ইউক্রেন যুদ্ধ শেষ করার নতুন উদ্যোগের অংশ হিসেবে বুধবার রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠক করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ। রুশ বার্তা সংস্থার বরাত দিয়ে ইউএনবি জানায়, স্থানীয় সময় দিনের প্রথমার্ধে কনস্টানটিনোভস্কি প্রাসাদে বৈঠকটি শুরু হয়। বৈঠক শেষে যুদ্ধবিরতি বা শান্তিচুক্তি নিয়ে তাৎক্ষণিক কোনো ঘোষণা আসেনি।
বৈঠকের শুরুতে উইটকফ বলেন, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও ইউক্রেনের ত্রিপক্ষীয় আলোচনা পুনরায় শুরু করা যায় কি না, তা তিনি আলোচনা করতে চান। প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের দল পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করতে পারবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। আগের দিন নরওয়ের রাজধানী অসলোতে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি ও ইউরোপীয় নেতাদের সঙ্গে হওয়া আলোচনাকে তিনি ‘ফলপ্রসূ’ বলে বর্ণনা করেন। ওই বৈঠকে ‘কিছুটা গতি’ তৈরি হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
রুশ প্রেসিডেন্টের বরাত দিয়ে ইউএনবি জানায়, পুতিন যুদ্ধ শেষ করার প্রচেষ্টার জন্য ট্রাম্প ও উইটকফকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, মস্কো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক পুনরুদ্ধার নিয়ে আলোচনায় আগ্রহী। বৈঠকে রুশ পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক সহকারী ইউরি উশাকভ ও রুশ প্রেসিডেন্টের বিশেষ দূত কিরিল দিমিত্রিয়েভ উপস্থিত ছিলেন। ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার ভিডিও সংযোগে আলোচনায় যুক্ত হন।
পুতিন আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চলমান সংকট সমাধানে রাশিয়া সহায়তা করতে আগ্রহী। ইরানের সঙ্গে রাশিয়ার দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেখানে সহায়তার সুযোগ থাকলে মস্কো তা ব্যবহার করতে প্রস্তুত। একই দিন সেন্ট পিটার্সবার্গে চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াংয়ের সঙ্গে তাঁর বৈঠকের কথা ছিল।
মঙ্গলবার অসলোতে উইটকফের সঙ্গে জেলেনস্কির বৈঠকে নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী ইয়োনাস গার স্টোরে ও ফিনল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার স্টুব উপস্থিত ছিলেন। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ন্যাটোর প্রতিনিধিরাও ছিলেন। স্টুব ওই আলোচনাকে ‘প্রকৃত অগ্রগতি’ বলে বর্ণনা করেন। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও আলোচনাকে ‘ইতিবাচক’ বলে মন্তব্য করেন এবং বলেন, উইটকফ ওই ধারণাগুলো নিয়ে রুশ পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করবেন।
আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, জেলেনস্কি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে হামলার আগাম সতর্কবার্তা তিনি আবার পাচ্ছেন। স্টারশিল্ড সেবা ধীর করার অভিযোগও তিনি করেছেন; তবে রুবিও তা নাকচ করে বলেন, ট্রাম্পের সঙ্গে স্টারলিংক বা স্টারশিল্ডের সিদ্ধান্তের কোনো সম্পর্ক নেই। বৈঠকের আগে থেকেই ট্রাম্প জেলেনস্কির ওপর চাপ বাড়িয়েছেন এবং ইঙ্গিত দিয়েছেন, কিয়েভের পক্ষে অন্য কেউ আলোচনা করতে পারেন।
যুদ্ধ শুরু হয়েছে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার অভিযানের মধ্য দিয়ে; এখন তা চলছে চার বছরের বেশি সময় ধরে। গত বছর থেকে ওয়াশিংটনের নেতৃত্বে শান্তি আলোচনা চললেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। ইউএনবি বলছে, দুই পক্ষের শর্ত এখনো অনেক দূরে এবং দুই দেশের বাহিনী মাঠে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।
বৈঠকে উইটকফ রাশিয়ার ডিজেল রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের জন্য পুতিনকে ধন্যবাদ জানান। তাঁর কথায়, এতে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষক ও ট্রাকচালকদের জ্বালানি ব্যয় কমবে। ইউএনবি জানায়, এই সিদ্ধান্তে মার্কিন আইনপ্রণেতাদের একটি অংশ সমালোচনা করেছেন।
কূটনৈতিক তৎপরতার মধ্যেও সহিংসতা থামেনি। আল জাজিরা জানায়, বুধবার রাশিয়ার ব্রায়ানস্ক অঞ্চলে ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় একজন নিহত ও দুজন আহত হয়েছেন; অঞ্চলটির গভর্নর ইয়েগর কোভালচুক এই তথ্য দিয়েছেন। কিয়েভ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, রাজধানীর স্ব্যাতোশিনস্কি এলাকায় একটি উঁচু ভবনে রুশ হামলায় দুজন নিহত হয়েছেন।
এই বৈঠকে পুতিন ত্রিপক্ষীয় আলোচনায় রাজি হয়েছেন কি না, নতুন প্রস্তাবের কোন অংশ তিনি গ্রহণ করবেন এবং যুদ্ধবিরতির কোনো সময়সীমা থাকবে কি না—এসব এখনো স্পষ্ট নয়। বৈঠক শেষে যৌথ সংবাদ সম্মেলন বা লিখিত বিবৃতি আসেনি। রুশ পক্ষও বৈঠকের বিস্তারিত ফলাফল প্রকাশ করেনি।
পরবর্তী ধাপ নিয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক সময়সূচি ঘোষণা করা হয়নি। উইটকফ বলেছেন, তিনি অসলোর আলোচনার বিষয়গুলো পুতিনকে জানাবেন। ত্রিপক্ষীয় আলোচনা শুরু হলে তবেই বোঝা যাবে, এই বৈঠক থেকে বাস্তব অগ্রগতি হয়েছে কি না। এর মধ্যে যুদ্ধে দুই পক্ষের হামলা অব্যাহত থাকায় পরিস্থিতি অনিশ্চিতই রয়ে গেছে।



