রাজধানীর ভাটারা থানা এলাকার পুলিশ হাউজিং-১ আবাসিক এলাকায় একটি তিনতলা বাড়িতে গভীর রাতে অভিযান চালিয়ে ৮৫ জনকে আটক করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের উত্তরা বিভাগ। বাড়িটির মালিক পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত ডিআইজি আবদুল্লাহ আল জহির। সোমবার দিবাগত রাত আড়াইটার দিকে শুরু হওয়া অভিযান চলে ভোর সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত। আটকদের মধ্যে ২৬ জন নারী।

পুলিশের হিসাবে ওই বাড়িতে দীর্ঘদিন ধরে ডিজে পার্টির নামে মাদক সেবন চলছিল। অভিযানের পর মঙ্গলবার বিকেলে আবদুল্লাহ আল জহিরকে মেইনটেন্যান্স অ্যান্ড রিপেয়ার শাখার দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করে পুলিশ সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়। পুলিশ সদর দপ্তরের আদেশে বলা হয়েছে, তাঁকে ওই শাখা থেকে সরিয়ে সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছে। কার্যত তিনি ওএসডি (অন্য দপ্তরে সংযুক্ত) অবস্থায় আছেন।

বাড়িটি পুলিশ হাউজিং-১ আবাসিক এলাকায় হলেও এটি সরকারি কোয়ার্টার নয়; নিজের জমিতে নির্মিত বাড়ি। যুগান্তরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ছয় কক্ষের বাড়ির পাঁচটি কক্ষ অনলাইনে এয়ারবিএনবি ও ট্রাভেলার মাধ্যমে ভাড়া দেওয়া হতো। দিনে পুরো বাড়ি ভাড়া ছিল ১৮ হাজার ৫০০ টাকা; পার্টিতে অংশ নেওয়া প্রত্যেককে দিতে হতো ৬০০ টাকা। ডিবির হিসাবে সেখানে মাসে ২০ থেকে ২২টি পার্টি হতো।

ডিবির উপকমিশনার ইলিয়াস কবীর প্রথম আলোকে বলেন, বাড়িটি ভাড়া দেওয়া হতো এবং সেখানে নিয়মিত পার্টি চলত। তিনি জানান, ২০২৫ সাল থেকে ওই বাড়িতে এ ধরনের আয়োজন চলছিল। আয়ের ৭০ শতাংশ পেতেন আবদুল্লাহ আল জহির, ৩০ শতাংশ পেতেন তাঁর নিয়োগ করা একজন কো-হোস্ট—যুগান্তর এমন তথ্যও প্রকাশ করেছে।

তবে অভিযানের ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ডিবি কর্মকর্তারা প্রথমে বলেছিলেন, বাড়িটি থেকে বিপুল পরিমাণ মদ, গাঁজা ও ইয়াবা জব্দ হয়েছে। কিন্তু প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিন ঘণ্টার অভিযানে জব্দ তালিকায় ছিল একটি ইয়াবা বড়ি, অল্প পরিমাণ কুশ, মদ সেবনের সরঞ্জাম এবং চারটি বোতল—যার একটি খালি, দুটিতে আংশিক মদ (একটিতে প্রায় ৫০০ মিলি, অন্যটিতে প্রায় ২০০ মিলি)।

ডিবির কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেছেন, এত মানুষ আটকের পর এত সামান্য মাদক উদ্ধার বিস্ময়কর। অভিযানের নেতৃত্ব দেওয়া ইলিয়াস কবীর অবশ্য বলেছেন, আটক ব্যক্তিরা অভিযানের আগেই মদ ও ইয়াবা সেবন করে ফেলেছিলেন; তাই অবশিষ্ট মাদকই পাওয়া গেছে। তাঁর দাবি, বাড়িতে পার্টি চলার বিষয়ে আগে তাঁদের তথ্য ছিল না, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে অভিযান চালানো হয়।

আটক ব্যক্তিদের সংক্ষিপ্ত বিচারে সাজা দেওয়া হয়েছে। প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, নারীদের প্রত্যেককে ১৫ দিনের কারাদণ্ড ও ৫০০ টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও তিন দিন কারাভোগের সাজা দেওয়া হয়েছে; পুরুষদের প্রত্যেককে এক মাসের কারাদণ্ড ও এক হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

আটকের সংখ্যা নিয়েও সূত্রভেদে পার্থক্য আছে। প্রথম আলো ৮৫ জনের কথা লিখেছে; যুগান্তর লিখেছে ৮৪ জনকে আটক করা হয়েছে, যাঁদের মধ্যে ২৬ জন নারী ও ৫৮ জন পুরুষ। ডিবি জানিয়েছে, আটকদের মধ্যে আফগানিস্তানের এক নাগরিকও রয়েছেন।

অভিযোগের বিষয়ে যুগান্তরকে আবদুল্লাহ আল জহির বলেন, তিনি অনলাইনে বাড়ি ভাড়া দেন এবং সেখানে কিছু কঠোর নিয়ম আছে। তাঁর ভাষায়, ‘সেখানে কোনো অবৈধ কাজ হয়ে থাকলে তার দায় এড়ানোর সুযোগ আমার নেই; তবে অসৎ উদ্দেশ্যে আমি বাড়ি ভাড়া দিতাম না।’ তিনি বলেন, এবার জন্মদিনের পার্টির কথা বলে বাড়িটি ভাড়া নেওয়া হয়েছিল; তারা মদ আনবে বা এ ধরনের কাজ করবে—তা তিনি জানতেন না।

এখনো যা অজানা

মাদক কারবারে আবদুল্লাহ আল জহিরের সরাসরি সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হয়েছে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তাঁর বিরুদ্ধে কোনো মামলা হয়েছে কি না, পুলিশ সদর দপ্তর আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি। ভাটারায় জমি কেনার অর্থের উৎস নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে; বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা খোঁজ শুরু করেছে বলে যুগান্তর জানিয়েছে। কোন আদালতে মামলাটি হয়েছে এবং আটকদের বিরুদ্ধে ঠিক কী অভিযোগ আনা হয়েছে, সে বিষয়েও বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

পরবর্তী ধাপ

আটকদের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া চলছে; ডিবি বলছে, অভিযানের বিষয়ে উচ্চপর্যায়ের নির্দেশনা ছিল। পুলিশ সদর দপ্তর আবদুল্লাহ আল জহিরের বিষয়ে প্রশাসনিক তদন্ত করবে কি না এবং তাঁর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা হবে কি না, তা পরবর্তী দিনে স্পষ্ট হবে। এই ঘটনা পুলিশের ভেতরে শৃঙ্খলা ও জবাবদিহি নিয়ে যে প্রশ্ন তুলেছে, তা এখন আলোচনার কেন্দ্রে।