দেশের রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকায় (ইপিজেড) এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ করেছে চীনের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো। বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষের (বেপজা) সর্বশেষ হিসাবে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৩৮টি দেশের প্রতিষ্ঠান মিলে বিনিয়োগ করেছে ৭৪২ কোটি ৮০ লাখ মার্কিন ডলার। এর মধ্যে একক দেশ হিসেবে সর্বোচ্চ ১৭৮ কোটি ২৫ লাখ ডলার এসেছে চীনা কোম্পানির কাছ থেকে।
বেপজার এই হিসাবে তাইওয়ান ও হংকংয়ের প্রতিষ্ঠানকেও চীনের তালিকায় ধরা হয়েছে। ফলে কোন দেশের বিনিয়োগ আলাদাভাবে ঠিক কত, তা ওই ভাঙা হিসাব ছাড়া নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না। বেপজা দেশভিত্তিক পূর্ণ তালিকা প্রকাশ্যে দেয়নি; প্রথম আলো বেপজার তথ্যের ভিত্তিতে এই চিত্র তুলে ধরেছে।
বিনিয়োগের অঙ্কে দ্বিতীয় অবস্থানে আছে বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের প্রতিষ্ঠান। যৌথ মালিকানার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অংশ আলাদাভাবে হিসাব করা হয়েছে। এরপরের অবস্থানগুলোতে আছে দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, শ্রীলঙ্কা, ভারত, কানাডা ও নেদারল্যান্ডস।
দক্ষিণ কোরিয়ার বিনিয়োগ প্রায় ১২০ কোটি ডলার, জাপানের ৬৪ কোটি ৫০ লাখ, যুক্তরাষ্ট্রের ৪২ কোটি, যুক্তরাজ্যের ৩০ কোটি, শ্রীলঙ্কা ও ভারতের প্রত্যেকের ২৬ কোটি, কানাডার ১৪ কোটি এবং নেদারল্যান্ডসের ১২ কোটির বেশি ডলার। তালিকায় ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান, জার্মানি, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, কেম্যান আইল্যান্ডস, সংযুক্ত আরব আমিরাত, আয়ারল্যান্ড, বেলজিয়াম, ইতালি, ফ্রান্স, অস্ট্রেলিয়া ও স্পেনসহ মোট ৩৮টি দেশ আছে।
নতুন বিনিয়োগ প্রস্তাবেও এগিয়ে আছে চীন। ২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এবং চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ে বেপজা ৭৩টি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জমি ইজারার চুক্তি করেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাবিত বিনিয়োগের পরিমাণ ১৩১ কোটি ৪৬ লাখ ডলার। এর মধ্যে চীনা প্রতিষ্ঠান ৪৬টি, যাদের প্রস্তাবিত বিনিয়োগ ৮৫ কোটি ৩৫ লাখ ডলার।
দ্বিতীয় অবস্থানে আছে সম্পূর্ণ বাংলাদেশি মালিকানার ১৫টি প্রতিষ্ঠান, যাদের প্রস্তাবিত বিনিয়োগ ২০ কোটি ৬৩ লাখ ডলার। এ ছাড়া দক্ষিণ কোরিয়া ও সিঙ্গাপুরের চারটি করে প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে। এসব চুক্তির একটি বড় অংশ এখনো নির্মাণাধীন, তাই প্রস্তাবিত অর্থ পুরোপুরি বাস্তবে রূপ নিয়েছে কি না, তা এই হিসাব থেকে বোঝা যায় না।
বর্তমানে চালু থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ৩৩ শতাংশ তৈরি পোশাক, ১৮ শতাংশ পোশাকের উপকরণ ও ৮ শতাংশ বস্ত্রপণ্য রপ্তানি করছে। বাকি ৪১ শতাংশ প্রতিষ্ঠান ভিন্ন ধরনের পণ্য উৎপাদন করছে। এসব পণ্য বিশ্বের ১২৯টি দেশে যাচ্ছে।
ভিন্ন পণ্যের তালিকায় আছে তাঁবু ও ক্যাম্পিং সরঞ্জাম, বাইসাইকেল, প্রসাধনী, হলিউড মাস্ক, গলফ শ্যাফট, উইগ ও ফ্যাশন চুল, ম্যানিকুইন, পাটপণ্য, এনার্জি সেভিং বাল্ব, খেলনা, চশমার ফ্রেম, ক্যামেরার লেন্স, মোবাইল যন্ত্রাংশ, গাড়ির সিট হিটার, পিপিই, ফেস মাস্ক, ব্রাইডাল গাউন ও লাগেজ।
