মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকো রাজ্যের একটি আদালত বুধবার (২১ অক্টোবর) মেটা প্ল্যাটফর্মসকে ২৫ বিলিয়ন ডলার জরিমানা দেওয়ার আদেশ দিয়েছে। রাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেল রাউল তোরেসের দপ্তরের বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফেসবুক ব্যবহারকারীদের তথ্যের নিরাপত্তা এবং কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কোম্পানি যে বিভ্রান্তিকর বক্তব্য দিয়েছিল, জুরি সেই অভিযোগে মেটাকে দায়ী পেয়েছে। তোরেস এই অঙ্ককে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে কোনো কোম্পানির বিরুদ্ধে রাজ্যের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক জরিমানাগুলোর একটি বলে বর্ণনা করেছেন।

আদেশ দিয়েছেন নিউ মেক্সিকোর রাজ্য আদালতের বিচারক ফ্রান্সিস ম্যাথিউ। মামলাটি রাজ্য সরকার ২০২১ সালে দায়ের করেছিল। অভিযোগ ছিল, ২০১৬ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে ব্রিটিশ রাজনৈতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান কেমব্রিজ অ্যানালিটিকা একটি থার্ড-পার্টি অ্যাপের মাধ্যমে প্রায় ৮ কোটি ৭০ লাখ ফেসবুক প্রোফাইলের তথ্য সংগ্রহ করে। রাজ্যের অভিযোগ, বাইরের প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে ব্যবহারকারীর তথ্যের প্রশস্ত প্রবেশাধিকার আছে জেনেও কোম্পানি তা ঠেকায়নি এবং মুনাফার স্বার্থে ঘৃণামূলক ও ক্ষতিকর কনটেন্ট সহ্য করেছে।

গত ২৫ সেপ্টেম্বর জুরি রায় দেয়, কোম্পানি ও তার শীর্ষ কর্মকর্তাদের ২৯টি বক্তব্যের ২৬টিই বিভ্রান্তিকর ছিল। জুরির হিসাবে মেটা রাজ্যের ভোক্তা সুরক্ষা আইন ভেঙেছে ৪ কোটি ৩০ লাখেরও বেশি বার। এই সংখ্যা নির্ধারিত হয়েছে কতজন ব্যবহারকারী বা নিউ মেক্সিকোর বাসিন্দা কোন বক্তব্যের শ্রোতা ছিলেন, তার ভিত্তিতে। রাজ্যের আইনে প্রতিটি লঙ্ঘনে সর্বোচ্চ ৫ হাজার ডলার জরিমানা এবং আদায় করা পুরো টাকা রাজ্যের স্কুলব্যবস্থায় যাওয়ার বিধান রয়েছে।

মামলায় নিউ মেক্সিকো একা এগিয়েছিল। কেমব্রিজ অ্যানালিটিকা কাণ্ডে অন্য ৪৮টি অঙ্গরাজ্য গত আগস্টে মেটার সঙ্গে ১৮ বিলিয়ন ডলারের নিষ্পত্তি চুক্তি করে। ফ্লোরিডা ও নিউ মেক্সিকো সেই চুক্তিতে যোগ দেয়নি। নিউ মেক্সিকো আদালতে গিয়ে প্রমাণ করতে চেয়েছে, কোম্পানির বিভ্রান্তিকর বক্তব্য রাজ্যের সব বাসিন্দাকে প্রভাবিত করেছে, কেবল ফেসবুক ব্যবহারকারীদের নয়।

শুনানিতে রাজ্যের পক্ষ ৩৫ থেকে ৪০ বিলিয়ন ডলার জরিমানা চেয়েছিল। মেটার আইনজীবীরা বলেছিলেন, ৩ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি জরিমানা মার্কিন সংবিধানের ডিউ প্রসেস ধারা লঙ্ঘন করবে এবং আপিলে টিকবে না। কোম্পানির যুক্তি ছিল, বিভ্রান্তিকর বক্তব্য শুনে কোনো নিউ মেক্সিকান বাস্তবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন—এমন প্রমাণ রাজ্য দিতে পারেনি।

