উন্নত চাকরির আশায় রাশিয়ায় যাওয়া বাংলাদেশি তরুণদের একটি দলকে অল্প প্রশিক্ষণ দিয়ে ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়েছে। এই ঘটনায় গত তিন বছরে অন্তত ৫৪ বাংলাদেশির মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে বলে মঙ্গলবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে প্রথম আলো। পত্রিকাটি বলছে, নিহতদের বেশিরভাগের মরদেহ দেশে আসেনি, মৃত্যুর প্রমাণ না থাকায় পরিবারগুলো কোনো ক্ষতিপূরণও পায়নি।

বাংলাদেশি কর্মীদের এই দলটি গত ৭ মে রাশিয়ায় পৌঁছায়। তাদের পাঠানো হয়েছিল জাবালে নূর, আরএস ইন্টারন্যাশনাল ও টিএস গ্রুপ নামের তিনটি এজেন্সির মাধ্যমে। নির্মাণকাজে চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রত্যেকের কাছ থেকে গড়ে প্রায় ১০ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছিল বলে জানিয়েছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)।

১৪ অক্টোবর কারওয়ান বাজারে এসআরবির সংবাদ সম্মেলনে এসআরবি-১০-এর অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি মো. আসাদুজ্জামান জানান, রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর তাদের প্রতিশ্রুত কাজ দেওয়া হয়নি। ২১ দিনের প্রশিক্ষণ শেষে তাদের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়। প্রথম দিনেই ড্রোন হামলায় ১৭ জন নিহত হন, পরবর্তী সময়ে আরও তিনজন মারা যান। সব মিলিয়ে ৩০ জনের মধ্যে ২০ জনের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করেছে এসআরবি।

এসআরবি বলছে, ছয়জন এখনো যুদ্ধক্ষেত্রে আছেন। দুজন মস্কোর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। আহত হয়ে দেশে ফিরেছেন দুইজন। তাদের একজন ২১ বছর বয়সী রাজন হোসেন। ড্রোন হামলায় গুরুতর আহত হওয়ার পর তাঁকে দীর্ঘ চিকিৎসা ও দূতাবাসের সহায়তায় গত ২৩ আগস্ট দেশে ফেরানো হয়। অন্যজন নারায়ণগঞ্জের আদনান হোসেন, যিনি গত ১৫ সেপ্টেম্বর দেশে ফেরেন।

এসআরবি জানিয়েছে, এই চক্রের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে গত ১৩ অক্টোবর গ্রেপ্তার হন জাবালে নূর ইন্টারন্যাশনালের কর্তা মিজানুর রহমান (৫৫) ও আবু তাহের ওরফে লেন্টু (৫০)। রাজন হোসেনের বাবা মানবপাচার ও অভিবাসী চোরাচালানবিরোধী আইনে মামলা করেছেন। চক্রের অন্য সদস্যদের খুঁজে গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে বলে জানিয়েছে বাহিনীটি।

লালমনিরহাটের আবদুল্লাহ আল মামুন এই দলের একজন ছিলেন। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে প্রথম আলো লিখেছে, যুদ্ধে পাঠানোর আগের রাতে তিনি ছোট ভাইকে ফোন করে বলেছিলেন, তাঁকে যুদ্ধে পাঠানো হচ্ছে এবং দেখা না-ও হতে পারে। এরপর তাঁর সঙ্গে আর যোগাযোগ হয়নি। একই দলে যাওয়া আরেকজনের কাছে খবর পাওয়ার পর গ্রামে গায়েবানা জানাজা হলেও মৃত্যু নিশ্চিত না হওয়ায় লোকজন জানাজা না পড়ে মোনাজাত করেন। ঋণগ্রস্ত পরিবারটি এখন এক বছরের শিশুসন্তান নিয়ে অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছে।

সরকার বলছে, রাশিয়া যাওয়ার ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে এবং যাচাই না করে কাউকে ছাড়পত্র দেওয়া হচ্ছে না। প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, নিশ্চিত চাকরির তথ্য যাচাই-বাছাই ও সত্যায়ন না করে ছাড়পত্র দেওয়া হচ্ছে না এবং সব দূতাবাসকে সতর্ক করা হয়েছে।

