জ্বালানি, সার ও বাণিজ্য সহযোগিতা বাড়ানোর সম্ভাবনা নিয়ে আলজেরিয়ার রাজধানী আলজিয়ার্সে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির ও দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আহমেদ আত্তাফ। বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে সম্প্রতি সই হওয়া হাইড্রোকার্বন সহযোগিতা স্মারকলিপি বাস্তবে রূপ দেওয়ার উপায় নিয়ে আলোচনা হয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তির বরাতে বাসস ও ইউএনবি এ তথ্য জানিয়েছে।
সমঝোতা স্মারকটি সই হয় গত ২০ অক্টোবর। আলজেরিয়ার জ্বালানি ও খনিজ সম্পদবিষয়ক রাষ্ট্রমন্ত্রী মোহামেদ আরকাব ও বাংলাদেশের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ এতে সই করেন। আলজেরিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা এপিএস জানিয়েছে, দেশটির জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের ঘোষণা অনুযায়ী এটি হাইড্রোকার্বন খাতে পারস্পরিক স্বার্থে অংশীদারত্ব গড়ে তোলার কাঠামো। একই দিন বাংলাদেশের প্রতিনিধিদল আলজেরিয়ার প্রধানমন্ত্রী সিফি ঘ্রিবের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, হুমায়ুন কবির বলেছেন, এই সমঝোতা বাংলাদেশের জন্য সরকার-থেকে-সরকার ভিত্তিতে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) ও অন্যান্য পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানির নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। এর সঙ্গে রিফাইনারি ও এলএনজি অবকাঠামো যৌথভাবে গড়ে তোলা এবং বাংলাদেশে কয়লা ও গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানের সম্ভাবনাও যুক্ত হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
আলজেরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আহমেদ আত্তাফ বলেছেন, বাংলাদেশের জ্বালানি চাহিদার কথা বিবেচনা করে দেশটির প্রেসিডেন্ট এই সমঝোতাকে অগ্রাধিকার দিয়ে সই করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। সার বিষয়েও বাংলাদেশের চাহিদা মেটাতে সহযোগিতা করার আগ্রহ প্রকাশ করেন তিনি। পাশাপাশি আলজেরিয়ার বস্ত্রশিল্প পুনরুজ্জীবিত করতে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা চেয়েছেন আত্তাফ; ওষুধ, চামড়া ও বস্ত্র খাতেও সহযোগিতার আগ্রহের কথা বলেছেন।
দুই পক্ষের আলোচনায় কৃষি, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শিক্ষা এবং জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর বিষয়ও উঠে আসে। আলজেরিয়ার পেট্রোলিয়াম ইনস্টিটিউট বাংলাদেশের প্রকৌশলী ও কারিগরি কর্মীদের জন্য প্রশিক্ষণ ও জ্ঞান বিনিময়ের কর্মসূচি দিতে আগ্রহ দেখিয়েছে। দুই দেশের পররাষ্ট্রসচিব পর্যায়ের পরামর্শ বৈঠক নিয়মিত করার এবং পরবর্তী বৈঠক ঢাকায় আয়োজনের বিষয়েও একমত হয়েছে দুই পক্ষ।
বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা এখন বড় চাপের মুখে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় পুরোনো সরবরাহপথগুলো অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে ঢাকা বিকল্প উৎস খুঁজছে। আলজেরিয়া উত্তর আফ্রিকার বড় গ্যাস রপ্তানিকারক দেশ; ভূমধ্যসাগরীয় বন্দর থেকে পাঠানো সরবরাহ হরমুজ এড়িয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় আসতে পারে। তবে দেশটির রপ্তানির বড় অংশ এখনো ইউরোপে যায়।
সারের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের আমদানিনির্ভরতা বড়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাবে দেশে বছরে ইউরিয়ার চাহিদা ২৬ থেকে ২৮ লাখ টন; এর উল্লেখযোগ্য অংশ সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতার থেকে আমদানি করতে হয়। গ্যাসসংকটে দেশের কয়েকটি সার কারখানা দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় উৎপাদনও কমেছে। চলতি বছরের মে মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে ইউরিয়ার দাম টনপ্রতি ৮৭০ ডলার ছাড়িয়ে যায়, যা সংঘাতের আগে ছিল প্রায় ৪৫০ ডলার।
তবে এই সমঝোতা এখনো কোনো ক্রয়চুক্তি নয়। কোন পরিমাণ এলএনজি, এলপিজি বা সার আসবে, দাম কত হবে এবং সরবরাহ কবে শুরু হবে—এসব বিষয়ে দুই দেশের সরকার কিছু জানায়নি। এমওইউ-এর পূর্ণ পাঠও প্রকাশ করা হয়নি। সমঝোতা স্মারক সাধারণত নিজে থেকেই ক্রয়ের বাধ্যবাধকতা তৈরি করে না; ফলে বাণিজ্যিক চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত সরবরাহের নিশ্চয়তা নেই। আলজেরিয়ার নিজের রপ্তানি সক্ষমতা এবং ইউরোপীয় ক্রেতাদের সঙ্গে চলমান চুক্তির কারণে ঢাকার জন্য কতটা সরবরাহ বাড়বে, তাও স্পষ্ট নয়।
কূটনৈতিক পর্যায়ে পরবর্তী ধাপ হিসেবে ঢাকায় পররাষ্ট্রসচিব পর্যায়ের বৈঠক এবং উচ্চপর্যায়ের সফর বিনিময়ের কথা বলা হয়েছে। গত ৫ অক্টোবর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ আলজেরিয়ার রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠকে জানিয়েছিলেন, সরকার-থেকে-সরকার ভিত্তিতে এলএনজি ও সার আমদানি হবে এবং আলজেরিয়ার প্রেসিডেন্টের ঢাকা সফরের আমন্ত্রণ গৃহীত হয়েছে। সেই সফর কবে হবে, তা এখনো ঠিক হয়নি।
বাংলাদেশের ভোক্তার জন্য এর অর্থ হলো, জ্বালানি ও সারের সরবরাহ বৈচিত্র্যময় করার একটি কূটনৈতিক পথ খুলেছে; তবে দাম বা সরবরাহে তাৎক্ষণিক স্বস্তির নিশ্চয়তা নেই। আগামী মাসগুলোতে যৌথ কর্মগোষ্ঠীর বৈঠক, পররাষ্ট্রসচিব পর্যায়ের আলোচনা এবং সম্ভাব্য উচ্চপর্যায়ের সফরে বাণিজ্যিক চুক্তির রূপরেখা তৈরি হবে কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়।



