নতুন বেতন স্কেলের আওতায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অক্টোবরের বেতনের সঙ্গে জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় তিন মাসের বকেয়া পাবেন। অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের বরাতে দ্য ডেইলি স্টার জানিয়েছে, চলতি মাসের শেষ সপ্তাহে—সাধারণত ২৩ বা ২৪ অক্টোবর—তাঁরা এই টাকা পান। ফলে ওই মাসে প্রায় চার মাসের সমান বেতন একসঙ্গে হাতে আসবে।
বকেয়ার অঙ্ক সবার জন্য এক নয়। গ্রেড, গত ৩০ জুন পর্যন্ত পাওয়া মূল বেতন এবং নতুন স্কেলে নির্ধারিত বেতনের পার্থক্য অনুযায়ী প্রত্যেকের টাকার পরিমাণ কমবে বা বাড়বে। যাঁরা পদোন্নতি, বদলি, টাইম স্কেল বা উচ্চতর গ্রেড পেয়েছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে হিসাব আরও জটিল হবে।
তবে এই সুবিধা এখনই পাচ্ছেন না এমপিওভুক্ত শিক্ষক ও কর্মচারীরা, কিংবা বিচার বিভাগীয় কর্মচারীরা। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বরাতে দ্য ডেইলি স্টার লিখেছে, তাঁদের বেতন নির্ধারণ ও বকেয়া পরিশোধ নভেম্বর বা ডিসেম্বর পর্যন্ত গড়িয়ে যেতে পারে।
পটভূমি হলো, গত ৩১ আগস্ট মন্ত্রিসভা ন্যাশনাল পে স্কেল ২০২৬ অনুমোদন করে। ১৯ সেপ্টেম্বর এর গেজেট প্রকাশিত হয় এবং নতুন কাঠামো ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর ধরা হয়। ২০ গ্রেডের এই কাঠামোয় সর্বনিম্ন মূল বেতন ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০১৫ সালের পর এটি সরকারি কর্মচারীদের বেতনে প্রথম বড় সংশোধন।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, প্রথম ধাপে ১০ থেকে ২০ গ্রেডের কর্মচারীরা জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত মূল বেতনের বাড়তির ৫০ শতাংশ পাবেন। ১ থেকে ৯ গ্রেডের কর্মকর্তারা পাবেন ৪০ শতাংশ। জানুয়ারি ২০২৭ থেকে জুন পর্যন্ত এই হার হবে যথাক্রমে ৭৫ ও ৭০ শতাংশ। ১ জুলাই ২০২৭ থেকে পূর্ণ সংশোধিত মূল বেতন চালু হবে। নতুন স্কেলের ভাতাগুলো কার্যকর হবে ১ জানুয়ারি ২০২৮ থেকে।
চলতি অর্থবছরে দুই ধাপের বেতন বাড়তি মেটাতে অর্থ বিভাগ ৩৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছে। সরকারি হিসাবে, পুরো কাঠামো বাস্তবায়নে বছরে অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা লাগবে।
বেতন নির্ধারণের কাজ হচ্ছে আইবাস প্লাস প্লাস (iBAS++) নামের সরকারি হিসাব ব্যবস্থার একটি মডিউলে। কর্মচারীদের নির্ধারিত পোর্টালে জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য, জন্মতারিখ, বর্তমান পদ ও গ্রেড, চাকরিতে যোগদানের তারিখ এবং চলমান মূল বেতন দিতে হচ্ছে। আগের বেতন নির্ধারণের রেকর্ডও যাচাই করতে হচ্ছে। যাঁরা পদোন্নতি, বদলি, টাইম স্কেল বা উচ্চতর গ্রেড পেয়েছেন, তাঁদের সংশ্লিষ্ট অফিস আদেশ ও কাগজপত্র প্রস্তুত রাখতে বলা হয়েছে।
বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) জানিয়েছে, ৪ অক্টোবর বেতন নির্ধারণের কাজ শুরু হয় এবং ২০ অক্টোবরের মধ্যে তা শেষ করার লক্ষ্য ছিল। হিসাব অফিসগুলোর কর্মকর্তাদের অনলাইন প্রশিক্ষণও দেওয়া হচ্ছে। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সারা দেশের সব দপ্তরে কাজ শেষ হয়েছে কি না, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
নতুন বেতন কাঠামোর আওতায় সরকারি খাতের প্রায় ২৪ লাখ বেসামরিক ও প্রতিরক্ষা কর্মচারী এবং ৯ লাখ ২৫ হাজার পেনশনভোগী রয়েছেন। এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও কর্মচারীর সংখ্যা প্রায় ৫ লাখ ৮৭ হাজার; এর মধ্যে ৪ লাখ ৩২ হাজার শিক্ষক। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী এই সংখ্যা।
এমপিওভুক্ত মাদ্রাসা ও কারিগরি স্কুলের বেতন হিসাব মূলত হাতে করতে হয়। সে কারণেই ওই প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সার্কুলার দিতে দেরি হচ্ছে বলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। অন্যদিকে বিচার বিভাগীয় কর্মচারীদের বেতন কাঠামো নিয়ে সচিব পর্যায়ের কমিটি সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি। ফলে অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি পৃথক মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করা হয়েছে।
জুডিশিয়াল সার্ভিস পে কমিশন সুপারিশ করেছে, বিচার বিভাগীয় ভাতা বর্তমান ৩০ শতাংশের বদলে মূল বেতনের ১০০ শতাংশ করা হোক। এর সঙ্গে আরও কিছু সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাবও রয়েছে। মন্ত্রিসভা কমিটি সিদ্ধান্ত নিলে অর্থ মন্ত্রণালয় সার্কুলার জারি করবে এবং বিচার বিভাগীয় কর্মচারীরাও নতুন স্কেলের আওতায় আসবেন।
এখনো যা অজানা: নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সব সরকারি দপ্তরে বেতন নির্ধারণ সম্পন্ন হয়েছে কি না, তা স্বতন্ত্রভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। প্রত্যেক কর্মচারীর নির্দিষ্ট বকেয়ার অঙ্কও সরকার প্রকাশ করেনি। সব অফিসে ২৩ বা ২৪ অক্টোবরেই বেতন পৌঁছাবে কি না, তাও নিশ্চিত নয়। এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারী ও বিচার বিভাগীয় কর্মচারীরা ঠিক কবে টাকা পাবেন, সে তারিখও এখনো ঘোষণা করা হয়নি।
সরকারি কর্মচারীদের জন্য পরবর্তী ধাপগুলো এরই মধ্যে নির্ধারিত। অক্টোবরের বেতনের পর জানুয়ারি ২০২৭-এ বাড়তির দ্বিতীয় ধাপ, জুলাই ২০২৭-এ পূর্ণ মূল বেতন এবং জানুয়ারি ২০২৮-এ ভাতার সংশোধিত হার কার্যকর হওয়ার কথা। পেনশনও ধাপে ধাপে বাড়ছে। ফলে বেতন নির্ধারণের কাজ সময়মতো শেষ হওয়া এবং বকেয়া সঠিকভাবে হিসাব হওয়া—দুটোই সরকারি কর্মচারীদের জন্য এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।