রায়ের পর সংবাদ সম্মেলনে তোরেস বলেন, এই রায় সিলিকন ভ্যালির জন্য একটি স্পষ্ট বার্তা। তাঁর ভাষায়, দীর্ঘদিন ধরে বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো এমনভাবে চলেছে যেন তাদের আকার ও প্রভাব তাদের আইনের নাগালের বাইরে রাখে। রাজ্যের সংবিধান অনুযায়ী ভোক্তা সুরক্ষা আইনে আদায় করা জরিমানা শিক্ষা খাতে ব্যয় করতে হয়। তোরেস বলেন, এই অর্থ দিয়ে সম্ভবত আগামী ১০০ বছরের স্কুল নির্মাণের খরচ হয়ে যাবে। তবে মেটা আপিল করলে টাকা আটকে থাকবে বলেও তিনি স্বীকার করেন।

মেটার পক্ষ থেকে জরিমানার অঙ্ক নিয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। কোম্পানি আগেই জানিয়েছিল, সেপ্টেম্বরের জুরি রায়ের বিরুদ্ধে তারা আপিল করবে। কোম্পানির আইনজীবীদের যুক্তি, রাজ্য ভুলভাবে ধরেছে কতজন মানুষ কোন বক্তব্য দেখেছেন বা শুনেছেন; এই গণনার আইনি ভিত্তি নেই এবং এতে জরিমানার অঙ্ক অনেক বেড়ে গেছে। জরিমানার ঘোষণার পরও মেটার শেয়ারদর প্রায় ২ শতাংশ বাড়তি ছিল; ওই দিনই কোম্পানির ত্রৈমাসিক আয়ের ফলাফল প্রকাশের কথা ছিল।

এখনো যা অজানা

আপিলে চূড়ান্ত জরিমানা কত থাকবে, তা নিশ্চিত নয়। মেটা লঙ্ঘনের সংখ্যা কমাতে পারলে অঙ্কও কমতে পারে। আপিল চলাকালে জরিমানার ওপর সুদ জমবে। আদালতে রাজ্য স্থায়ী নিষেধাজ্ঞারও আবেদন করেছে, যাতে ভবিষ্যতে একই ধরনের বিভ্রান্তিকর বক্তব্য বন্ধ হয়; সেই আবেদনের ফলাফল এখনো আসেনি। মেটার আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া এবং আপিল দায়েরের সময়সূচিও জানা যায়নি।

এই রায় মেটার জন্য এ বছরের দ্বিতীয় বড় আর্থিক ধাক্কা। আগস্টে ৪৮টি অঙ্গরাজ্যের সঙ্গে ১৮ বিলিয়ন ডলারের নিষ্পত্তি চুক্তি হয়েছিল ইনস্টাগ্রামের আসক্তি সৃষ্টিকারী নকশা এবং তরুণ ব্যবহারকারীদের মানসিক ক্ষতি নিয়ে। নিউ মেক্সিকোর মামলাটি আলাদা ভিত্তিতে করা হলেও দুটিতেই মূল প্রশ্ন এক: ব্যবহারকারীদের কাছে কোম্পানির দেওয়া তথ্য কতটা সত্য ছিল।

এই রায়ের সরাসরি আইনি প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে নেই; বাংলাদেশে এর থেকে কোনো জরিমানা বা ক্ষতিপূরণের বিধান তৈরি হয় না। তবে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম এই অঞ্চলের বহু মানুষের যোগাযোগ ও ব্যবসার মাধ্যম হওয়ায় ব্যবহারকারীর তথ্য নিয়ে কোম্পানির দায়বদ্ধতার প্রশ্নটি এখানেও প্রাসঙ্গিক।

পরবর্তী ধাপ আপিল। মেটা আদালতে নিজের যুক্তি তুলে ধরলে লঙ্ঘনের সংখ্যা ও চূড়ান্ত অঙ্ক দুটোই বদলাতে পারে। চূড়ান্ত রায় না হওয়া পর্যন্ত রাজ্যের শিক্ষা খাতে টাকা ছাড়া হবে না।