সেনাবাহিনীর নিরাপত্তা এসকর্টে সাজেকে আটকে পড়া পর্যটকদের গাড়িবহর বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) দুপুর পৌনে একটার দিকে খাগড়াছড়ি শহরে পৌঁছেছে। এর আগে সকাল পৌনে নয়টার দিকে তাঁরা সাজেক থেকে খাগড়াছড়ির উদ্দেশে রওনা হন। পথে কয়েকটি স্থানে অবরোধের মুখে পড়লেও সেনাবাহিনীর সহায়তায় তাঁরা গন্তব্যে পৌঁছান বলে জানিয়েছে ঢাকা পোস্ট।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে ঢাকা পোস্ট জানিয়েছে, বুধবার রাতে সাজেকে দুই হাজার ৬০০ জনের বেশি পর্যটক অবস্থান করছিলেন। আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) বলছে, সাজেক-বাঘাইহাট সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রায় তিন হাজার পর্যটক আটকা পড়েন। পর্যটকের সংখ্যা নিয়ে দুই হিসাবের পার্থক্য রয়েছে।
ঢাকা থেকে যাওয়া পর্যটক আবুল কাশেম ঢাকা পোস্টকে বলেন, দুই রাতের ট্যুরে বুধবার সাজেকে পৌঁছে সন্ধ্যায় আন্দোলনের খবর পান। বৃহস্পতিবার তাঁদের সাজেক থেকে নামিয়ে দেওয়া হয়। তিন দিনের জন্য গাড়ি ভাড়া করে অগ্রিম টাকা দেওয়ায় ভাড়া ও ফেরার বাসের টিকিট নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন তিনি।
আরেক পর্যটক অয়ন বলেন, সেনাবাহিনীর এসকর্টে পর্যটকবাহী গাড়িগুলোকে খাগড়াছড়িতে নিয়ে আসা হয়। পথে দুটি স্থানে প্রায় আধা ঘণ্টা করে অপেক্ষা করতে হয়েছে। তাঁর কথায়, সড়কে অসংখ্য ভাঙা ইট ছড়িয়ে ছিল, তবে পর্যটকদের কোনো ক্ষতি হয়নি।
হবিগঞ্জ থেকে যাওয়া পর্যটক অপু ঢাকা পোস্টকে বলেন, ফেরার পথে দুটি স্থানে তাঁরা আটকে পড়েন। গাড়িবহরের আগে সেনাবাহিনীর কয়েকটি গাড়ি ছিল। আন্দোলনকারীরা সেনাবাহিনী ও পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। পরে নিরাপত্তা বাহিনী অবরোধকারীদের সড়কের দুই পাশে ছত্রভঙ্গ করে গাড়িবহর দ্রুত ওই এলাকা পার করে দেয়।
আইএসপিআর এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, সাজেকের গঙ্গারাম বাজার এলাকায় ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) সশস্ত্র সদস্যরা স্থানীয় মানুষকে জোরপূর্বক মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করে সড়ক অবরোধ করেন এবং পর্যটক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর গুলিবর্ষণ করেন। বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, সকাল আনুমানিক ১০টায় অবরোধকারীরা পর্যটকবাহী যানবাহন থামিয়ে দেয়।
আইএসপিআর আরও জানায়, সকাল আনুমানিক ১০টা ৪৫ মিনিটে অবরোধকারীরা আকস্মিকভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ও পর্যটকদের লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ শুরু করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বাহিনী লাঠিচার্জ করে অবরোধকারীদের ছত্রভঙ্গ করে। এরপর সকাল আনুমানিক ১১টায় ইউপিডিএফের সশস্ত্র সদস্যরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও পর্যটকদের লক্ষ্য করে আনুমানিক ৩০ থেকে ৪০ রাউন্ড গুলিবর্ষণ করে বলে প্রাথমিকভাবে জানা যায়।
সেনাবাহিনীর টহল দল আত্মরক্ষা ও পর্যটকদের নিরাপত্তার জন্য পাল্টা গুলিবর্ষণ করলে সশস্ত্র ব্যক্তিরা ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়। পরে সেনাবাহিনী ও পুলিশের সমন্বিত প্রচেষ্টায় আটকে পড়া পর্যটকদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয় এবং এ ঘটনায় কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি বলে আইএসপিআর জানিয়েছে।
আইএসপিআর দাবি করেছে, অবরোধ ও সহিংসতার ঘটনাটি পূর্বপরিকল্পিত এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানের পর কোণঠাসা হয়ে ইউপিডিএফের সশস্ত্র সদস্যদের একটি অংশ পর্যটন এলাকায় অবস্থান নিয়েছে। এই দাবির স্বাধীনভাবে যাচাই সম্ভব হয়নি।
সাজেক সড়ক অবরোধের ডাক দিয়েছে সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন। সংগঠন দুটি ইউপিডিএফ-প্রসিত গ্রুপ সমর্থিত বলে প্রচার রয়েছে। তাদের দাবির একটি হলো সাজেক থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (পিসিজেএসএস) সন্তু গ্রুপের সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে নেওয়া। এ বিষয়ে সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে এখনো কোনো বিবৃতি পাওয়া যায়নি।
এর আগে বুধবার সন্ধ্যায় রাঙামাটির জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী এক গণবিজ্ঞপ্তিতে জানান, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সাজেক ভ্যালি পর্যটনকেন্দ্র সাময়িকভাবে বন্ধ থাকবে। ওই বিজ্ঞপ্তিতে সবাইকে বৃহস্পতিবার বিকেল চারটার মধ্যে নিরাপদে সাজেক ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি, গোলাগুলি কে শুরু করেছে এবং ঠিক কত রাউন্ড চলেছে—এ বিষয়ে আইএসপিআরের বর্ণনা ছাড়া স্বাধীন যাচাই নেই। অবরোধ কত দিন চলবে, জেলা প্রশাসন সাজেক কবে খুলে দেবে এবং দাবি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে কি না, তাও স্পষ্ট নয়।
সামনে যা ঘটবে: প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রধান কাজ হবে সাজেকে ও সড়কে আটকে থাকা বাকি পর্যটকদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনা। এরপর সাজেকের ব্যবসায়ী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য খাদ্য ও নিত্যপণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক করা এবং অবরোধকারীদের সঙ্গে দাবি নিয়ে আলোচনার পথ খোঁজা। সড়ক বন্ধ থাকলে পর্যটন মৌসুমে সাজেকের অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন দুই দিক থেকেই চাপে পড়বে।



