দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু জ্বরে সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে আরও এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম বুধবার আলাদা দুটি নিয়মিত প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে। হিসাবটি মঙ্গলবার সকাল ৮টা থেকে বুধবার সকাল ৮টা পর্যন্ত সময়ের।
ডেঙ্গুবিষয়ক প্রতিবেদন অনুযায়ী, নতুন সাতটি মৃত্যুর মধ্যে চারজন নারী ও তিনজন পুরুষ। এ সময়ে ডেঙ্গু নিয়ে সারাদেশের বিভিন্ন হাসপাতালে নতুন করে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৩৭৩ জন; তাঁদের মধ্যে ৭৮৮ জন পুরুষ ও ৫৮৫ জন নারী।
এ নিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গুতে মোট মৃত্যু হয়েছে ৩৬৪ জনের। বছরের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ লাখ ১৬ হাজার ৯৯০ জন। তাঁদের মধ্যে ১ লাখ ১০ হাজার ৬৫৬ জন সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন; বুধবার সকাল পর্যন্ত ৫ হাজার ৯৭০ জন চিকিৎসাধীন ছিলেন।
নতুন ভর্তি রোগীদের বিভাগভিত্তিক হিসাবে বরিশালে ২২৫ জন, চট্টগ্রামে ১৯৭ জন, ঢাকা বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) ৩২০ জন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ৭১ জন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ২১১ জন, খুলনায় ১৫৫ জন, ময়মনসিংহে ৪৫ জন, রাজশাহীতে ১১১ জন, রংপুরে ২৮ জন এবং সিলেটে ১০ জন রয়েছেন।
এ বছর এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায়, ১০৬ জন। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে মৃত্যু হয়েছে ৩২ জনের। এছাড়া খুলনা বিভাগে ৬৫, বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগে ২৮ করে, ময়মনসিংহে ২৭, ঢাকা বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) ২৪, রাজশাহীতে ২৩, রংপুরে ৭ এবং সিলেটে ৪ জনের মৃত্যু হয়েছে।
অক্টোবর মাসে সংক্রমণ ও মৃত্যু দুটোই বাড়ছে। চলতি মাসের প্রথম ২১ দিনে ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৩৭ হাজার ৩৭০ জন এবং মৃত্যু হয়েছে ১১৯ জনের। গত সেপ্টেম্বরে ভর্তি হয়েছিলেন ৪৩ হাজার ৭৭৪ জন, মৃত্যু হয়েছিল ১৪৮ জনের। গত বছর পুরো বছর ডেঙ্গুতে ১ লাখ ২ হাজার ৮৬১ জন আক্রান্ত ও ৪১৩ জনের মৃত্যু হয়েছিল; ২০২৪ সালে আক্রান্ত হয়েছিলেন ১ লাখ ১ হাজার ২১৪ জন এবং মৃত্যু হয়েছিল ৫৭৫ জনের।
আলাদা প্রতিবেদনে হামের পরিস্থিতি উঠে এসেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় সিলেট বিভাগে হামের উপসর্গ নিয়ে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে দেশে হাম ও হামের উপসর্গে মোট ১ হাজার ২০৫ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ১০৪ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হামে এবং ১ হাজার ১০১ জনের মৃত্যু হয়েছে হামের উপসর্গ নিয়ে।
ওই ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৯৯৭ জনের শরীরে হামের উপসর্গ পাওয়া গেছে এবং ১৩ জনের নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছে। সব মিলিয়ে নতুন রোগী ১ হাজার ১০ জন। গত ১৫ মার্চ থেকে সন্দেহজনিত হামের মোট রোগী দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ১৬ হাজার ৭৬৫ জনে; নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছে ২৩ হাজার ২১২ জনের শরীরে। এ সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ লাখ ৯২ হাজার ৬৯৫ জন, যাঁদের ১ লাখ ৮৫ হাজার ১১০ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন।
হামের এই সংক্রমণ গত মার্চের মাঝামাঝি থেকে শুরু হয়। সরকার এরই মধ্যে ছয় মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের জন্য জরুরি টিকাদান কর্মসূচি চালিয়েছে। সংবাদমাধ্যমের হিসাবে, এপ্রিলের পর থেকে প্রায় দুই কোটি শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে। তবে টিকাদান কর্মসূচির আওতায় কত শিশু বাদ পড়েছে বা কোন এলাকায় সংক্রমণ সবচেয়ে বেশি, সে বিস্তারিত চিত্র সরকারি বুলেটিনে নেই।
বিশেষজ্ঞরা আগেও বলেছেন, ডেঙ্গু আক্রান্ত অনেক রোগী দেরিতে হাসপাতালে আসেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডেঙ্গু ইউনিটের প্রধান অধ্যাপক শাহনূর শারমিন মুন্নী সংবাদমাধ্যমকে বলেছিলেন, অনেক রোগী এমন অবস্থায় আসেন যে চিকিৎসা দেওয়ার সময় কম পাওয়া যায়। জ্বর কমে গেলেই সুস্থ হয়ে গেছেন—এমন ধারণা ঝুঁকিপূর্ণ বলেও তিনি সতর্ক করেছেন।
সরকারি হাসপাতালগুলোর ধারণক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগও চলছে। ডেঙ্গু রোগীদের জন্য আলাদা ওয়ার্ড, এক জায়গায় সেবা ও বিনামূল্যে এনএস১ পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে। গত ১৭ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কুর্মিটোলা বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ গভর্নমেন্ট হাসপাতাল পরিদর্শন করে পরিচ্ছন্নতা ও ব্যবস্থাপনার উন্নয়নে সাত দিনের সময়সীমা দিয়েছিলেন। হাসপাতালগুলোর আসল চাপ ও সেবার মান কতটা উন্নত হয়েছে, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি।
সর্বশেষ বুলেটিনে নতুন সাতজনের বয়স, আগের রোগ বা ঠিক কোন জেলায় তাঁদের মৃত্যু হয়েছে—এসব বিস্তারিত দেওয়া হয়নি। হামে মারা যাওয়া শিশুটির বয়স ও টিকাদানের অবস্থাও জানানো হয়নি। ডেঙ্গুর সংক্রমণ কেন অক্টোবরেও কমছে না এবং হামের টিকাদান কর্মসূচি কতটা কার্যকর হচ্ছে, সে প্রশ্নের সরাসরি উত্তর সরকারি প্রতিবেদনে নেই।
ডেঙ্গু সাধারণত জুন থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে বেশি থাকে; তবে এবার অক্টোবরেও হাসপাতালে রোগীর চাপ বাড়ছে। নভেম্বর পর্যন্ত সংক্রমণ চলতে পারে বলে আগেই সতর্ক করেছিলেন স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা। সামনের দিনগুলোতে দৈনিক মৃত্যু ও ভর্তির সংখ্যা, হাসপাতালের শয্যা-সংকট এবং হামের টিকাদান কত দ্রুত এগোচ্ছে—এসবই পরিস্থিতি কতটা নিয়ন্ত্রণে আছে তা বোঝাবে।



