সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলীয় শহর দাম্মামে কিং ফাহদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বুধবার রাতে হামলা হয়েছে। এতে একজনের মৃত্যু ও আটজন আহত হয়েছেন বলে দেশটির বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। আহতদের কারও অবস্থা গুরুতর, সবাইকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। বিমানবন্দরের কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

বিমানবন্দরটি দাম্মাম শহরের উত্তর-পশ্চিমে, বাহরাইন ও কাতারের কাছে উপসাগরীয় উপকূলে। এটি সৌদি আরবের চারটি প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের একটি এবং পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশের প্রধান আকাশপথ। ফ্লাইট-ট্র্যাকিং সেবা ফ্লাইটরাডার২৪ জানিয়েছে, হামলার পর বিমানগুলো বিমানবন্দর থেকে অন্যদিকে সরিয়ে নেওয়া হয়।

বুধবারই আলাদা এক ঘটনায় দক্ষিণ-পূর্ব সৌদিতে তেল স্থাপনায় হামলার চেষ্টা করা একটি ড্রোন প্রতিহত করে দেশটির বিমান প্রতিরক্ষা। পড়ে যাওয়া ধ্বংসাবশেষে দুইজন নিহত ও আরও দুইজন আহত হয়েছেন বলে সৌদির জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। আল জাজিরার প্রতিবেদনে স্থাপনাটিকে সৌদি আরামকোর শাইবাহ তেলক্ষেত্র বলে উল্লেখ করা হয়েছে। দুই ঘটনায় মিলিয়ে অন্তত তিনজন নিহত হয়েছেন।

গত কয়েক সপ্তাহে সৌদি আরবে এ ধরনের হামলার সংখ্যা বেড়েছে। গত ১১ অক্টোবর রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এক হামলায় একজন নিহত ও ১১ জন আহত হন। তার আগের দিন একই বিমানবন্দরে পৃথক হামলায় ১২ জন নিহত ও ৩০০-এর বেশি আহত হন বলে জানিয়েছিল সৌদি কর্তৃপক্ষ। গার্ডিয়ানের ভাষায়, রিয়াদের ওই হামলা ছিল কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে প্রাণঘাতী।

এ অবস্থায় বুধবার মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর সৌদি আরবের দূতাবাস ও সহকারী কনস্যুলেটগুলোর কিছু কূটনীতিক এবং মার্কিন সরকারি কর্মচারীদের পরিবারকে দেশ ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে। সংস্থার মুখপাত্র টমি পিগট বলেছেন, ‘দপ্তরের কর্মী ও তাঁদের পরিবারের নিরাপত্তা আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।’ ইরান-সমর্থিত হুথিদের পক্ষ থেকে ‘বেসামরিক বিমানবন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে’ হামলাকে এই সিদ্ধান্তের কারণ বলা হয়েছে।

রিয়াদের মার্কিন দূতাবাস বুধবার নিরাপত্তা সতর্কবার্তা জারি করে বলে হুথিদের আরও হামলার আশঙ্কা রয়েছে। গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারিতে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর দূতাবাসটি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং কয়েক মাস ধরে অল্প কর্মী নিয়ে চলছিল। সম্প্রতি কিছু কূটনীতিক সেখানে ফিরে গিয়েছিলেন।

এনবিসি ও এএফপির মতো সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, সংযুক্ত আরব আমিরাত, জর্ডান, কাতার ও বাহরাইন থেকেও মার্কিন দূতাবাস কর্মীদের পরিবার সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। তবে পিগট ওই খবরকে ‘ভুল’ বলে অভিহিত করেন এবং বলেন, নির্দেশটি কেবল সৌদি আরবের জন্য প্রযোজ্য।

বুধবারের দুটি হামলার দায় কোনো পক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে স্বীকার করেনি। গার্ডিয়ান লিখেছে, হুথিরা সঙ্গে সঙ্গে দায় স্বীকার না করলেও সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে তাদের হামলার প্রধান লক্ষ্য ছিল বিমানবন্দর ও তেল স্থাপনা।

আঞ্চলিক পরিস্থিতি এখনও অস্থির। গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে। নিউইয়র্ক টাইমসের খবর অনুযায়ী, ৩ নভেম্বরের নির্বাচনের পর ইরানে হামলা নতুন করে শুরুর পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা চলছে। তবে ট্রাম্প বলেছেন, নির্বাচনের আগে তিনি যুদ্ধ পুনরায় শুরু করতে চান না। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত পিকঅ্যাক্স মাউন্টেইন ধ্বংসের কথা তিনি বলেছেন। এ সপ্তাহে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ইসরায়েলে গিয়েছিলেন।

এখনো যা স্পষ্ট নয়: হামলাগুলো ঠিক কে চালিয়েছে, কোন ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে, নিহত ও আহতদের পরিচয় এবং বিমানবন্দরের ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ। হুথিরা দায় স্বীকার করবে কি না, আগামী দিনে হামলা চলবে কি না এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন কূটনৈতিক উপস্থিতি কতটা কমবে, তাও অনিশ্চিত। বিমান চলাচল কখন স্বাভাবিক হবে, সে বিষয়েও তাৎক্ষণিক নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চল তেলশিল্পের কেন্দ্র। এই অঞ্চলে দেশি-বিদেশি বিপুল সংখ্যক কর্মী থাকেন, যাঁদের মধ্যে বাংলাদেশি প্রবাসীরাও আছেন। তবে এই হামলায় কোনো বাংলাদেশি হতাহতের নিশ্চিত খবর এখনো পাওয়া যায়নি। সৌদিগামী ফ্লাইট ও প্রবাসী কর্মীদের ওপর এর প্রভাব নিয়েও নজর রাখছেন অনেকে।

পরবর্তী সময়ে সৌদি কর্তৃপক্ষের পরবর্তী বিবৃতি এবং বিমানবন্দরের কার্যক্রম কখন স্বাভাবিক হয়, তার দিকে নজর থাকবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রধান উদ্বেগ, এই হামলাগুলো ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নতুন উত্তেজনা তৈরি করে কি না।