চট্টগ্রাম নগরের জেএম সেন হলে দুর্গাপূজার শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, চলতি বছর ৪১ লাখ গৃহকর্ত্রী ফ্যামিলি কার্ড পাবেন। কার্ডের যোগ্যতা নির্ধারণে ধর্ম, বর্ণ কিংবা কারও ‘ঐতিহাসিক ভূমিকা’ বিবেচনা করা হবে না; বিবেচনায় আসবে পরিবারের প্রকৃত প্রয়োজন।

মন্ত্রীর বক্তব্য ছিল এমন: ‘প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় এ বছর ৪১ লাখ গৃহকর্ত্রীকে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হবে। কারা পাবে, এখানে ধর্ম-বর্ণের কোনো বিষয় নেই। একেবারে যারা হতদরিদ্র, তাদের থেকে শুরু করে আমরা ওপরের দিকে যাচ্ছি। কে কোন ধর্মের, কোন বর্ণের, তার ঐতিহাসিক ভূমিকা কী—এসব কিছুই বিবেচ্য নয়। যাদের প্রয়োজন, তারা পাবে, সে যে ধর্মেরই হোক।’ কালবেলা ও ভিওডি বাংলার প্রতিবেদনে এই উদ্ধৃতি প্রকাশ করা হয়েছে।

অনুষ্ঠানটি ছিল পূজা কমিটির আমন্ত্রণে শুভেচ্ছা বিনিময়ের কর্মসূচি। সেখানে অর্থমন্ত্রী সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি নিয়ে সংক্ষেপে কথা বলেন। তিনি কার্ড বিতরণের সময়সূচি বা জেলাভিত্তিক পরিকল্পনা ঘোষণা করেননি। ফলে ৪১ লাখ গৃহকর্ত্রী কবে, কীভাবে কার্ড হাতে পাবেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

ফ্যামিলি কার্ড সরকারের অন্যতম প্রধান সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি। গত ১০ মার্চ রাজধানীর বনানীতে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রথম পর্যায়ে ১৪টি স্থানে পরীক্ষামূলকভাবে ৩৭ হাজার ৫৬৭ জন নারীকে কার্ড দেওয়া হয়। কর্মসূচির আওতায় পরিবারের প্রধান নারী সদস্য মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা ভাতা পাওয়ার কথা।

চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এই খাতে ১৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যার ১২ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ভাতা প্রদানের জন্য। বছরের শুরুতে পেশ করা বাজেটে ৪১ লাখ নারীকে কার্ড দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়। এর আগে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কর্মসূচির পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু হয়।

যোগ্য পরিবার চিহ্নিত করতে ১২ অক্টোবর থেকে সারাদেশে বাড়ি বাড়ি তথ্য সংগ্রহ শুরু হয়েছে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের হিসাবে এ কাজে ৬৬ হাজার ৮১৫ জন প্রশিক্ষিত তথ্য সংগ্রহকারী ও ৬ হাজার ৬৮১ জন সুপারভাইজার নিয়োজিত আছেন। প্রায় সাড়ে চার কোটি পরিবারের তথ্য এক ডাটাবেজে যুক্ত করার লক্ষ্য রয়েছে। সংগ্রহ চলবে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত; ডিসেম্বরের মধ্যে ডাটাবেজ প্রস্তুত হওয়ার কথা।

প্রক্সি মিনস টেস্ট (পিএমটি) পদ্ধতিতে ডাটাবেজ থেকে যোগ্য পরিবার স্বয়ংক্রিয়ভাবে চিহ্নিত হবে। সমাজকল্যাণমন্ত্রী এ জেড এম জাহিদ হোসেন গত ১২ অক্টোবরের সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, সাড়ে চার কোটি পরিবারের মধ্যে ১ কোটি ৬০ লাখ থেকে ২ কোটি ১০ লাখ অতিদরিদ্র, দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত পরিবার ভাতার যোগ্য হিসেবে চিহ্নিত হবে। আবেদনের জন্য সরকারি দপ্তরে যেতে হবে না; তথ্য সংগ্রহকারীরাই বাড়িতে যাবেন বলে তিনি জানান।

কার্ডে ডুয়েল চিপ, কিউআর কোড ও এনএফসি প্রযুক্তি থাকবে। এটি সরকারের ‘টাকা পে’ স্কিমের সঙ্গে যুক্ত থাকবে। ভাতা ব্যাংকের এটিএম, দোকানের পিওএস মেশিন কিংবা বিকাশ ও নগদের মতো মোবাইল আর্থিক সেবা থেকে তোলা যাবে। যোগ্য কেউ বাদ পড়লে ইউনিয়ন পরিষদের সেবা কেন্দ্রে অভিযোগ ও আপিল করা যাবে। তথ্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের আইবাস পদ্ধতির সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হবে।

তবে কোন ৪১ লাখ গৃহকর্ত্রী কার্ড পাবেন, তার তালিকা এখনো প্রকাশ করা হয়নি। সাড়ে চার কোটি পরিবারের মধ্যে ১ কোটি ৬০ লাখ থেকে ২ কোটি ১০ লাখ পরিবার যোগ্য বলে চিহ্নিত হলে, তাদের মধ্য থেকে ৪১ লাখকে কীভাবে বাছাই করা হবে—এ বিষয়ে সরকারি ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। বর্তমানে অন্য ভাতা পাওয়া পরিবারগুলোর সঙ্গে এই কর্মসূচির সম্পর্ক কী হবে, তাও স্পষ্ট নয়।

জেলা ও উপজিলাভিত্তিক বিতরণের সময়সূচিও ঘোষণা করা হয়নি। মন্ত্রী যে অনুষ্ঠানে কথা বলেছেন, সেটি ছিল ধর্মীয় উৎসবের শুভেচ্ছা বিনিময়; সেখানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জন্য আলাদা সংবাদ সম্মেলন হয়নি। তাই কার্ড বিতরণের শুরু, যোগ্যতার চূড়ান্ত মানদণ্ড ও আপিলের বিস্তারিত প্রক্রিয়া জানতে সরকারি ঘোষণার অপেক্ষা করতে হবে।

সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, তথ্য সংগ্রহ শেষে ডাটাবেজের ভিত্তিতে বিতরণের প্রক্রিয়া এগোবে। চূড়ান্ত তালিকা কবে প্রকাশ হবে এবং বিতরণ কয়টি ধাপে হবে, তা এখনো জানানো হয়নি। এর আগে যোগ্য পরিবার যাচাইয়ের কাজ শেষ করতে হবে।

৪১ লাখ কার্ড কার পাবে, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো পুরোপুরি নেই। তবে কর্মসূচির পরিধি বাড়ছে এবং বাছাইয়ের ভিত্তি হিসেবে ধর্ম বা রাজনৈতিক পরিচয় নয়, প্রয়োজনকে সামনে রাখার কথা বলছে সরকার। তথ্য সংগ্রহ ও যাচাই শেষে প্রথম ধাপের তালিকা প্রকাশ পেলে যোগ্যতা নির্ধারণ ও বিতরণের চিত্র আরও পরিষ্কার হবে।