আইনের শাসনের আন্তর্জাতিক সূচকে এ বছর বাংলাদেশের সামান্য উন্নতি হয়েছে। ওয়ার্ল্ড জাস্টিস প্রজেক্ট (ডব্লিউজেপি) বুধবার প্রকাশিত ‘রুল অব ল ইনডেক্স ২০২৬’–এ বাংলাদেশ ১৪৩টি দেশ ও অঞ্চলের মধ্যে ১২৩তম স্থানে আছে। গত বছরের তুলনায় দেশের অবস্থান দুই ধাপ উপরে উঠলেও স্কোর এখনো বিশ্ব গড়ের অনেক নিচে।
ডব্লিউজেপির হিসাবে বাংলাদেশের সামগ্রিক স্কোর ০ দশমিক ৩৯৩ (১-এর মধ্যে), গত বছর ছিল ০ দশমিক ৩৯১। অর্থাৎ এক বছরে উন্নতি মাত্র ০ দশমিক ৬ শতাংশ। এই উন্নতির হার বাংলাদেশকে বিশ্বের ১৫তম বড় উন্নতকারী দেশ এবং দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে বেশি অগ্রগতি করা দেশের তালিকায় রেখেছে। তবে বৈশ্বিক গড় স্কোর ০ দশমিক ৫৫; বাংলাদেশ সেই গড়ের চেয়ে ০ দশমিক ১৫-এর বেশি পিছিয়ে।
সূচকটি কী মাপে: ডব্লিউজেপি আটটি বিষয়ের ভিত্তিতে একটি দেশের আইনের শাসন পরিমাপ করে—সরকারের ক্ষমতার ওপর সীমা বা জবাবদিহি, দুর্নীতির অনুপস্থিতি, স্বচ্ছ সরকার, মৌলিক অধিকার, শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা, বিধি-প্রয়োগ, দেওয়ানি বিচার এবং ফৌজদারি বিচার। প্রতিটি বিষয়ের স্কোর শূন্য থেকে একের মধ্যে; এক মানে আইনের শাসনে সবচেয়ে দৃঢ় অবস্থান। এ বছরের সূচকে ১৪৩টি দেশ ও অঞ্চলের ২ লাখ ১৫ হাজারের বেশি পরিবারের অভিজ্ঞতা এবং ৩ হাজার ৪০০ আইনজীবী ও বিশেষজ্ঞের জরিপের তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে। তথ্য সংগ্রহ চলেছে এ বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত।
আটটি বিষয়ের মধ্যে বাংলাদেশ এগিয়েছে কেবল তিনটিতে—সরকারের ক্ষমতার ওপর জবাবদিহি, দুর্নীতির অনুপস্থিতি এবং বিধি-প্রয়োগ। বাকি পাঁচটি বিষয়ে অবস্থান আগের বছরের চেয়ে খারাপ হয়েছে। এর মধ্যে মৌলিক অধিকারে বাংলাদেশের অবস্থান সবচেয়ে দুর্বল: ১৩৩তম, স্কোর ০ দশমিক ৩০। এই স্কোর দেশটিকে বিশ্বের সবচেয়ে নিচু ১১টি দেশের একটি করে রেখেছে।
দ্বিতীয় সবচেয়ে দুর্বল ক্ষেত্র দেওয়ানি বিচার, যেখানে বাংলাদেশ ১৩২তম এবং স্কোর ০ দশমিক ৩৬। সাধারণ মানুষ তাঁর অভিযোগের নিষ্পত্তি আদালতের মাধ্যমে কতটা পেতে পারেন, এই সূচক তা দেখে। বিধি-প্রয়োগে অবস্থান ১২৪তম (স্কোর ০ দশমিক ৪০), ফৌজদারি বিচারে ১১৭তম (০ দশমিক ৩২), দুর্নীতির অনুপস্থিতিতে ১১৩তম (০ দশমিক ৩৫) এবং সরকারের ক্ষমতার সীমায় ১১১তম (০ দশমিক ৩৮)। তুলনামূলক ভালো অবস্থান স্বচ্ছ সরকারে—১০৬তম, স্কোর ০ দশমিক ৪১; শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তায় ১০৭তম, স্কোর ০ দশমিক ৬৩।
শুধু এক বছরের চিত্র নয়, পাঁচ বছরের ধারাও স্বস্তির নয়। ডব্লিউজেপির দেশ-প্রোফাইল অনুযায়ী ২০২১ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে বাংলাদেশের সামগ্রিক স্কোর ০ দশমিক ৪০ থেকে ০ দশমিক ৩৯-এ নেমেছে, অর্থাৎ ০ দশমিক ৮ শতাংশ অবনতি। এই পাঁচ বছরে আটটি বিষয়ের ছয়টিতেই স্কোর কমেছে। সবচেয়ে বেশি কমেছে দেওয়ানি বিচারে, ৪ দশমিক ২ শতাংশ; এরপর স্বচ্ছ সরকারে ২ দশমিক ৮, মৌলিক অধিকারে ১ দশমিক ৫, বিধি-প্রয়োগে ০ দশমিক ৯, ফৌজদারি বিচারে ০ দশমিক ৭ এবং দুর্নীতির অনুপস্থিতিতে ০ দশমিক ২ শতাংশ। এ সময়ে উন্নতি হয়েছে কেবল সরকারের ক্ষমতার সীমায় (২ দশমিক ৩ শতাংশ) এবং শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তায় (০ দশমিক ৬ শতাংশ)।
