সেন্টমার্টিন দ্বীপে দিনে মাত্র চার ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাওয়ার অভিযোগের মধ্যেই ইউনিটপ্রতি আরও ১০ টাকা দাম বাড়ানোর ঘোষণায় বিক্ষোভ করেছেন দ্বীপবাসী। বুধবার (২১ অক্টোবর) বিকেলে দ্বীপের বাজারে মিছিল করেন বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষ। স্থানীয়দের অভিযোগ, চড়া দাম দিয়েও তারা প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ পাচ্ছেন না।

দ্বীপবাসীর ভাষ্য অনুযায়ী, এখন আবাসিক গ্রাহকদের ইউনিটপ্রতি ৪২ টাকা এবং বাণিজ্যিক গ্রাহকদের ৫২ টাকা দিতে হচ্ছে। নভেম্বর থেকে নতুন হার কার্যকর হলে আবাসিক গ্রাহকের ক্ষেত্রে তা ৫২ টাকা এবং বাণিজ্যিক গ্রাহকের ক্ষেত্রে ৬২ টাকা পর্যন্ত দাঁড়াবে। এই হিসাব সরকারি কোনো মূল্যতালিকা থেকে নয়, গ্রাহকদের অভিজ্ঞতা ও স্থানীয় প্রতিবেদনের ভিত্তিতে।

তুলনার জন্য দেখা যায়, দেশের মূল ভূখণ্ডে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) নির্ধারিত খুচরা বিদ্যুতের ভারিত গড় মূল্য ইউনিটপ্রতি ১০ টাকা ৬৩ পয়সা। গত জুনে এই হার কার্যকর হয়। সেই হিসাবে দ্বীপের আবাসিক গ্রাহক এখন জাতীয় গড় হারের প্রায় চার গুণ এবং বাণিজ্যিক গ্রাহক প্রায় পাঁচ গুণ দাম দিচ্ছেন।

সেন্টমার্টিন বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ। টেকনাফ উপজেলার এই দ্বীপে জাতীয় গ্রিড পৌঁছায়নি। দ্বীপের বিদ্যুৎ আসে সৌরপ্যানেল ও ব্যাকআপ ডিজেল জেনারেটর থেকে; প্যানেল, ব্যাটারি ও জ্বালানি মূল ভূখণ্ড থেকে ট্রলারে করে আনতে হয়। সরবরাহের দায়িত্বে রয়েছে একক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ব্লু-মেরিন এনার্জি লিমিটেড। এসব কারণেই মূল ভূখণ্ডের চেয়ে অনেক বেশি দাম পড়ে বলে স্থানীয়দের একটি অংশ মনে করেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ২০১৯ সালের ১ ফেব্রুয়ারি নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দিয়ে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পটি চালু করা হলেও প্রত্যাশিত সেবা মেলেনি। পর্যটন মৌসুমে সরবরাহ কিছুটা স্বাভাবিক থাকলেও বছরের বাকি সময় ঘাটতি বাড়ে। বিকল্প জেনারেটর সেবা চালুর প্রতিশ্রুতিও বাস্তবায়িত হয়নি বলে তারা জানিয়েছেন।

বিক্ষোভে অংশ নেওয়া দ্বীপের বাসিন্দা ও স্থানীয় বিএনপি নেতা নুরুল আলম বলেন, শুরু থেকেই বেসরকারি বিদ্যুৎ প্রতিষ্ঠানটি দ্বীপবাসীর সঙ্গে প্রতারণা করে আসছে। তাঁর অভিযোগ, পর্যটন মৌসুমে বিদ্যুৎ দিলেও বছরের বাকি সময় ঠিকমতো সরবরাহ করা হয় না। ইউনিটপ্রতি আরও ১০ টাকা বাড়ানোর ঘোষণা দ্বীপবাসীর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করবে বলেও তিনি মনে করেন। তিনি দ্বীপে সরকারি ব্যবস্থাপনায় বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং প্রতিষ্ঠানটির ওপর সরকারি নজরদারি বাড়ানোর দাবি জানান।

আরেক বাসিন্দা দেলোয়ার হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এত দামে এমন বিদ্যুৎ তাদের প্রয়োজন নেই। তিনি বাসার মিটার ও খুঁটি খুলে নিয়ে যাওয়ার কথা বলেছেন এবং ব্লু-মেরিনের বিদ্যুৎ বয়কট করার ঘোষণা দিয়েছেন। তাঁর দাবি, ন্যায্যমূল্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে হবে।

বিক্ষোভকারীরা মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা, সরবরাহব্যবস্থায় স্বচ্ছতা এবং প্রকল্পের কার্যক্রম তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তাদের ভাষ্য, উচ্চমূল্য ও সীমিত সরবরাহ দ্বীপের গৃহস্থালি, শিক্ষা ও ব্যবসা-বাণিজ্যে প্রভাব ফেলছে। পর্যটননির্ভর এই দ্বীপে বিদ্যুতের খরচ বাড়লে ছোট ব্যবসা ও আবাসিক হোটেলগুলোও চাপে পড়বে বলে স্থানীয়রা আশঙ্কা করছেন।

সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলাম জানান, দাম বাড়ানোর প্রতিবাদে স্থানীয় লোকজন বিক্ষোভ করেছেন এবং বিষয়টি সমাধানের জন্য তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন। অন্যদিকে ব্লু-মেরিন এনার্জি লিমিটেডের প্রকৌশলী রফিকুল ইসলামের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। ফলে দাম বাড়ানোর কারণ, কোন অনুমোদিত হারের ভিত্তিতে এটি নির্ধারিত হচ্ছে এবং সরবরাহ কমার ব্যাখ্যা—এসব বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির অবস্থান এখনো জানা যায়নি।

টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এসএম অনীক চৌধুরী বলেন, বিষয়টি তিনি জেনেছেন। বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা করে এটি সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে। তবে আলোচনা কবে হবে বা কী সিদ্ধান্ত আসবে, সে সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট কোনো সময়সূচি তিনি জানাননি।

এখনো যা অজানা

দ্বীপে মোট কত গ্রাহক আছেন, তাদের কতজন আবাসিক ও কতজন বাণিজ্যিক, এবং মাসিক গড় ব্যবহার কত—এসব সরকারি হিসাব প্রকাশ্যে আসেনি। ব্লু-মেরিন কোন নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদনে দাম নির্ধারণ করে, নাকি নিজেই হার ঠিক করে, তাও স্পষ্ট নয়। নভেম্বরের বাড়তি ১০ টাকা প্রত্যাহার হবে কি না এবং সরবরাহ ঘাটতির প্রকৃত কারণ কী, সে প্রশ্নের উত্তরও মেলেনি। বিলের হিসাব ও রসিদ নিয়ে স্থানীয়দের অস্পষ্টতার অভিযোগের স্বাধীন যাচাইও হয়নি।

দ্বীপের বাসিন্দারা বলছেন, পর্যটন মৌসুম শুরুর আগেই এই সমস্যার সমাধান দরকার। নাহলে উচ্চ বিদ্যুৎ ব্যয় ও অনিয়মিত সরবরাহ—দুটো মিলেই দ্বীপের অর্থনীতি ও দৈনন্দিন জীবন আরও চাপে পড়বে। সরকারি তদন্ত বা নিয়ন্ত্রক সংস্থার হস্তক্ষেপ না হলে দাম কমানো নিয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট আশ্বাস নেই। আগামী নভেম্বরে নতুন হার কার্যকর হলে দ্বীপবাসীর বিক্ষোভ আরও বাড়তে পারে বলে স্থানীয়রা ইঙ্গিত দিয়েছেন।