নতুন চুক্তি হওয়া ৭৩ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৯টি পোশাক, বস্ত্র ও আনুষঙ্গিক পণ্য খাতে, যাদের প্রস্তাবিত বিনিয়োগ ৯২ কোটি ৪১ লাখ ডলার। বাকি ৫৪টি প্রতিষ্ঠান তৈরি করবে ড্রোন, ব্লুটুথ হেডফোন, ডেটা কেবল, লাগেজ, স্পোর্টসওয়্যার, এলইডি বাল্ব, তামার তার ও শিট, তাঁবু, কৃষিপণ্য, ইলেকট্রনিক ও ইলেকট্রিক্যাল পণ্য এবং ব্যাটারি প্লেটের মতো মালামাল।
ইপিজেডে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আনার সুবিধা (বন্ড) আছে এবং এসব এলাকার পণ্য স্থানীয় বাজারে বিক্রি না করে সরাসরি রপ্তানি করা হয়। ১৯৮০ সালে দেশে ইপিজেড স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয় এবং ১৯৮৩ সালে চট্টগ্রামে প্রথম ইপিজেড চালু হয়। এখন বেপজার অধীনে আটটি ইপিজেড ও দুটি অর্থনৈতিক অঞ্চল আছে।
সদ্য শেষ হওয়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বেপজা ৩৬টি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিনিয়োগ চুক্তি করেছে এবং এসব অঞ্চল থেকে রপ্তানি হয়েছে ৮৪১ কোটি ডলার, যা আগের বছরের চেয়ে ২ দশমিক ২২ শতাংশ বেশি। বেপজার হিসাবে এসব অঞ্চলে সঞ্চিত বিনিয়োগ প্রায় ৭৫০ কোটি ডলার এবং সঞ্চিত রপ্তানি আয় প্রায় ১৩ হাজার কোটি ডলার। দেশের মোট রপ্তানির প্রায় ২০ শতাংশ আসে বেপজার এলাকা থেকে।
বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে সম্প্রতি ঢাকা ও চট্টগ্রামে ‘মিট দ্য ইনভেস্টরস’ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে বেপজা। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক (জনসংযোগ) এ এস এম আনোয়ার পারভেজের ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন বিনিয়োগ টানার সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম হলো বিদ্যমান বিনিয়োগকারীরা। সেবার মান বাড়ানো ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ শক্তিশালী করতে তাঁদের অভিজ্ঞতা ও মতামত শোনা হচ্ছে।
গত ১০ অক্টোবর ঢাকায় ওই অনুষ্ঠানেই চীন, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের বিনিয়োগকারীদের জন্য তিনটি আলাদা ডেস্ক চালু করা হয়। বেপজার নির্বাহী চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মোহাম্মদ মোয়াজ্জেম হোসেন বলেছেন, এসব ডেস্ক অংশীদারিত্ব জোরদার করবে এবং নতুন বিনিয়োগ আনতে সহায়তা করবে। তিনি জমির সীমিত প্রাপ্যতার কথাও উল্লেখ করেন এবং নতুন অঞ্চলগুলোতে বিনিয়োগের আহ্বান জানান।
এ বছর বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চল-১, বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চল-২, যশোর ইপিজেড ও পটুয়াখালী ইপিজেডকে পূর্ণাঙ্গ অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এসব নতুন এলাকায় অবকাঠামো ও জমি প্রস্তুত হলে বিনিয়োগের দেশভিত্তিক চিত্র বদলাতে পারে।
তবে এখনো অনেক প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়নি। কোন দেশের বিনিয়োগ কত এবং এর মধ্যে কত অংশ নতুন করে এসেছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত সরকারি তালিকা প্রকাশ করা হয়নি। চীনের অঙ্কে তাইওয়ান ও হংকংয়ের কোম্পানি থাকায় তুলনাটি সতর্কভাবে দেখতে হবে। এসব প্রতিষ্ঠানে কত মানুষ কাজ করেন, তাও এই হিসাবে নেই।
বেপজা পরবর্তী পূর্ণ পরিসংখ্যান কবে প্রকাশ করবে, তা তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি। নতুন চুক্তিগুলো কারখানা চালু করে উৎপাদনে এলে এবং যশোর-পটুয়াখালীসহ নতুন অঞ্চলে জমি বরাদ্দ শুরু হলে বিনিয়োগের ক্রম আবার বদলাতে পারে। ততদিন পর্যন্ত চীনের শীর্ষস্থান ও বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের দ্বিতীয় অবস্থানই বেপজার সর্বশেষ প্রকাশিত চিত্র।



