মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থীদের সহায়তায় ৪০ কোটি ডলারের বেশি খরচ করার ঘোষণা দিয়েছেন। মঙ্গলবার নিজের প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে তিনি জানান, এই অর্থের বড় একটি অংশ ইতিমধ্যেই ব্যয় হয়ে গেছে। তাঁর হিসাবে বিজ্ঞাপন, সরাসরি ও পরোক্ষ ভোটার যোগাযোগ, জনসভা, টেলি-র্যালি, ভোটকেন্দ্রে ভোটার পৌঁছানোর কর্মসূচি এবং নির্বাচনী সতর্কতায় ৩০ কোটি ডলারের বেশি খরচ হয়েছে।
পোস্টে ট্রাম্প এই নির্বাচনকে দেশের ইতিহাসের ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচন’ বলে অভিহিত করেন এবং দলের পক্ষে এই সহায়তা দেওয়াকে নিজের জন্য সম্মানের বলে উল্লেখ করেন। তবে কোন রাজ্যে বা কোন প্রার্থীর কাছে কত অর্থ যাবে, সে বিষয়ে তিনি কোনো ভাগ প্রকাশ করেননি। আল জাজিরার প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, ব্যয়ের বিস্তারিত হিসাব তিনি দেননি।
নির্বাচনে কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণই নির্ধারিত হবে। এখন রিপাবলিকানদের হাতে হাউস অব রিপ্রেজেনটেটিভস ও সিনেট—দুই কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা, তবে ব্যবধান ঐতিহাসিকভাবে ছোট। হাউসে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য ২১৮টি আসন প্রয়োজন। ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমার সুযোগে দুটি কক্ষই দখলে নেওয়ার চেষ্টা করছে। সফল হলে তাঁরা ট্রাম্পের আইনপ্রণেতা এজেন্ডা আটকে দিতে পারবেন এবং প্রশাসনের বিরুদ্ধে তদন্ত জোরদার করতে পারবেন। সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে সুপ্রিম কোর্ট ও অন্যান্য ফেডারেল আদালতে তাঁর মনোনীতদেরও ঠেকাতে পারবে দলটি।
নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের অবস্থান সহজ নয়। আল জাজিরা উল্লেখ করেছে, রয়টার্স ও ইপসসের এ সপ্তাহের জরিপে ৩১ শতাংশ মার্কিনি তাঁর কাজে সন্তুষ্ট। অর্থনীতি ও ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাত নিয়ে অসন্তোষের মধ্যে কিছু রিপাবলিকানও তাঁর থেকে দূরত্ব তৈরি করছেন। অন্যদিকে কাছাকাছি লড়াইয়ের আসনগুলোতে দলের প্রার্থীদের আরও সহায়তা চাইছেন অনেকে।
ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে বড় অর্থ ঢালছেন ধনকুবের মাইকেল ব্লুমবার্গ। গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৮৪ বছর বয়সী সাবেক নিউইয়র্ক মেয়র সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে মোট ৮ কোটি ডলার দিয়েছেন। তাঁর রাজনৈতিক উপদেষ্টা হাওয়ার্ড উলফসন নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেছেন, লক্ষ্য হলো হাউসে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা শুধু ন্যূনতম ২১৮ আসনে সীমাবদ্ধ না রাখা। ‘২২১ আর ২৩০ আসনের মধ্যে পার্থক্য হাউস সংখ্যাগরিষ্ঠতার ক্ষেত্রে সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ,’ তাঁর বক্তব্য উদ্ধৃত করেছে গার্ডিয়ান।
