নাটোরের বনপাড়ায় মঙ্গলবার ভোরে যে বাস-ট্রাক সংঘর্ষে ১২ জন নিহত হয়েছেন, সেই বাসটি গত পাঁচ মাস ধরে নবায়ন করা ফিটনেস সনদ ছাড়াই দূরপাল্লার রুটে চলছিল। হাইওয়ে পুলিশ ও জেলা প্রশাসনের তদন্ত কমিটি এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।

মঙ্গলবার ভোর ৪টার দিকে নাটোর-পাবনা মহাসড়কে বনপাড়া পুলিশ তদন্তকেন্দ্রের সামনে বরগুনা থেকে ছেড়ে আসা চাঁপাইনবাবগঞ্জগামী আরপি স্পেশাল পরিবহনের বাসের সঙ্গে বিপরীত দিক থেকে আসা বালুবোঝাই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। পুলিশের সর্বশেষ হিসাবে এতে ১২ জন নিহত ও ৩২ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে বাসের সুপারভাইজার সোহেল রানা ও ট্রাকচালক আবুল কালাম আছেন।

বাসটি সোমবার রাতে বরগুনা থেকে যাত্রী নিয়ে ছেড়েছিল। চাঁপাইনবাবগঞ্জ পর্যন্ত পথের দৈর্ঘ্য ৫০০ কিলোমিটারের বেশি; দুর্ঘটনার সময় বাসে ৪০ জনের বেশি যাত্রী ছিলেন। সংঘর্ষে বাসটির সামনের অংশ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

বনপাড়া হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আলমগীর হোসেন বলেন, প্রাথমিক তদন্তে দেখা গেছে বাসটির ফিটনেস সনদের মেয়াদ গত মে মাসেই শেষ হয়ে গিয়েছিল। এতদিন কীভাবে বাসটি এত দীর্ঘ রুটে চলতে পেরেছে, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বিষয়টি জেলা প্রশাসনের তদন্ত কমিটিকে জানানো হয়েছে।

তদন্ত কমিটির প্রধান ও নাটোরের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. আবুল হায়াত বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেছেন, সব কাগজপত্র, সরকারি নথি ও নিরাপত্তার শর্ত পরীক্ষা করে দুর্ঘটনার মূল কারণ খুঁজে বের করা হবে। তদন্ত শেষ হওয়ার আগে তিনি বিস্তারিত মন্তব্য করতে রাজি হননি।

বাসমালিক মো. মিন্টু আলী বলেছেন, তিনি গাড়িটি এক বছর আগে কিনেছিলেন এবং কয়েক মাস ব্যক্তিগত ভাড়ায় চালান। রুট পারমিট পাওয়ার পর চার মাস আগে এই রুটে চলাচল শুরু করেন। তাঁর দাবি, ফিটনেস সনদ নবায়নের জন্য তিনি বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) কাছে কাগজ জমা দিয়েছিলেন, কিন্তু নবায়ন করা সনদ পাননি। নথি হালনাগাদে বিলম্বের কারণে তিনি বাসটি চালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন বলেও জানান তিনি।

বিআরটিএর কাছে বাসমালিকের এই দাবি যাচাই করতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে ফিটনেস নবায়নে প্রকৃতপক্ষে কতটা বিলম্ব হয়েছিল এবং সেই সময়ে বাসটি চলাচলে কেউ অনুমতি দিয়েছিল কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

দুর্ঘটনার সময় কে বাসটি চালাচ্ছিলেন, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বেঁচে যাওয়া কয়েকজন যাত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, মূল চালক পেছনের সিটে ঘুমিয়ে ছিলেন এবং বাসটি চালাচ্ছিলেন সুপারভাইজার সোহেল রানা। নাটোরের পুলিশ সুপার মো. শরীফুল হক বলেছেন, বাসটি ওভারটেক করার সময় চালক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে থাকতে পারেন। পুলিশ যাত্রীদের অভিযোগও তদন্ত করছে, তবে এখনো তা নিশ্চিত করেনি।

বাসমালিক মিন্টু আলী অবশ্য যাত্রীদের বক্তব্য মানতে চাননি। তিনি বলেছেন, সোহেল রানা একজন অভিজ্ঞ চালক ছিলেন এবং বাসে দুজন চালক ছিলেন। তাঁর ভাষায়, মুহূর্তের অসাবধানতায় দুর্ঘটনাটি ঘটেছে। তদন্ত কমিটির প্রধান বলেছেন, প্রাথমিকভাবে তাদের ধারণা, চালক ক্লান্ত বা তন্দ্রাচ্ছন্ন ছিলেন। চালক কে ছিলেন এবং তাঁর বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স ছিল কি না, তা তদন্তে দেখা হবে।

ঘটনার পর মঙ্গলবার রাতে বড়াইগ্রাম থানায় বনপাড়া হাইওয়ে থানার সহকারী উপপরিদর্শক আকবর হোসেন বাদী হয়ে মামলা করেন। বাস ও ট্রাকের অজ্ঞাতপরিচয় চালকদের আসামি করা হয়েছে। বড়াইগ্রাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, মামলাটি হাইওয়ে থানা তদন্ত করবে।

সড়ক দুর্ঘটনা বাংলাদেশে দীর্ঘদিনের একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা। যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাবে ২০২৫ সালে দেশে ৬ হাজার ৭২৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৯ হাজার ১১ জন নিহত এবং ১৪ হাজার ৮১২ জন আহত হয়েছেন। অফিট গাড়ি, অতিরিক্ত গতি, ক্লান্ত চালক ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার দুর্বলতা এসব দুর্ঘটনার পেছনে বারবার উঠে এসেছে।

এখনো যা অজানা: দুর্ঘটনার সময় প্রকৃতপক্ষে কে বাসটি চালাচ্ছিলেন, সুপারভাইজারের বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স ছিল কি না, ফিটনেস সনদ নবায়নে এতদিন বিলম্ব কেন হলো, এই সময়ে বাসটি চলাচলে বিআরটিএ বা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষের গাফিলতি ছিল কি না এবং সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি কখন প্রতিবেদন জমা দেবে।

তদন্ত কমিটি ইতিমধ্যে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর দুর্ঘটনার দায় নির্ধারণ এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছে প্রশাসন। এদিকে রাজশাহী ও নাটোরের বিভিন্ন হাসপাতালে আহতদের চিকিৎসা চলছে। নিহতদের মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।