ইন্টারনেটে নাগরিক স্বাধীনতার সূচকে বাংলাদেশের স্কোর এ বছর বেড়ে ১০০-এর মধ্যে ৫০ হয়েছে। ফ্রিডম হাউসের ‘ফ্রিডম অন দ্য নেট ২০২৬’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছরের ৪৫ থেকে পাঁচ পয়েন্ট বেড়েছে দেশের স্কোর। তবে ৪০ থেকে ৬৯ স্কোরের দেশগুলোর মতো বাংলাদেশ এখনো ‘আংশিক মুক্ত’ শ্রেণিতে রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ফ্রিডম হাউস বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে। ২০২৫ সালের ১ জুন থেকে ২০২৬ সালের ৩১ মে পর্যন্ত ১২ মাসের তথ্যের ভিত্তিতে এটি তৈরি। ৩৮টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অগ্রগতিই এ বছর সবচেয়ে বেশি; টানা দ্বিতীয় বছর দেশটি এই অবস্থান ধরে রেখেছে।
প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগের দুই বছরে বাংলাদেশের স্কোর ছিল যথাক্রমে ৪০ ও ৪৫। এবার পাঁচ পয়েন্ট বেড়েছে। এর মধ্যে চার পয়েন্ট এসেছে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ বাড়ার কারণে, এক পয়েন্ট এসেছে অনলাইন কনটেন্টের ওপর বিধিনিষেধ কমার কারণে।
বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘অবস্ট্যাকলস টু অ্যাকসেস’ সূচকে বাংলাদেশের স্কোর ২৫-এর মধ্যে ১৬, আগের বছর যা ছিল ১২। ‘লিমিটস অন কনটেন্ট’ ৩৫-এর মধ্যে ২১ (আগে ২০)। ‘ভায়োলেশনস অব ইউজার রাইটস’ অপরিবর্তিত রয়েছে ৪০-এর মধ্যে ১৩-তে; এটিই দেশের সবচেয়ে দুর্বল ক্ষেত্র।
প্রতিবেদনের বড় ইতিবাচক দিক, ২০১৬ সালের পর বাংলাদেশে প্রথমবার পুরো এক বছর কোনো পূর্ণাঙ্গ ইন্টারনেট শাটডাউন হয়নি। ফ্রিডম হাউস বলেছে, ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর সংস্কার প্রক্রিয়ায় এই পরিবর্তন এসেছে। সংস্থাটির ভাষ্য, দীর্ঘদিনের ডিজিটাল দমন-পীড়ন ফিরিয়ে দিতে গণ-আন্দোলনের 역할 এতে দেখা যায়।
তবে অগ্রগতির আইনি ভিত্তি নিয়ে অস্পষ্টতা আছে। বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড জানিয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকার বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ (সংশোধন) অর্ডিন্যান্স ২০২৫-এর মাধ্যমে টেলিকম নেটওয়ার্ক বন্ধের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। কিন্তু আইনটির চূড়ান্ত পাঠ প্রকাশ করা হয়নি এবং প্রক্রিয়াটি দ্রুত ও অস্বচ্ছ ছিল বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগও প্রতিবেদনে স্পষ্ট। ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত ২৮০ জনের বেশি সাংবাদিক রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগে মামলার মুখোমুখি হয়েছেন। তাঁদের একটি অংশ অনলাইন সংবাদমাধ্যমে কাজ করেন। বেশির ভাগ মামলার সম্পর্ক ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের সংবাদ পরিবেশনের সঙ্গে; ওই সংবাদ আওয়ামী লীগের প্রতি অতিরিক্ত সহানুভূতিশীল বলে বিবেচিত হয়েছিল।
২০২৫ সালের ডিসেম্বরে প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টারের কার্যালয়ে হামলার ঘটনাও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দুটি সংবাদমাধ্যমকে ‘ভারতপন্থী’ বলে প্রচার করার পর একদল মানুষ কার্যালয়ে হামলা চালায় এবং ভবনে আগুন দেয়। ফ্রিডম হাউস বলেছে, অনলাইন উসকানি বাস্তব জগতে সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে সহিংসতায় ভূমিকা রেখেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে এবং কখনো কখনো পূর্ববর্তী সরকারের মতো দমনমূলক কৌশল ব্যবহার করেছে। দলটিকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিতে দেওয়া হয়নি। ওই নির্বাচনে বিএনপি জয়ী হয়। ফ্রিডম হাউসের মতে, অগ্রগতি ধরে রাখা এবং টেকসই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
বৈশ্বিক পরিসরে ইন্টারনেট স্বাধীনতা টানা ১৬তম বছর কমেছে। ৩৮টি দেশের মধ্যে ১৬টিতে অবস্থার অবনতি এবং ৮টিতে উন্নতি হয়েছে। বিশ্বের প্রায় ৭১ শতাংশ ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতা প্রতিবেদনে মূল্যায়ন করা হয়েছে। এর মধ্যে ৯ দশমিক ১ শতাংশ ‘মুক্ত’, ৩১ শতাংশ ‘আংশিক মুক্ত’ এবং ৩০ দশমিক ৮ শতাংশ ‘মুক্ত নয়’ পরিবেশে রয়েছেন।
এস্তোনিয়া ৯১ স্কোর নিয়ে শীর্ষে। চীন, ইরান ও মিয়ানমারের স্কোর ৯; রাশিয়ার ১৬, পাকিস্তানের ২৭ এবং ভারতের ৫০। ফ্রিডম হাউসের প্রধান নির্বাহী জেমি ফ্লাই বলেছেন, কর্তৃত্ববাদী শক্তিগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। প্রতিবেদনের লেখক কিয়ান ভেস্টেইনসনের ভাষ্য, মুক্ত ও উন্মুক্ত ইন্টারনেটের লড়াইয়ে গণতান্ত্রিক দেশগুলোকে নেতৃত্ব দিতে হবে।
বাংলাদেশের জন্য এই অগ্রগতি তাৎপর্যপূর্ণ হলেও এটি পূর্ণ ‘মুক্ত’ ইন্টারনেটের ঘোষণা নয়। স্কোর এখনো ‘আংশিক মুক্ত’ সীমার মধ্যেই। শাটডাউন না হলেও সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা, অনলাইন সমালোচকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং সংবাদমাধ্যমের ওপর সহিংসতা উদ্বেগের বিষয় হয়ে আছে। প্রতিবেদনে এসব বিষয়ে নতুন সরকারের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। সরকারের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়নি।



