হরমুজ প্রণালি ও পারস্য উপসাগরে সাতটি জাহাজে হামলা ও আগুন লাগার কথা জানিয়েছে ইরানের ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) নৌবাহিনী। বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক বিবৃতিতে তারা বলেছে, বুধবার উত্তর পারস্য উপসাগরে অবৈধভাবে জাহাজ থেকে জাহাজে তেল স্থানান্তরে জড়িত থাকা চারটি জাহাজ তাদের বাহিনীর নজরে আসার পর একই সময়ে আঘাতপ্রাপ্ত হয় এবং আগুন ধরে যায়। বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, পশ্চিম হরমুজে আরও তিনটি জাহাজ নৌমাইনে ধাক্কা খেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ও অচল হয়ে পড়ে এবং সেখানেও আগুন লাগে।
এই ঘটনায় কেউ হতাহত হয়েছেন কি না, জাহাজগুলোর পতাকা ও মালিকানা কী এবং ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ কত, সেই তথ্য ইরানি বিবৃতিতে দেওয়া হয়নি। আল জাজিরা ও বার্তা সংস্থা এপি জানিয়েছে, ঘটনার ধরন নিয়ে কোনো স্বাধীন যাচাইও এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন দেশটির প্রভাবশালী এই বাহিনীর বিবৃতির বরাত দিয়ে খবরটি প্রচার করেছে।
এপির মূল্যায়নে, বিবৃতিটি সত্য হলে ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরুর পর একদিনে এত বেশি জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনা এটি হবে। তবে সংস্থাটি স্পষ্ট করেছে, জাহাজগুলোর পরিচয় বা হতাহতের সংখ্যা সম্পর্কে ইরানি পক্ষ কিছু জানায়নি।
বিবৃতিতে আইআরজিসি যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করেছে, তারা জাহাজগুলোকে ‘অবৈধ ও মাইন পেতে রাখা পথে’ দিয়ে পাঠাতে উৎসাহ দিচ্ছে। তাদের দাবি, এই নীতি অব্যাহত থাকলে সমুদ্রে ঘটনার সংখ্যা দিন দিন বাড়বে। ইরানি বাহিনী আরও বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি প্রণালির অন্য অংশ দিয়ে তেলবাহী জাহাজ পাঠানোর চেষ্টা করে, তাহলে অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটিগুলোও লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। আইআরজিসির ভাষায় এটি ‘গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা’।
ওয়াশিংটন অবশ্য ইরানের এই বর্ণনার সঙ্গে একমত নয়। গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান ব্র্যাড কুপার ভিডিও বার্তায় দাবি করেছিলেন, হরমুজ প্রণালি যুক্তরাষ্ট্র ও অঞ্চলভুক্ত অংশীদারদের নিয়ন্ত্রণে আছে, ইরানের নয়। আগের ঘটনাগুলোতেও দুই পক্ষ ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছে; কোনো জাহাজ মাইনে আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে, নাকি ক্ষেপণাস্ত্র বা অন্য অস্ত্রে, তা নিয়ে তাদের দাবি পরস্পরবিরোধী।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বুধবার সাউথ ক্যারোলাইনায় এক সমাবেশে বলেছেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ ‘খুব শিগগিরই’ শেষ হতে পারে। তাঁর ভাষায়, ‘আমরা এখনই চলে যেতে পারি, কিন্তু আমরা চাই এটি দীর্ঘদিন টিকিয়ে রাখা যায়।’ তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে পরাজিত করেছে এবং তেহরান কখনো পারমাণবিক অস্ত্র পাবে না। সমাবেশে তিনি হরমুজ প্রণালিকে ‘ট্রাম্প প্রণালি’ বলেও উল্লেখ করেন। সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্প জানান, ওয়াশিংটন তেহরানের সঙ্গে আলোচনা করছে না এবং ‘শিগগিরই’ কোনো একটি পরিণতি আসবে বলে তিনি মনে করেন।
চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে যৌথ হামলা শুরু করার পর থেকে উপসাগরীয় অঞ্চলে সংঘাত চলছে। ইরান এরপর ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন দিয়ে পাল্টা হামলা চালায় এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল কার্যত সীমিত করে দেয়। পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতায় জুনে এক সমঝোতা স্মারক সই হলেও প্রণালিতে চলাচলসহ নানা বিষয়ে মতবিরোধে তা কার্যকর হয়নি।
জাতিসংঘের সমুদ্রসুরক্ষা সংস্থা ইউকেএমটিওর হিসাবে, ১৬ অক্টোবর শেষ হওয়া সপ্তাহে অন্তত ১২টি জাহাজে হামলা হয়েছে, যা যুদ্ধ শুরুর পর এক সপ্তাহে সর্বোচ্চ। আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই সপ্তাহে হরমুজ দিয়ে তেল পরিবহন ছিল দিনে ১ কোটি ১৬ লাখ ব্যারেল, যুদ্ধের আগের ১ কোটি ৭১ লাখ ব্যারেলের তুলনায় অনেক কম। শুক্রবার ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম মে মাসের পর প্রথমবার ব্যারেলপ্রতি ১১০ ডলার ছুঁয়েছিল।
যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস হরমুজ দিয়ে পরিবহন হতো। তাই প্রণালির নিরাপত্তা শুধু অঞ্চলটির জন্য নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ তার প্রয়োজনীয় জ্বালানি ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি করে, যার একটি বড় অংশ আসে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে। হরমুজে সংঘাত বাড়লে জাহাজভাড়া ও বিমা খরচ বাড়ে, সরবরাহে বিলম্ব হয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে দেশের আমদানি ব্যয়ে চাপ পড়ে।
এখনো যা স্পষ্ট নয়: জাহাজগুলোতে ঠিক কী ধরনের হামলা হয়েছে, কোন পতাকার জাহাজ, কেউ হতাহত হয়েছেন কি না, এবং ইরানের বর্ণনা স্বাধীনভাবে যাচাই করা যাবে কি না। যুক্তরাষ্ট্র এই ঘটনার জবাবে সামরিক পদক্ষেপ নেবে কি না, নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে বা পরে সংঘাত আরও বাড়বে কি না, তাও অনিশ্চিত। আল জাজিরা জানিয়েছে, নির্বাচনের পর বড় হামলার জন্য সেনাবাহিনীকে প্রস্তুত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন ট্রাম্প; তবে এ বিষয়ে হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।
আগামী দিনে আইআরজিসি ও মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের পরবর্তী বিবৃতি এবং তেলবাজারের প্রথম প্রতিক্রিয়া নজরে রাখতে হবে। জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হয় কি না, মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর উদ্যোগ ফের শুরু হয় কি না, আর বাংলাদেশে জ্বালানির দাম ও সরবরাহে এর প্রভাব পড়ে কি না—এসবই এখন দেখার বিষয়।



