হবে—এসব প্রশ্নেরও সরাসরি উত্তর এখনো দেওয়া হয়নি।
সামনের ধাপে ১ নভেম্বর থেকে নিয়মটি কার্যকর হবে। এরপর বিএফএসএ চাইলে অনিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারবে। ভোক্তাদের জন্য বাস্তব প্রভাব হবে প্যাকেটের নিবন্ধন নম্বর—সেটি দেখে তাঁরা প্রতিষ্ঠানের বৈধতা যাচাই করতে পারবেন এবং অভিযোগ জানাতে পারবেন। ব্যবসায়ীদের জন্য বড় প্রশ্ন একটাই: নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিবন্ধন ও লাইসেন্সের কাগজ শেষ করতে পারবেন কি না, আর ফি ও শর্ত কতটা সহনীয় হবে।