আঞ্চলিক তুলনায়ও বাংলাদেশ পেছনে। দক্ষিণ এশিয়ায় শীর্ষে নেপাল, বৈশ্বিক অবস্থান ৭১তম, স্কোর ০ দশমিক ৫২। শ্রীলঙ্কা ৭৪তম (০ দশমিক ৫১), ভারত ৮৮তম (০ দশমিক ৪৮)। বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে থাকা এই তিন দেশের পরই বাংলাদেশ; পাকিস্তান ১৩১তম (০ দশমিক ৩৬) এবং আফগানিস্তান ১৪২তম (০ দশমিক ৩১)। বৈশ্বিক তালিকার শীর্ষে ডেনমার্ক, এরপর নরওয়ে, ফিনল্যান্ড, সুইডেন ও লুক্সেমবার্গ। সবচেয়ে নিচে ভেনেজুয়েলা; তার আগে আফগানিস্তান, হাইতি, কম্বোডিয়া ও নিকারাগুয়া।
অবনতির কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মানবাধিকারকর্মী ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির প্রভাব এখানে আছে। তাঁর ভাষায়, অন্তর্বর্তী সরকার আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে রাখতে ব্যর্থ হয়েছিল; নির্বাচিত সরকারের কাছ থেকে প্রত্যাশা ছিল পরিস্থিতি ঘুরিয়ে দেবে। কিন্তু নির্বাচিত সরকার একসঙ্গে সবকিছু নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করছে, আর তার চাপেই অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা বিচারব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত; ফলে দুই ক্ষেত্রেই সামগ্রিক ফলাফল খারাপ হয়েছে।
ডব্লিউজেপি এবারের প্রতিবেদনে আইনের শাসন ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সম্পর্কও তুলে ধরেছে। তাদের হিসাবে, যেসব দেশের মাথাপিছু জিডিপি বিশ্ব গড় ১৪ হাজার ৪০৬ ডলারের বেশি, তাদের সূচক স্কোর কমপক্ষে ০ দশমিক ৬৮; আর যেসব দেশে মূল্যস্ফীতি বিশ্বের মধ্যক ৩ দশমিক ২৩ শতাংশের নিচে, তাদের স্কোর কমপক্ষে ০ দশমিক ৬০। সংস্থাটি বলছে, এটি দুইয়ের মধ্যে সম্পর্ক দেখায়; আইনের শাসন, মূল্য স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক কর্মক্ষমতা একে অন্যকে প্রভাবিত করে।
সরকারের পক্ষ থেকে এ প্রতিবেদনের বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান নিয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, আইন মন্ত্রণালয় বা সুপ্রিম কোর্ট কোনো বিবৃতি দিয়েছে কি না, বুধবার রাত পর্যন্ত তা জানা যায়নি। ফলে সরকার এই ফলাফলকে কীভাবে দেখছে এবং নির্দিষ্ট কোনো সংস্কারের ঘোষণা দেয় কি না, তা এখনো অনিশ্চিত।
একটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার: এই সূচক মামলা বা রায়ের সংখ্যা দিয়ে তৈরি হয় না। এটি মানুষের অভিজ্ঞতা ও বিশেষজ্ঞদের ধারণার ওপর ভিত্তি করে তৈরি একটি উপলব্ধিভিত্তিক চিত্র। তাই এটি দেশের বিচারব্যবস্থার সব দিক ধরতে পারে না। আবার পাঁচ বছর ধরে ধারাবাহিক অবনতি এবং মৌলিক অধিকার ও দেওয়ানি বিচারে ধারাবাহিক দুর্বলতা এড়িয়ে যাওয়ার বিষয়ও নয়।
সামনে কী: ডব্লিউজেপি সাধারণত প্রতি বছর নতুন সূচক প্রকাশ করে; পরের সংস্করণে বাংলাদেশের অবস্থান বদলায় কি না, তা নির্ভর করবে আগামী এক বছরে বিচারব্যবস্থা, আইন প্রয়োগ ও মৌলিক অধিকারের ক্ষেত্রে বাস্তব পদক্ষেপের ওপর। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি মানবাধিকার সংস্থা ও নাগরিক সমাজের চাপ কতটা কাজে লাগে, সেটিও দেখার বিষয়। আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—সূচকে দুই ধাপের উন্নতি বাস্তব পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়, নাকি এটি কেবল পরিসংখ্যানের সামান্য ওঠানামা, তার উত্তর মিলবে পরের বছরেই।



