লক্ষ্মীপুরে সরকারি সারের নতুন ডিলার তালিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত করা ৫৭ জন ডিলারের তালিকা বিশ্লেষণ করে প্রথম আলো বৃহস্পতিবার জানিয়েছে, তাঁদের মধ্যে কমপক্ষে ৪৫ জন বিএনপি বা দলটির সহযোগী সংগঠনের পদধারী, কর্মী অথবা স্থানীয় দলীয় নেতার স্বজন। জেলা প্রশাসন বা কৃষি অধিদপ্তর এখনো এ বিষয়ে সরকারিভাবে কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি।
জেলার ৫৮টি ইউনিয়ন ও চারটি পৌরসভার শূন্য ইউনিটে ডিলার নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। আবেদন জমা নেওয়া হয় গত ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত, তখন মোট ৩৩৬টি আবেদন পড়ে। উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটি আবেদন যাচাই-বাছাই করে সুপারিশসহ তালিকা জেলায় পাঠায় এবং জেলা তা কৃষি মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। ৭ অক্টোবর মন্ত্রণালয়ের সার ব্যবস্থাপনা ও মনিটরিং শাখার কৃষি অর্থনীতিবিদ শাহনাজ আক্তারের স্বাক্ষরিত চিঠিতে ৫৭ জনকে মনোনীত করে পরবর্তী কার্যক্রম নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
‘সার ডিলার নিয়োগ ও সার বিতরণ সংক্রান্ত সমন্বিত নীতিমালা-২০২৫’ অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন বা পৌরসভায় আবেদনকারীর নিজস্ব বা ভাড়া করা অন্তত ২৫ মেট্রিক টন ধারণক্ষমতার গুদাম থাকতে হবে। গুদামের মেঝে পাকা এবং স্বাভাবিক বন্যার পানির স্তরের ওপরে হতে হবে। ওই গুদামে খাদ্যপণ্য, রেস্তোরাঁর সামগ্রী, গবাদিপশু ও মাছের খাবার বা সবজি রাখা যাবে না, বীজও সংরক্ষণ করা যাবে না। আবেদনকারীকে ব্যাংকের অন্তত পাঁচ লাখ টাকার সাম্প্রতিক সচ্ছলতার সনদও জমা দিতে হয়। নীতিমালায় আগে থেকে সার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত আবেদনকারীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
প্রথম আলোর তালিকা বিশ্লেষণ অনুযায়ী, রায়পুর উপজেলার দক্ষিণ চরবংশী ইউনিয়নে ডিলার হয়েছেন স্থানীয় বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আমিনুল আজিজ। স্থানীয়দের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাঁর প্রতিষ্ঠান মেসার্স গাজী এন্টারপ্রাইজ আগে সার ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিল না। একইভাবে রামগঞ্জ পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক গিয়াস উদ্দিন ওরফে পলাশের প্রতিষ্ঠান মেসার্স ফাল্গুনী এন্টারপ্রাইজেরও সার ব্যবসার অভিজ্ঞতা ছিল না।
তালিকায় আরও আছেন রায়পুর উপজেলা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মেহেদী হাসান আইনান, বামনী ইউনিয়ন বিএনপির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি আমির হোসেন ওরফে ছুটু, জেলা ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. মাসুদ মিয়া, চরমোহনা ইউনিয়ন ছাত্রদলের সভাপতি ফাহিম ভূঁইয়া এবং দালাল বাজার ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি জাকির হোসেন। জাকিরের প্রতিষ্ঠান মূলত রড, সিমেন্ট ও নারকেলের ব্যবসা করে। এ ছাড়া নোয়াগাঁও ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. বিল্লাল পাটোয়ারী, করপাড়া ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আহসান হাবিবের প্রতিষ্ঠান, ভোলাকোটে যুবদলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক হাফেজ আহম্মদ, হাজিরহাট ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ইসমাইল হোসেন এবং চর কাদিরা ইউনিয়নে ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক বোরহান উদ্দিনের ছোট ভাই হেলাল উদ্দিনও মনোনীত হয়েছেন।
অভিযোগ উঠেছে, দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ ব্যবসায়ীরা বাদ পড়েছেন। চন্দ্রগঞ্জ বাজারে ২০০২ সাল থেকে সার বিক্রি করা মো. শোভন প্রথম আলোকে বলেছেন, সব নিয়ম মেনে আবেদন করেও রাজনৈতিক পরিচয় না থাকায় তিনি সুযোগ পাননি। চর কাদিরা ইউনিয়নের যুবদল নেতা শাহেদ হাওলাদার বলেছেন, তিনি এক যুগ ধরে সার বিক্রি করছেন, কিন্তু তাঁকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি; বরং এমন একজনকে ডিলার করা হয়েছে যিনি আগে কখনো সার ব্যবসা করেননি।
