২০২০ সাল থেকে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় ৭ হাজার ৯৬৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। বুধবার প্রকাশিত রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের এক প্রতিবেদনে এই হিসাব দেওয়া হয়েছে। প্রায় সাত বছরের হিসাবটি ভাগ করলে দেখা যায়, প্রতিদিন গড়ে তিনজনের বেশি শিশু সড়কে প্রাণ হারিয়েছে।

প্রতিবেদনটি তৈরি হয়েছে নয়টি জাতীয় দৈনিক, ১৭টি জাতীয় ও আঞ্চলিক অনলাইন সংবাদমাধ্যম, ইলেকট্রনিক গণমাধ্যম এবং সংস্থার নিজস্ব তথ্যের ভিত্তিতে। সংস্থাটি জানিয়েছে, শিশুমৃত্যুর ধরন, সড়কের শ্রেণি, দুর্ঘটনার সময় ও বয়সভিত্তিক আলাদা আলাদা হিসাব তারা করেছে।

নিহত শিশুদের মধ্যে ২ হাজার ৯৫৮ জন মোটরসাইকেলের চালক বা আরোহী ছিলেন। এটি মোট মৃত্যুর ৩৭ দশমিক ১৪ শতাংশ। পথচারী হিসেবে প্রাণ গেছে ২ হাজার ৮১২ শিশুর, যা ৩৫ দশমিক ৩১ শতাংশ। এ ছাড়া বিভিন্ন যানবাহনের যাত্রী ছিলেন ২ হাজার ১৯৩ শিশু।

রাস্তা পার হওয়া বা পথে হাঁটার সময় নিহত শিশুদের মধ্যে ১ হাজার ২৭১ জনকে ধাক্কা দিয়েছে সিএনজিচালিত অটোরিকশা, অটোরিকশা এবং নসিমন-ভটভটির মতো তিন চাকার যান। এই সংখ্যা পথচারী শিশুমৃত্যুর ৪৫ দশমিক ১৯ শতাংশ। বাস, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও পিকআপের ধাক্কায় মারা গেছে ১ হাজার ১২৬ শিশু, অর্থাৎ ৪০ দশমিক ০৪ শতাংশ। প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস, অ্যাম্বুলেন্স ও জিপের ধাক্কায় ৩১৭ শিশুর এবং মোটরসাইকেলের ধাক্কায় ৯৮ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

কোন ধরনের সড়কে বেশি শিশু মারা গেছে, সেই হিসাবেও গ্রামীণ সড়ক এগিয়ে আছে। গ্রামীণ সড়কে ২ হাজার ৭১৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে, যা মোটের ৩৪ দশমিক ০৭ শতাংশ। আঞ্চলিক সড়কে প্রাণ গেছে ২ হাজার ৮২ শিশুর, মহাসড়কে ১ হাজার ৯৭৪ এবং শহরের সড়কে ১ হাজার ১৯৪ শিশুর।

দিনের কোন সময়ে দুর্ঘটনা বেশি ঘটছে, তা দেখেও বিকেলের চিত্র পাওয়া গেছে। বিকেলে নিহত হয়েছে ২ হাজার ৬৩৪ শিশু, মোটের ৩৩ দশমিক ০৭ শতাংশ। সকালে ২ হাজার ১৬৮, দুপুরে ১ হাজার ৮১৩, রাতে ৫৯৮, সন্ধ্যায় ৫৪৬ এবং ভোরে ২০৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

বয়সভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি, অর্থাৎ ৩ হাজার ৫৪৭ শিশুর বয়স ছিল ১৩ থেকে ১৭ বছর। এটি মোট মৃত্যুর ৪৪ দশমিক ৫৪ শতাংশ। ৬ থেকে ১২ বছর বয়সী ২ হাজার ৮৮৪ শিশু এবং পাঁচ বছর বা তার কম বয়সী ১ হাজার ৫৩২ শিশু প্রাণ হারিয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়া-আসার পথে ২ হাজার ৫১৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এটি মোট মৃত্যুর ৩১ দশমিক ৫৫ শতাংশ। বাড়ির আশপাশের সড়কে খেলার সময় প্রাণ গেছে ৯৬২ শিশুর, যা ১২ দশমিক ০৮ শতাংশ।

মৃত্যুর কারণ হিসেবে সংস্থাটি বলেছে, সড়ক ও পরিবহনব্যবস্থা শিশুদের নিরাপত্তার কথা ভেবে তৈরি নয়। শিশুদের সড়ক ব্যবহারের সচেতনতা কম, পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ বিষয়ে প্রশিক্ষণও নেই। অদক্ষ ও অপ্রাপ্তবয়স্ক চালকদের যান চালানো, আহত শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত চিকিৎসাসুবিধা না থাকা এবং চিকিৎসার খরচ জোগাতে পরিবারের অসামর্থ্যও মৃত্যু বাড়াচ্ছে।

গ্রামীণ সড়কের ঝুঁকি নিয়ে প্রতিবেদনে আলাদা করে বলা হয়েছে, এসব সড়ক অনেক সময় বসতবাড়ির কাছ দিয়েই চলে। সেখানে যানবাহন নিয়ম না মেনে চলাচল করে, আর ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতি সীমিত। ফলে শিশুরা সহজেই দুর্ঘটনার মুখে পড়ছে।

সংস্থার নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমানের পাঠানো প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সড়কের অব্যবস্থাপনার কারণে শিশুরা নিহত হচ্ছে এবং পঙ্গু হয়ে পড়ছে। প্রতিবেদনে এই ক্ষতিকে জাতির জন্য অপূরণীয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রসঙ্গত, ২০১৮ সালে নিরাপদ সড়কের দাবিতে ছাত্রদের আন্দোলনের পর সড়ক পরিবহন আইন পাস হয়। রোড সেফটি ফাউন্ডেশন বলছে, আইন থাকলেও বাস্তবায়নে ঘাটতি রয়েছে। সংস্থাটি শিশুবান্ধব সড়ক ও পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলা, পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতা বাড়ানো এবং অদক্ষ ও অপ্রাপ্তবয়স্ক চালকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে।

পাশাপাশি জেলা পর্যায়ের হাসপাতালে দুর্ঘটনায় আহতদের চিকিৎসাসেবা বাড়ানো, চিকিৎসার খরচ মেটাতে বিশেষ সরকারি তহবিল গঠন এবং ২০১৮ সালের সড়ক পরিবহন আইন পুরোপুরি বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।

এখনো যা অজানা: প্রতিবেদনে বছরভিত্তিক মৃত্যুর আলাদা হিসাব দেওয়া হয়নি, তাই কোন বছরে সংখ্যা বেড়েছে বা কমেছে তা স্পষ্ট নয়। সংবাদপত্র ও অনলাইন সংবাদমাধ্যমের তথ্য সংগ্রহের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি হওয়ায় প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় বা বিআরটিএ এই প্রতিবেদনের বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কী বলেছে, তাও দুই সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ নেই।

সামনে দেখার বিষয় হলো, সুপারিশগুলো কতটা বাস্তবায়িত হয়। স্কুলপথে ও গ্রামীণ সড়কে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসন ও স্থানীয় সরকারের সমন্বয়ে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়, অপ্রাপ্তবয়স্ক চালকদের বিরুদ্ধে অভিযান কতটা জোরদার হয় এবং জেলা হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা বাড়ে কি না—এসবই নির্ধারণ করবে আগামী দিনে শিশুমৃত্যুর সংখ্যা কমবে কি না।