সৌদি সরকারের পাঠানো বন্দিতালিকায় ২২ বাংলাদেশি নাগরিকের নামের পাশে ‘দণ্ডপ্রাপ্ত’ লেখা থাকলেও তাঁদের কী শাস্তি হয়েছে, তা উল্লেখ নেই। কত বছরের কারাদণ্ড, নাকি মৃত্যুদণ্ড—সেই কলাম ফাঁকা। জেদ্দায় বাংলাদেশের কনস্যুলেটও এই ২২ জনের সাজার ধরন বা মেয়াদ জানে না।
জেদ্দার কনস্যুলেট ১৯ অক্টোবর সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জেদ্দা শাখাকে চিঠি দিয়ে দ্রুত রায়ের সারসংক্ষেপ পাঠাতে অনুরোধ করেছে। কনস্যুলেটের বরাত দিয়ে প্রথম আলো জানায়, ৩০ সেপ্টেম্বর সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ২ হাজার ৪৬১ বাংলাদেশি বন্দীর একটি তালিকা পাঠায়। তালিকায় কারও বিরুদ্ধে আদালতের রায় হয়েছে, কারও মামলা চলছে। কিন্তু কয়েকজনের ‘অবস্থা’ কলামে ‘দণ্ডপ্রাপ্ত’ থাকলেও ‘রায়ের সারসংক্ষেপ’ কলামে শাস্তির বিবরণ নেই। চিঠির সঙ্গে সংযুক্ত নয় পাতার তালিকা গুনে এমন ২২ জনকে পাওয়া গেছে।
এই ২২ জনের মধ্যে ছিলেন নজরুল ইসলাম আবদুল বাসির ও সুইটি আক্তার। গত ১৪ অক্টোবর মক্কা অঞ্চলে তাঁদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। সৌদি কর্তৃপক্ষের পাঠানো তালিকায় তাঁদের নাম থাকলেও মৃত্যুদণ্ডের তথ্য ছিল না। তাঁদের বাকি ২০ জনের ভাগ্য এখনো অনিশ্চিত।
জেদ্দার কনস্যুলেটের সূত্রে প্রথম আলো জানায়, ২২ জনের মধ্যে আটজনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলায় বিচার হয়েছে। পাঁচজনের বিরুদ্ধে মাদক পাচার, পাঁচজনের বিরুদ্ধে ‘ব্যক্তিগত অধিকার’–সংক্রান্ত মামলা, দুজনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় আইন লঙ্ঘন, একজনের বিরুদ্ধে সাইবার অপরাধ এবং একজনের বিরুদ্ধে ব্যভিচারের মামলা রয়েছে।
বন্দীদের ছয়জন জেদ্দার জাহবান কারাগারে, ছয়জন শুমাইসি কারাগারে এবং চারজন জেদ্দা জেনারেল কারাগারে আছেন। বাকি ছয়জন নাজরান, খামিস, আল-বাহা, হাদ্দাহ ও জেদ্দার নারী কারাগারে রয়েছেন। ‘ব্যক্তিগত অধিকার’–সংক্রান্ত পাঁচ মামলার সবাই শুমাইসি কারাগারে। সাধারণত এমন মামলা ব্যক্তিগত দাবি বা ক্ষতিপূরণসংক্রান্ত হয়; তবে মামলার নথি ছাড়া নির্দিষ্ট অভিযোগ নিশ্চিত হওয়া যায় না।
মামলার ধরন দেখে শাস্তি অনুমান করা যায় না। সৌদি আইনে হত্যা মামলায় কিসাস বা মৃত্যুদণ্ড হতে পারে, আবার রক্তপণ বা কারাদণ্ডেও নিষ্পত্তি হতে পারে। তাই তালিকার কারও মৃত্যুদণ্ড হয়েছে বলে নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না, আবার সেই সম্ভাবনা বাদও দেওয়া যাচ্ছে না।
রায়ের সারসংক্ষেপ না থাকলে কনস্যুলেট জানে না কার সামনে আপিলের পথ খোলা, কীভাবে আইনজীবী নিয়োগ হবে, রক্তপণের মীমাংসা বা ক্ষমার উদ্যোগ নেওয়া যাবে কি না। দেশে বসে পরিবারগুলোও একই অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছে। নজরুল ও সুইটির মৃত্যুদণ্ডের ঘটনা দেখিয়েছে, তালিকায় সাজার তথ্য না থাকলে কনস্যুলার সহায়তার সময়মতো উদ্যোগ নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
জেদ্দায় বাংলাদেশের কনসাল জেনারেল মো. শাখাওয়াত হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, বাংলাদেশের দণ্ডিত নাগরিকদের কনস্যুলার সুবিধা নিশ্চিত করার স্বার্থে সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে সুস্পষ্ট তথ্য চাওয়া হয়েছে। একই দিন আরেকটি চিঠিতে কনস্যুলেট ২ হাজার ৪৬১ বন্দীকে পাঁচ শ্রেণিতে ভাগ করে মেয়াদ শেষ হওয়া বন্দীদের দ্রুত মুক্তি ও দেশে ফেরত, ভালো আচরণ করা বন্দীদের রাজকীয় ক্ষমার তালিকায় অন্তর্ভুক্তি, প্রথমবার আটক ও ছোট অপরাধে আটক ব্যক্তিদের অবশিষ্ট সাজা মওকুফ এবং বিচারাধীন মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির অনুরোধ জানিয়েছে।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জেদ্দার কনস্যুলেটের ১৮ অক্টোবরের চিঠিতেও বলা হয়, সৌদি আরবের পশ্চিমাঞ্চলের কারাগারগুলোতে নৈতিকতাসংক্রান্ত বিভিন্ন মামলায় ৩০৬ জন বাংলাদেশি আটক আছেন। তাঁদের মধ্যে ১৪৭ জন এক মাস থেকে ১৫ বছর পর্যন্ত বিভিন্ন মেয়াদে সাজা পেয়েছেন। মক্কায় তথ্যপ্রযুক্তি অপরাধের তিনটি পৃথক মামলায় বাংলাদেশিরা ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড পেয়েছেন।
কনস্যুলেট আরও দুজন বাংলাদেশির বিষয়ে সৌদি মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছে। তাঁদের পরিবার বলছে, নিরাপত্তা বাহিনী তাঁদের গ্রেপ্তার করেছে, কিন্তু কেন বা কোথা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে তা তারা জানে না।
সৌদি আরব বাংলাদেশি কর্মীদের অন্যতম বড় গন্তব্য। দেশটিতে প্রায় ৩০ লাখ বাংলাদেশি কাজ করেন বলে বিবিসির হিসাব রয়েছে। এত বড় প্রবাসী জনগোষ্ঠীর জন্য বন্দিতালিকা ও সাজার তথ্যের স্বচ্ছতা গুরুত্বপূর্ণ; একটি ফাঁকা কলামের কারণে পরিবার, দূতাবাস ও আইনজীবী—সবাই অন্ধকারে থাকেন।
সৌদি কর্তৃপক্ষ কনস্যুলেটের চিঠিগুলোর জবাব এখনো দেয়নি। ফলে ২২ জনের ভাগ্য কী, তাঁদের কেউ মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকিতে আছেন কি না এবং পরিবারগুলো কবে নিশ্চিত তথ্য পাবে—তা এখনো অনিশ্চিত। রায়ের কপি ও সাজার বিবরণ পেলে কনস্যুলেট পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নিতে পারবে বলে জানিয়েছে।



