আগামী গ্রীষ্মের আগেই দেশে তিন থেকে চার হাজার মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব বলে আশা প্রকাশ করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। বুধবার দুপুরে যশোর জেলা বিএনপি কার্যালয়ে ছয় কিলোওয়াট ক্ষমতার একটি সৌর প্যানেল ব্যবস্থার উদ্বোধন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি এই আশার কথা বলেন। প্রতিমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, দেশের কোনো রাজনৈতিক কার্যালয়ে এ ধরনের সৌর ব্যবস্থা এই প্রথম চালু হলো।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ওই কার্যালয়ের নিজস্ব অর্থায়নে সৌর প্যানেলটি বসানো হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের নিজের চাহিদা মেটানোর পর উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। তাঁর হিসাবে তিন থেকে সাড়ে তিন বছরের মধ্যে স্থাপনার খরচ উঠে আসবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এই উদ্যোগ দেখে অন্য রাজনৈতিক দলগুলোও নিজেদের কার্যালয়ে সৌর প্যানেল বসাতে আগ্রহী হবে।
সৌরবিদ্যুৎ নিয়ে মানুষের আগ্রহ বাড়ায় সরকার নীতি সহায়তা দিচ্ছে এবং এ খাতে ছোট উদ্যোক্তা ও নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে বলেও জানান অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। তিনি বলেন, সেচ পাম্পগুলোও ধাপে ধাপে সৌরবিদ্যুতে চালানো হবে। এতে ডিজেল ও বিদ্যুতের ওপর চাপ কমবে এবং কৃষকের উৎপাদন ব্যয়ও কমবে।
তবে এই আশা প্রকাশের সময় দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত গভীর চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। গ্যাসের ঘাটতি, এলএনজি আমদানির উচ্চ খরচ ও পুরোনো বিদ্যুৎকেন্দ্রের সীমিত ব্যবহারের কারণে গত কয়েক মাসে দেশের বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং বেড়েছে। সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকেও বলা হয়েছে, প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট স্থাপিত সক্ষমতার মধ্যে প্রকৃতপক্ষে প্রায় ১৪ হাজার ১২৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে। এ অবস্থায় সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণকে সরকার জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা কমানোর একটি উপায় হিসেবে দেখছে।
সৌরবিদ্যুতের বর্তমান অবস্থান লক্ষ্য থেকে অনেক দূরে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (স্রেডা) জাতীয় ডেটাবেসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মাঝামাঝি পর্যন্ত দেশে সৌর সক্ষমতা ছিল এক হাজার ৫০০ মেগাওয়াটের কিছু বেশি। সরকারের লক্ষ্য, আগামী ফেব্রুয়ারির মধ্যে সৌর সক্ষমতা চার হাজার মেগাওয়াটে নেওয়া। অর্থাৎ লক্ষ্য পূরণ করতে হলে ছয় মাসেরও কম সময়ে প্রায় দুই হাজার ৫০০ মেগাওয়াট নতুন সৌর সক্ষমতা জাতীয় গ্রিডে যোগ করতে হবে।
এই লক্ষ্য কতটা বাস্তব, তা নিয়ে গত ১১ অক্টোবর সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির প্রথম বৈঠকে প্রশ্ন ওঠে। কমিটির সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ জানান, মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী আগের ৩০ দিনে গ্রিডে যোগ হয়েছে মাত্র ৬০ মেগাওয়াট। এই হার ধরে চললে ফেব্রুয়ারির চার হাজার মেগাওয়াটের লক্ষ্য অনেকটাই পূরণ হবে না। কমিটির অপর সদস্য নজিবুর রহমান বলেন, ছাদভিত্তিক সৌর কর্মসূচির অগ্রগতি নিয়ে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা নির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারেননি; তাঁরা দৈনিক প্রায় দুই মেগাওয়াট যোগ হওয়ার কথা বললেও তার সমর্থনে বিস্তারিত তথ্য দেননি।