কমলনগরের চর মার্টিন ইউনিয়নে আবেদন করা তারেক রহমান ওরফে রকি অভিযোগ করেছেন, অযোগ্য ব্যক্তিদের ডিলার করা হয়েছে এবং অনেকেরই গুদাম বা সার বিক্রির অভিজ্ঞতা নেই। তাঁর পরিবার প্রায় ৫০ বছর ধরে সার ও কীটনাশকের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত এবং আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তাঁদের ডিলারশিপ বাতিল হয়েছিল। তিনি কমলনগর উপজেলা বিএনপির সভাপতি নুরুল হুদা চৌধুরীর বিরুদ্ধে টাকার বিনিময়ে ডিলার নিয়োগের অভিযোগও করেন।
নুরুল হুদা চৌধুরী অবশ্য অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেছেন, ডিলার নিয়োগে দলীয়ভাবে কোনো হস্তক্ষেপ করা হয়নি, সবাই নিজ নিজ যোগ্যতায় মনোনীত হয়েছেন। পাটারীরহাট ইউনিয়নের লোকমান হোসেনকে তিনি দূরসম্পর্কের চাচাতো ভাই বলে স্বীকার করেছেন, তবে চর ফলকনের মাহবুবুর রহমানকে ভাগনে বলে যে কথা ছড়িয়েছে তা অসত্য বলেছেন। তিনি আরও বলেছেন, নীতিমালা অনুযায়ী অভিজ্ঞ ব্যবসায়ীরাই অগ্রাধিকার পাওয়ার প্রত্যাশা ছিল তাঁরও।
মনোনীত কয়েকজনও রাজনৈতিক বিবেচনার অভিযোগ নাকচ করেছেন। আমিনুল আজিজ বলেছেন, যথাযথ কাগজপত্র জমা দিয়েই তিনি মনোনীত হয়েছেন। গিয়াস উদ্দিন ওরফে পলাশ বলেছেন, এলাকায় সারের চাহিদা কম, তবু তিনি ডিলারশিপ নিয়েছেন এবং এর জন্য রাজনৈতিক তদবির করেননি। আমির হোসেন বলেছেন, তিনি আগে অন্য ব্যবসা করেছেন এবং এবারই সার ব্যবসায় নতুনভাবে যুক্ত হচ্ছেন। কমলনগর উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিব মো. গিয়াস উদ্দিনও স্বীকার করেছেন, তিনি আগে কখনো সার ব্যবসা করেননি।
জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক এস এম মেহেদী হাসানকে ফোন করা হলে তিনি কল না নিয়ে বার্তা পাঠাতে বলেন; পরে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি জবাব দেননি। কমিটির সদস্যসচিব ও জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক জহির আহমেদ প্রথম আলোকে বলেছেন, তালিকায় বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের অনেক নেতা-কর্মী আছেন—এ তথ্য তিনি জানতে পেরেছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, উপজেলা কমিটি যাচাই-বাছাই করে সুপারিশ পাঠিয়েছিল এবং মন্ত্রণালয় চূড়ান্ত তালিকা দিয়েছে।
এর আগে ২০ অক্টোবর যুগান্তর জানায়, লক্ষ্মীপুর পৌরসভায় ইফাজ এগ্রোকে ডিলার করার সুপারিশের বিরুদ্ধে হামিদুর রহমান ও ইয়াছিনুর রহমান নামের দুই ব্যবসায়ী জেলা প্রশাসক ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে লিখিত অভিযোগ করেন। অভিযোগে বলা হয়, প্রতিষ্ঠানটিতে পশুখাদ্য বিক্রি হয় এবং এর মালিক জাকির হোসেনের ভাই ইকবাল হোসেন আগে থেকেই বিএডিসির সার ডিলার; এ ছাড়া প্রয়োজনীয় ২৫ মেট্রিক টন ধারণক্ষমতাও তাদের নেই। জাকির হোসেন ওই অভিযোগ হিংসাপ্রসূত বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। জহির আহমেদ তখন যুগান্তরকে বলেছিলেন, ডিলার নিয়োগ এখনো চূড়ান্ত হয়নি, শুধু সুপারিশ এসেছে।
এ নিয়ে এখনো কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট নয়। তালিকাটি চূড়ান্ত ডিলার নিয়োগ, নাকি কেবল সুপারিশ—সে ব্যাপারে দুই পত্রিকার বর্ণনা আলাদা। মন্ত্রণালয় আবেদন যাচাইয়ের প্রতিবেদন বা নম্বর প্রকাশ করেনি এবং অভিযোগের বিষয়ে কোনো তদন্তের ঘোষণাও আসেনি। জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মো. হাছিবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেছেন, গত ১৭ বছর দলের নেতা-কর্মীরা সার ডিলারসহ বিভিন্ন সুবিধা থেকে বঞ্চিত ছিলেন; দল ক্ষমতায় আসার পর অনেকে ব্যবসায় মনোযোগ দিচ্ছেন এবং সবাই নিয়ম মেনে আবেদন করেছেন, মনোনয়নে দলের প্রভাব ছিল না।
সার ডিলাররা সরকারি ইউরিয়া ও অন্যান্য সারের অন্যতম পরিবেশক। তাই কে ডিলার হবেন, তা শুধু রাজনৈতিক প্রশ্ন নয়, স্থানীয় সরবরাহ ও কৃষকের সার পাওয়ার ওপরও প্রভাব ফেলে। লক্ষ্মীপুরের চরাঞ্চলে সয়াবিনসহ নানা ফসলের চাষ হয় এবং সারের চাহিদা বেশি। অভিযোগ নিষ্পত্তি না হলে ও তালিকা প্রকাশ্যে ব্যাখ্যা না করা হলে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও কৃষকদের মধ্যে অনিশ্চয়তা থেকে যাবে।