ব্লুমবার্গের দেওয়া অর্থের মধ্যে ২ কোটি ৪০ লাখ ডলার গেছে এভরিথিং ফর গান সেফটিতে, যে সংস্থা তিনি সহপ্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং যা হাউসের ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের পক্ষে খরচ করছে। ১ কোটি ৬০ লাখ ডলার গেছে হাউস মেজরিটি প্যাক-এ, যা হাউসে ডেমোক্র্যাট নেতা হাকিম জেফরিসের সঙ্গে যুক্ত। এ ছাড়া টেক্সাসের সিনেট আসনে ডেমোক্র্যাট জেমস তালারিকোর সমর্থনে একটি সুপার প্যাককে ২৫ লাখ ডলার এবং নিউইয়র্কের গভর্নর ক্যাথি হোকলের পুনর্নির্বাচনসহ কয়েকটি গভর্নর নির্বাচনের প্রচারেও অর্থ দিয়েছেন তিনি।
রিপাবলিকানদের পক্ষে ট্রাম্প একা নন। গার্ডিয়ান জানিয়েছে, ট্রাম্পের মিত্র ইলন মাস্ক এ পর্যন্ত রক্ষণশীল দল ও গ্রুপগুলোর পক্ষে ৩৬ কোটি ৬০ লাখ ডলার খরচ করেছেন। আল জাজিরার তথ্য অনুযায়ী, ট্রাম্পের নামে গঠিত সুপার প্যাক ম্যাগা ইনক. সেপ্টেম্বরের শুরুতে ৪১ কোটি ৫৮ লাখ ডলারের বেশি নগদ হাতে রেখেছিল। ম্যাগা ইনকের সঙ্গে যুক্ত নতুন দুটি সংস্থার একটি, নো গোয়িং ব্যাক প্যাক, গত মাসেই রাজনৈতিক বিজ্ঞাপনে ৬ কোটি ৮৭ লাখ ডলার খরচ করেছে বলে বিজ্ঞাপন-পর্যবেক্ষণ সংস্থা অ্যাডইমপ্যাক্টের হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এই অর্থ ব্যবহার নিয়ে আইনি প্রশ্নও উঠেছে। সুপার প্যাক আইনত প্রার্থীদের প্রচারের বাইরে স্বাধীন থাকতে বাধ্য। গত মাসে প্রচার অর্থায়ন-পর্যবেক্ষণ সংস্থা ক্যাম্পেইন লিগ্যাল সেন্টার অভিযোগ করে, ম্যাগা ইনকের খরচ নিয়ে নিয়ন্ত্রণ দাবি করে ট্রাম্প ওই নিয়ম ভেঙেছেন। তাঁরা ৪ সেপ্টেম্বর অফিসে সাংবাদিকদের সঙ্গে ট্রাম্পের একটি কথোপকথনের উল্লেখ করে, যেখানে তিনি বলেছিলেন, দলের জন্য ‘যত অর্থ দরকার’ তিনি খরচ করবেন এবং ‘এটি ম্যাগা ইনকের অর্থ, এটি আমার অর্থ, যা আমি নিয়ন্ত্রণ করি’।
সামনের তিন সপ্তাহে ট্রাম্প নিজেও প্রচারে নামছেন। আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৩২ দিনের একটি প্রচার সফরের অংশ হিসেবে তিনি সাউথ ক্যারোলাইনা ও আইওয়ায় যাবেন। ৩ নভেম্বরের ভোটে দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে, তা নির্ধারিত হবে।
এখনো যা অজানা: ৪০ কোটি ডলারের ঘোষণার মধ্যে কত অর্থ কোন কোন আসনে পৌঁছাবে, ম্যাগা ইনকের সঞ্চয় কতটা সরাসরি ব্যবহার করা হবে এবং এই বিপুল ব্যয় ভোটের ফল কতটা বদলাতে পারে—এসবের স্পষ্ট উত্তর নেই। নির্বাচনের আগে জরিপের সংখ্যাও বদলাতে পারে। তাই শেষ সপ্তাহগুলোতে প্রার্থীদের প্রচার, দলগুলোর বিজ্ঞাপন ব্যয় এবং ভোটারদের প্রতিক্রিয়াই বলে দেবে, এই অর্থের ঢল আসন সংখ্যায় কতটা প্রভাব ফেলে।