রাশিয়ায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো. নজরুল ইসলামের ভাষ্য অনুযায়ী, যাঁরা গেছেন তাঁদের ৯০ শতাংশের বেশি নিজে থেকেই যুদ্ধে যোগ দিয়েছেন। সর্বশেষ ৩০ জনের বিষয়েও রাশিয়ার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তাঁরা স্বেচ্ছায় গেছেন এবং এর লিখিত প্রমাণ মস্কোর কাছে আছে। তিনি বলেন, রুশ কর্তৃপক্ষ মরদেহ হস্তান্তর করছে না, তাই দেশেও পাঠানো যাচ্ছে না।

বিএমইটির তথ্যে দেখা যায়, ২০২৩ সালে রাশিয়ায় যেতে ছাড়পত্র নিয়েছিলেন মাত্র ৩৭ জন। ২০২৪ সালে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৩৯৫ জনে, ২০২৫ সালে ৪ হাজার ৭২৫ জনে। চলতি বছরের ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত ছাড়পত্র নিয়েছেন ৩ হাজার ১০৫ জন।

গত মার্চে ব্যাংককভিত্তিক ফোর্টিফাই রাইটস ও ইউক্রেনভিত্তিক ট্রুথ হাউন্ডসের যৌথ তদন্তে বলা হয়েছিল, ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কমপক্ষে ১০৪ বাংলাদেশি রুশ সেনাবাহিনীতে নিয়োগ পেয়েছেন এবং তাঁদের মধ্যে কমপক্ষে ৩৪ জন নিহত হয়েছেন। গবেষকরা বাংলাদেশ ও ইউক্রেনে ফিরে আসা কর্মী ও নিহতদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে এই তথ্য সংগ্রহ করেন।

এখনো যা অজানা: রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে মোট কত বাংলাদেশি জড়িয়েছেন, কতজন নিহত হয়েছেন এবং কতজন এখনো যুদ্ধক্ষেত্রে আটকে আছেন, তার পূর্ণ হিসাব কারও কাছে নেই। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়ার সরকার চার-পাঁচ মাস ধরে যুদ্ধক্ষেত্রে নিখোঁজ ও নিহত বাংলাদেশিদের তথ্য দূতাবাসকে জানাচ্ছে; এখন পর্যন্ত ৪০ জনের তথ্য এসেছে, তবে কে নিহত ও কে নিখোঁজ তা আলাদা করে বলা হয়নি। সবশেষ ২০ জনের মৃত্যুর বিষয়ে রাশিয়া এখনো কিছু জানায়নি।

মৃত্যুর প্রমাণ না থাকায় পরিবারগুলো ক্ষতিপূরণের আবেদনও করতে পারছে না। ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের নিয়ম অনুযায়ী বিদেশে কর্মীর মৃত্যু হলে মরদেহ আনা ও আর্থিক সহায়তার আবেদন করা যায়; কিন্তু রাশিয়া থেকে মরদেহ না আসায় এবং মৃত্যুর কাগজপত্র না থাকায় সেই পথ আটকে আছে। রাশিয়ার ক্ষতিপূরণের প্রক্রিয়াও জটিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এসআরবি বলছে, যাঁদের পাঠানো হয়েছে তাঁদের কেউই যুদ্ধের জন্য প্রশিক্ষিত বা শারীরিকভাবে উপযুক্ত ছিলেন না। তদন্তকারীদের ধারণা, প্রতিপক্ষের অবস্থান শনাক্ত করতে তাঁদের সামনের সারিতে ব্যবহার করা হয়েছে। বাহিনীটি বলছে, একই পদ্ধতিতে অন্য দেশের নাগরিকদেরও যুদ্ধে পাঠানো হয়েছে বলে প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেছে।

কর্তৃপক্ষ বলছে, অভিযুক্ত তিন এজেন্সির লাইসেন্স গত ১ জুন বাতিল করা হয়েছে। এ ছাড়া চক্রের অন্য সদস্যদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। তবে পরিবারগুলোর মূল প্রশ্ন এখনো অপরিবর্তিত: তাঁদের স্বজনরা কোথায়, কতজন বেঁচে আছেন এবং মরদেহ বা ক্ষতিপূরণ কীভাবে পাওয়া যাবে।