নিজের দুটি বড় কোম্পানি টেসলা ও স্পেসএক্স একীভূত করার সম্ভাবনা সক্রিয়ভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ইলন মাস্ক। মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) স্পেসএক্সের ত্রৈমাসিক আয়ের ফলাফল নিয়ে বিনিয়োগ বিশ্লেষকদের সঙ্গে আলোচনায় তিনি বলেন, তিনি মনে করেন এটি একটি ভালো ধারণা হবে। তবে এতে কোনো নিশ্চিত ধারণা করা যাবে না।

মাস্ক জানান, দুই কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদের স্বাধীন পরিচালকদের নিয়ে আলাদা দুটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। শেয়ারহোল্ডারদের অনুরোধে এই কমিটি করা হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। নিজে কোনো কমিটির সদস্য নন বলে জানিয়ে মাস্ক বলেন, দুই কোম্পানির প্রধান নির্বাহী হিসেবে তিনি ‘স্বার্থ-সংঘাতযুক্ত পক্ষ’।

তবে কমিটি দুটি এখনো কোনো চুক্তির শর্ত নিয়ে একমত হয়নি। চুক্তি আদৌ হবে কি না, তাও নিশ্চিত নয়। মাস্কের ভাষায়, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত শেয়ারহোল্ডারদের হাতে। বিশেষ করে টেসলার ক্ষেত্রে সব শেয়ারের অন্তত ৫০ শতাংশের সমর্থন দরকার, শুধু ভোট দেওয়া শেয়ারহোল্ডারদের নয়। এই শর্ত পূরণ করা কঠিন একটি বাধা বলে তিনি উল্লেখ করেন।

বাজার বিশ্লেষকদের হিসাবে টেসলার মূল্য এখন প্রায় ১ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার এবং স্পেসএক্সের প্রায় ২ ট্রিলিয়ন ডলার। দুটি একীভূত হলে মিলিত কোম্পানির মূল্য ৩ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে, যা ইতিহাসের সবচেয়ে বড় একীভূতকরণগুলোর একটি হবে।

ঘোষণার পর স্পেসএক্সের শেয়ারের দাম আফটার আওয়ারস ট্রেডিংয়ে ৮ শতাংশ বেড়েছে। টেসলার শেয়ার বেড়েছে ২ শতাংশ। এর আগে কয়েক সপ্তাহ ধরে টেসলার শেয়ার কিছুটা নিম্নমুখী ছিল। টেসলা বুধবার নিজের ত্রৈমাসিক ফলাফল প্রকাশ করবে।

স্পেসএক্সের আয়ের প্রতিবেদনে দেখা যায়, অ্যানথ্রোপিক ও গুগলের মতো প্রযুক্তি কোম্পানিকে ক্লাউড কম্পিউটিং সেবা দেওয়ার ব্যবসা এখন কোম্পানিটির সবচেয়ে লাভজনক অংশ। এই খাত থেকে সর্বশেষ প্রান্তিকে ৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার আয় হয়েছে; স্টারলিংকের আয় ৫ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার। তবে সামগ্রিকভাবে স্পেসএক্স এখনো লাভজনক নয় এবং চলতি বছর এ পর্যন্ত ১ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার লোকসান হয়েছে।

গত এক বছরে মাস্ক তাঁর বিভিন্ন কোম্পানিকে কাছাকাছি আনতে শুরু করেছেন। চলতি বছর শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার আগে স্পেসএক্স নিজের মালিকানাধীন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠান xAI এবং এক্সকে (সাবেক টুইটার) কিনে নেয়। টেসলা ও স্পেসএক্স মিলে চিপ তৈরির যে উদ্যোগ নিয়েছে, তার নাম দেওয়া হয়েছে টেরাফ্যাব।

মাস্কের যুক্তি হলো, চিপ ডিজাইন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সফটওয়্যার, রোবোটিকস ও মহাকাশে যন্ত্রাংশ পাঠানোর কাজে দুই কোম্পানির সহযোগিতা বাড়লে বড় সুবিধা মিলবে। তিনি স্পেসএক্সের স্টারমাইন্ড স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক এবং ভবিষ্যতে মঙ্গলে মানুষের বসতি স্থাপনের পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন।

তবে বিশ্লেষকরা কিছু ঝুঁকির দিকেও ইঙ্গিত করেছেন। কোন কোম্পানি অন্যটিকে আত্মস্থ করবে, তা এখনো পরিষ্কার নয়। টেসলা যদি স্পেসএক্সকে কিনে নেয়, তবে নতুন বিপুল পরিমাণ শেয়ার ছাড়তে হবে; এতে বর্তমান টেসলা শেয়ারহোল্ডারদের অংশ কমে যাবে। উল্টোদিকে স্পেসএক্সের উৎক্ষেপণ পরিকল্পনায় প্রতি বছর কয়েক হাজার কোটি ডলার প্রয়োজন, যা টেসলার নতুন কারখানা ও ব্যাটারি প্রকল্পের বিনিয়োগে চাপ ফেলতে পারে।

ওয়াল স্ট্রিটের বেশিরভাগ বিশ্লেষক মনে করেন, টেসলাকে কিনবে স্পেসএক্স—কারণ শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার পর স্পেসএক্সের মূল্য টেসলার চেয়ে বেশি রয়েছে। বার্কলেইসের একটি ক্লায়েন্ট নোটে ধারণা করা হয়েছে, আগামী ৩ ডিসেম্বর টেসলার বার্ষিক শেয়ারহোল্ডার সভার আগে একীভূতকরণের ঘোষণা আসতে পারে।

এখনো যা অজানা: চুক্তির শর্ত, কোন কোম্পানি কোনটিকে আত্মস্থ করবে, বিশেষ কমিটির সদস্যরা কারা এবং কত সময়ে প্রক্রিয়াটি শেষ হবে—এসবের কোনো স্পষ্ট উত্তর নেই। এ ধরনের বড় একীভূতকরণে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর অনুমোদনও লাগবে। তাই সামনের দিনগুলোতে টেসলার ত্রৈমাসিক ফলাফল, শেয়ারহোল্ডারদের প্রতিক্রিয়া এবং কমিটির সিদ্ধান্তই বলে দেবে, এই আলোচনা সত্যিই চুক্তিতে গড়ায় কি না।