সৌদি আরবের মক্কা অঞ্চলে দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। নিহত দুজন হলেন নজরুল ইসলাম আবদুল বাসির ও সুইটি আক্তার। গত ১৪ অক্টোবর এই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয় বলে সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাতে দেশটির রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সৌদি প্রেস এজেন্সির (এসপিএ) বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।

দুজনই ২০২২ সালের শেষ দিকে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন এবং আল মাজাল কোম্পানিতে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ শুরু করেন। জেদ্দার বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেল ১৮ অক্টোবর প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক চিঠিতে এসব তথ্য জানিয়েছে। চিঠির বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যমগুলো প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

চিঠিতে বলা হয়েছে, ৩০ সেপ্টেম্বর সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পাঠানো বন্দিদের তালিকায় দুজনের নাম ছিল। ওই তালিকা অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ১ আগস্ট তথ্যপ্রযুক্তি-সম্পর্কিত অপরাধের অভিযোগে নজরুল ইসলামকে আটক করা হয়। পরদিন, ২ আগস্ট, ব্যভিচারের অভিযোগে আটক হন সুইটি আক্তার। নজরুলকে জেদ্দা সংশোধনকেন্দ্রে ও সুইটিকে জেদ্দা নারী কারাগারে রাখা হয়েছিল।

তবে ওই তালিকায় তাঁদের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের কোনো উল্লেখ ছিল না। চিঠির বরাত দিয়ে দ্য ডেইলি স্টার লিখেছে, তালিকায় ৯৭ জন বন্দির অপরাধের সংক্ষিপ্ত বিবরণ থাকলেও নজরুল ও সুইটির সাজার ঘরটি ফাঁকা ছিল।

সৌদির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাতে দেশটির গণমাধ্যমে বলা হয়েছে, মক্কা নগরীর একটি মসজিদের ভেতরে ‘অনৈতিক কাজে’ জড়িত থাকার দায়ে দুজনকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। সাজার ক্ষেত্রে অপরাধের গুরুত্ব ও মসজিদের পবিত্রতা লঙ্ঘনের বিষয়টি বিবেচনা করা হয়েছে বলে জানানো হয়। তবে ঠিক কোন মসজিদে বা কীভাবে ঘটনাটি ঘটেছিল, সে বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষ বিস্তারিত জানায়নি।

কনস্যুলেটের চিঠিতে বলা হয়েছে, তথ্যপ্রযুক্তি অপরাধ বা ব্যভিচারের অভিযোগে এর আগে কোনো বাংলাদেশিকে সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার নজির তাদের জানা নেই। চিঠিতে আরও বলা হয়, মৃত্যুদণ্ডের রায় বা তা কার্যকরের বিষয়টি সৌদি কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ দূতাবাস বা জেদ্দার কনস্যুলেটকে আগে জানায়নি, আনুষ্ঠানিকভাবে পরে জানানো হয়নি।

ঘটনার পর ১৫ অক্টোবর জেদ্দার কনস্যুলেট সৌদির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কূটনৈতিক নোট পাঠায়। এরপর ১৮ অক্টোবর ঢাকায় নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূতের সঙ্গেও বিষয়টি তোলা হয়। গত সোমবার জেদ্দায় বাংলাদেশের কনস্যুলার জেনারেল মো. সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে সৌদির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক ফরিদ বিন সাদ আল শেহরির বৈঠক হয়। বৈঠকে তালিকায় সাজার তথ্য কেন বাদ দেওয়া হলো, তা জানতে চাওয়া হয়।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের বরাতে প্রথম আলো জানিয়েছে, ওই বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়, তালিকায় মৃত্যুদণ্ডের তথ্য থাকলে দুজনকে রক্ষায় পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হতো। সৌদির পক্ষ থেকে বলা হয়, আগস্ট ২০২৩-এর গ্রেপ্তারের পর নিম্ন আদালত বিচার শেষে রায় দেয় এবং ১৩ সদস্যের আপিল আদালতের বেঞ্চ ওই রায় বহাল রাখে। নারী ও পুরুষের জন্য আলাদা সেলে রায় অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির সাংবাদিকদের বলেছেন, সৌদি আরবে অভিযোগের ভিত্তিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়াটা তাঁদের জন্য হতাশার। তথ্য আদান-প্রদান ও কূটনৈতিক যোগাযোগে ঘাটতির কথা তিনি স্বীকার করেছেন এবং সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে বিস্তারিত ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে বলে জানান। এর আগে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেছিলেন, ঘটনাটি দুর্ভাগ্যজনক এবং প্রবাসীদের যে দেশেই থাকুন, সেই দেশের আইন মেনে চলা উচিত।

চিঠির তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবের পশ্চিমাঞ্চলের কারাগারগুলোতে নৈতিকতাসংক্রান্ত বিভিন্ন মামলায় ৩০৬ জন বাংলাদেশি আটক আছেন। তাঁদের মধ্যে ১৪৭ জনের সাজা এক মাস থেকে ১৫ বছর পর্যন্ত। এ ছাড়া মক্কায় তথ্যপ্রযুক্তি অপরাধের তিনটি পৃথক মামলায় তিনজন বাংলাদেশি ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড পেয়েছেন।

এখনো যা অজানা: আদালতের রায়ের কপি বা বিচারিক কার্যক্রমের বিস্তারিত তথ্য বাংলাদেশের হাতে আসেনি। দুজনের জন্য দোভাষী বা আইনজীবী ছিল কি না, সে তথ্যও নেই। চিঠিতে বলা হয়েছে, দুই পরিবারের পক্ষ থেকে আইনি সহায়তা চেয়ে কনস্যুলেটে কোনো আবেদন বা যোগাযোগ করা হয়নি। দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পেছনে ঠিক কী কী অভিযোগ ও প্রমাণ ছিল, তাও নথিতে স্পষ্ট নয়।

পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে কনস্যুলেট মক্কায় সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের শাখায় কূটনৈতিক নোট পাঠিয়ে রায়ের কপি ও বিচারপ্রক্রিয়ার তথ্য চেয়েছে। রায় হাতে পাওয়ার পর বিস্তারিত প্রতিবেদন পাঠানোর কথা বলেছে তারা। এদিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও টাঙ্গাইলের পরিবারগুলো মরদেহ ফিরে পেতে সরকারের সহায়তা চেয়েছে বলে সংবাদমাধ্যমে খবর এসেছে।

সৌদি আরব বাংলাদেশি কর্মীদের অন্যতম বড় গন্তব্য; সেখানে অনেক বাংলাদেশি নির্মাণ, পরিচ্ছন্নতা ও সেবার কাজ করেন। কনস্যুলার তথ্য আদান-প্রদান, আইনি সহায়তা ও মৃত্যুদণ্ডের মতো সাজার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তা শুধু এই দুটি পরিবারের নয়, বরং প্রবাসী কর্মীদের সুরক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গেও জড়িত।