কমিটি একই বৈঠকে ছাদভিত্তিক সৌর ব্যবস্থার মাসিক অগ্রগতি প্রতিবেদন, সৌর প্যানেল ও ইনভার্টার আমদানির এলসি খোলার তথ্য এবং প্রতিটি প্রকল্পের ব্যয়ের বিস্তারিত হিসাব চেয়েছে। হাসনাত আবদুল্লাহ জানান, ৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি ছাদভিত্তিক সৌর প্রকল্পের স্বাভাবিক ব্যয় প্রায় ১৫০ কোটি টাকা হলেও মন্ত্রণালয় ৩৫০ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ের প্রস্তাব করেছে। কমিটি বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তির ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ বাবদ এ পর্যন্ত প্রায় দুই লাখ ৮৯ হাজার কোটি টাকা পরিশোধের বিষয়ে ফরেনসিক নিরীক্ষারও দাবি জানিয়েছে।
সরকার ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণে আর্থিক প্রণোদনাও দিচ্ছে। কমিটির বৈঠকে জানানো হয়, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৭ সালের মধ্যে ছাদে সৌর ব্যবস্থা বসানো গ্রাহকরা ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০৩০ পর্যন্ত জাতীয় গ্রিডে দেওয়া উদ্বৃত্ত বিদ্যুতের প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ৫০ পয়সা পাবেন। নেট মিটারিংয়ের মাধ্যমে নিজের ব্যবহারের পর অতিরিক্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে দেওয়া যাবে।
তবে আজকের অনুষ্ঠানে কোন কোন সৌর প্রকল্প কবে চালু হবে, কত মেগাওয়াট কোন পর্যায়ে আছে বা ফেব্রুয়ারির মধ্যে ঠিক কত মেগাওয়াট যোগ হবে—এসব বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট তথ্য বা সময়সূচি দেওয়া হয়নি। প্রতিমন্ত্রী ‘তিন থেকে চার হাজার মেগাওয়াট’ বলেছেন, কিন্তু এর মধ্যে কতটা গ্রিডে যুক্ত হবে, কতটা ছাদভিত্তিক ও কতটা মাঠভিত্তিক হবে, তা স্পষ্ট নয়। সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন সূর্যের আলোর ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় সন্ধ্যা ও রাতে চাহিদা মেটাতে ব্যাটারি স্টোরেজ ও গ্রিড ব্যবস্থার সক্ষমতাও বাড়াতে হবে। জমি, সংযোগ ও অর্থায়নের জটিলতাও প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি নির্ধারণ করবে।
মন্ত্রণালয়কে আগামী বৈঠকে মাসিক অগ্রগতির হিসাব দিতে হবে। শীতকালে বিদ্যুতের চাহিদা কিছুটা কমলেও আগামী গ্রীষ্মেই বোঝা যাবে, সরকারের সৌর লক্ষ্য বাস্তবে কতটা রূপ নিয়েছে। লক্ষ্য পূরণ না হলে গ্যাস ও এলএনজি আমদানির ওপর চাপ কমবে না, বাড়তে পারে লোডশেডিংও। তাই প্রতিমন্ত্রীর আজকের আশা কেবল ঘোষণা হয়ে থাকবে কি না, তা নির্ভর করছে আগামী কয়েক মাসে গ্রিডে কত মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎ সত্যিই যুক্ত হচ্ছে তার ওপর।
সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণে সরকারের নীতি সহায়তার কথা বলা হলেও বাস্তবায়নের স্বচ্ছ তথ্য এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। কোন প্রকল্পে কত টাকা ব্যয় হচ্ছে, দরপত্র কীভাবে হচ্ছে এবং গ্রাহকরা সময়মতো গ্রিড সংযোগ পাচ্ছেন কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর দিলেই কেবল লক্ষ্যটি কতটা বাস্তব, তা যাচাই করা সম্ভব হবে।



