১১ বছর পর মালদ্বীপের কোনো প্রেসিডেন্ট পাকিস্তানে গেলেন। তিন দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে গিয়ে প্রেসিডেন্ট ড. মোহাম্মদ মুইজ্জু বুধবার ইসলামাবাদে প্রধানমন্ত্রী মুহাম্মদ শাহবাজ শরিফের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। বৈঠকের পর দুই দেশ প্রতিরক্ষা, সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও বাণিজ্যসহ বিভিন্ন খাতে ২০টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) ও চুক্তিতে সই করেছে। সফর শেষ হচ্ছে বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর।
দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য এখন ১ কোটি ৩৯ লাখ ডলার। আগামী দুই বছরে তা ২০ কোটি ডলারে নেওয়ার লক্ষ্য ঠিক হয়েছে। চুক্তি স্বাক্ষরের পর যৌথ সংবাদ সম্মেলনে শাহবাজ শরিফ বলেন, বর্তমান বাণিজ্যের পরিমাণ দুই দেশের সক্ষমতার তুলনায় খুবই কম। মুইজ্জু বলেছেন, বাণিজ্য বাড়ানোর এই লক্ষ্যকে তিনি সম্পূর্ণ সমর্থন করেন।
সই হওয়া নথির মধ্যে রয়েছে প্রতিরক্ষা ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা সহযোগিতা, তথ্যপ্রযুক্তি, সাইবার নিরাপত্তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল দক্ষতা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণ, সামাজিক সুরক্ষা, কৃষি, মৎস্য, মাদক পাচার রোধ, যুব ও ক্রীড়া, বিমান যোগাযোগ, পর্যটন এবং সংস্কৃতি। মালদ্বীপের পুলিশ ও সরকারি কর্মকর্তাদের পাকিস্তানে প্রশিক্ষণের বিষয়েও সমঝোতা হয়েছে।
বাণিজ্য বাড়াতে মালদ্বীপ স্টেট ট্রেডিং অর্গানাইজেশন ও ট্রেডিং কর্পোরেশন অব পাকিস্তানের মধ্যে কৃষিপণ্য ও খাদ্য কেনাবেচার একটি সমঝোতা সই হয়েছে। স্বাস্থ্য খাতে মালদ্বীপে পাকিস্তানের প্রায় ২৫০ জন চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী কাজ করছেন। নতুন সমঝোতার আওতায় আরও চিকিৎসক পাঠানো এবং মালদ্বীপের শিক্ষার্থীদের জন্য প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।
সফরের রাজনৈতিক বার্তাও স্পষ্ট। শাহবাজ শরিফ বলেছেন, কাশ্মীর নিয়ে পাকিস্তানের অবস্থান অপরিবর্তিত এবং ভারতের সঙ্গে সিন্ধু নদের পানি চুক্তি নিয়ে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। মুইজ্জু ফিলিস্তিন ইস্যুতে মালদ্বীপের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তন তাঁর দেশের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যতের জন্য সরাসরি হুমকি।
প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়ে আলাদা বৈঠক হয়েছে। সেনাপ্রধান ও চিফ অব ডিফেন্স ফোর্সেস ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের সঙ্গে মুইজ্জুর বৈঠকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং দুই দেশের সামরিক সহযোগিতা ও প্রশিক্ষণ নিয়ে আলোচনা হয়। মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর পেশাদারিত্বের প্রশংসা করেন।
দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৬০ বছর পূর্তিতে এই সফর হচ্ছে। ১৯৬৬ সালের ২৬ জুলাই সম্পর্ক স্থাপিত হয়। এর আগে ২০১৫ সালে শেষবার মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট হিসেবে আবদুল্লাহ ইয়ামিন পাকিস্তানে গিয়েছিলেন। ভারত মহাসাগরের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে মালদ্বীপের অবস্থানের কারণে দ্বীপরাষ্ট্রটির সঙ্গে সম্পর্ক পাকিস্তানের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
২০২৩ সালে ক্ষমতায় আসার সময় ভারতের সামরিক সদস্য প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন মুইজ্জু। পরে দুই দেশের সম্পর্কের টানাপোড়েন কাটে এবং ভারতের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন সহযোগিতা আবার বাড়তে থাকে। এর মধ্যেই পাকিস্তানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও বাণিজ্য সহযোগিতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত মালদ্বীপের কূটনৈতিক ভারসাম্য নিয়ে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে।
পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আসিফ আলি জারদারির সঙ্গে আলাদা বৈঠকে মুইজ্জুকে স্বাগত জানানো হয়। জারদারি স্মরণ করেন, মালদ্বীপের সংসদ ভবন ও মেডিকেল স্কুল নির্মাণে পাকিস্তান সহায়তা করেছিল। মালদ্বীপে পাঁচ বছরে ৫০ লাখ গাছ লাগানোর কর্মসূচিতে সহায়তার জন্য পাকিস্তান এক লাখ অলিভের কলম ও এক লাখ বীজ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
মুইজ্জু বলেছেন, এই সমঝোতাগুলো দুই দেশের সম্পর্ককে ‘নতুন যুগে’ নিয়ে যাবে। তবে তিনি যোগ করেন, কাগজে সই করা চুক্তির অর্থ তখনই তৈরি হবে, যখন তার সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাবে। তিনি দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা সার্ককে পুনরুজ্জীবিত করার বিষয়েও মালদ্বীপের আগ্রহের কথা বলেন।
তবে ২০টি সমঝোতা কত দিনে বাস্তবায়ন হবে, প্রতিরক্ষা চুক্তিতে ঠিক কী কী থাকছে এবং দুই বছরে বাণিজ্য ১৪ গুণের বেশি বাড়ানোর পরিকল্পনা কী—এসবের বিস্তারিত এখনো প্রকাশ করা হয়নি। দুই দেশের মধ্যে সরাসরি বিমান চলাচল কবে শুরু হবে, তাও নিশ্চিত নয়।
বৃহস্পতিবার ইসলামাবাদে পাকিস্তান-মালদ্বীপ ব্যবসায়িক ফোরাম হওয়ার কথা। সেখানে দুই দেশের ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগ ও বাণিজ্যের সুযোগ নিয়ে আলোচনা করবেন। সফর শেষে দুই দেশের কর্মকর্তারা সমঝোতাগুলোর বাস্তবায়ন নিয়ে কাজ শুরু করবেন।
মালদ্বীপে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাংলাদেশি কর্মী কাজ করেন। তাই দেশটির কূটনৈতিক গতিপথ ও শ্রমবাজারের পরিবর্তন ঢাকার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।



