রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার মো. ইউসুফ আলীকে প্রত্যাহার করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে। মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) রাতে জারি হওয়া আদেশে তাঁকে ওএসডি (অফিসার অন স্পেশাল ডিউটি) করা হয়। আদেশে প্রত্যাহারের কারণ সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি; শুধু বলা হয়েছে, জনস্বার্থে আদেশটি তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হবে।

ঘটনার সূত্রপাত ওই দিন বিকেলে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান একদিনের সফরে রাজশাহী যান। বিকেলে শাহ মখদুম বিমানবন্দরে তাঁর বহনকারী ফ্লাইট অবতরণ করে। জনসভা শেষে সন্ধ্যা ৭টার দিকে তিনি রাজশাহী ছাড়েন। বিমানবন্দরে তাঁকে বিদায় জানাতে পুলিশ ও প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়েছিলেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ১৪ সেকেন্ডের একটি ভিডিওতে দেখা যায়, প্রধানমন্ত্রী সারিতে দাঁড়ানো কর্মকর্তাদের সঙ্গে হাত মেলাচ্ছেন। সেই সময় বিভাগীয় কমিশনার ইউসুফ আলী হাত মেলানোর পর সামান্য ঝুঁকে এগিয়ে যান এবং এক হাত প্রধানমন্ত্রীর পিঠের দিকে বাড়িয়ে দেন। আলিঙ্গন করার চেষ্টার মতো এই ভঙ্গি দেখে প্রধানমন্ত্রী পিছিয়ে যান এবং তাঁকে সারিতে থাকার নির্দেশ দেন।

ভিডিওটি রাতেই বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং রাষ্ট্রাচার ভাঙার অভিযোগ তুলে সমালোচনা শুরু হয়। তবে প্রশাসনিক আদেশে ভিডিওর ঘটনার সঙ্গে প্রত্যাহারের সরাসরি সম্পর্কের কথা লেখা হয়নি। আদেশে কেবল ‘জনস্বার্থে’ তাৎক্ষণিক কার্যকর হওয়ার কথা বলা হয়েছে।

বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের সূত্র জানিয়েছে, আদেশ পাওয়ার পর ইউসুফ আলী ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত বৈঠক করেন। রাত ১১টার দিকে তিনি অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (রাজস্ব) মো. রেজাউল আলম সরকারের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করেন এবং রাজশাহী ছাড়েন। রাত সাড়ে ১১টার দিকে তাঁর গাড়িটি শহরের তালাইমারী এলাকা অতিক্রম করে। বুধবার সকাল নাগাদ তিনি ঢাকায় পৌঁছেছেন।

রেজাউল আলম সরকার এখন ভারপ্রাপ্ত বিভাগীয় কমিশনারের দায়িত্ব পালন করছেন। নতুন স্থায়ী কমিশনার নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত তিনি রাজশাহী বিভাগের প্রশাসনিক কাজ সমন্বয় করবেন।

প্রশাসনে ওএসডি পদটি সাধারণত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে দেখা হয়। এই পদে থাকা কর্মকর্তার নির্দিষ্ট কোনো দপ্তর বা কাজ থাকে না; সরকারের নীতি প্রণয়ন বা বাস্তবায়নের দায়িত্বেও তাঁকে রাখা হয় না। সরকার চাইলে পরে তাঁকে অন্য কোনো পদে বদলি করতে পারে।

প্রত্যাহারের কারণ জানতে চাইলে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী প্রথম আলোকে বলেন, প্রশাসনিক কারণেই ইউসুফ আলীকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। ‘এটা সব সময়ই হয়’ বলে তিনি উল্লেখ করেন। তবে কোন নির্দিষ্ট প্রশাসনিক কারণ, তা তিনি বিস্তারিত বলেননি।

ইউসুফ আলীকে তাঁর সরকারি মোবাইল ফোনে বারবার ফোন করা হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম জানিয়েছে, অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (সাধারণ) মো. হাবিবুর রহমান ফোন ধরলেও পরে জানাবেন বলে ফোন কেটে দেন।

ইউসুফ আলী রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার হিসেবে যোগ দেন গত ১৯ আগস্ট। এর আগে তিনি বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের সদস্য-পরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) ছিলেন। তাঁর নিয়োগের আগের রাতে নাটোরের জেলা প্রশাসক আসমা শাহীন ও তৎকালীন রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার এ এন এম বজলুর রশীদকে প্রত্যাহার করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছিল।

নাটোরে ফ্যামিলি কার্ডের তথ্যসংগ্রাহক ও সুপারভাইজার নিয়োগের ফলাফল ঘিরে বিএনপি নেতা-কর্মীদের বিক্ষোভ ও ভাঙচুরের ঘটনায় ১৮ আগস্ট একটি মামলা হয়। পরদিন ওই দুই কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার করা হয় এবং ইউসুফ আলীকে রাজশাহীর দায়িত্ব দেওয়া হয়। প্রায় দুই মাস পর তাঁকেও একইভাবে প্রত্যাহার করা হলো।

রাজশাহী বিভাগের আট জেলার প্রশাসনিক সমন্বয়, সরকারি নীতি বাস্তবায়ন ও উন্নয়ন প্রকল্পের তদারকি বিভাগীয় কমিশনারের দায়িত্ব। ফলে এই পদে হঠাৎ পরিবর্তন শুধু রাজশাহী শহর নয়, পুরো বিভাগের প্রশাসনিক কাজে প্রভাব ফেলতে পারে। জেলা প্রশাসকদের সঙ্গে সমন্বয়ের কাজেও ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে দায়িত্ব সামলাতে হবে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘটনাটি নিয়ে আলোচনা চলছে। ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টির রাজশাহী মহানগর শাখার আহ্বায়ক মোবাশ্বের আলী বুধবার সকালে ফেসবুকে লেখেন যে রাষ্ট্রাচার ভেঙে প্রধানমন্ত্রীকে জড়িয়ে ধরার চেষ্টার পর বিভাগীয় কমিশনারকে ওএসডি করা হয়েছে। তাঁর এই বক্তব্য বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম সংবাদে উল্লেখ করেছে।

এখনো যা অজানা: আদেশে প্রত্যাহারের কারণ লেখা হয়নি এবং ভিডিওর ঘটনার সঙ্গে এর আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক নেই। ইউসুফ আলী নিজে কোনো ব্যাখ্যা দেননি। তাঁর বিরুদ্ধে কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত বা বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, তা-ও জানা যায়নি। ভিডিওটি কে ধারণ করেছেন এবং ঘটনার ঠিক আগে-পরে কী ঘটেছে, সে বিষয়েও স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

সামনের ধাপে ইউসুফ আলীকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে রিপোর্ট করতে হবে। সেখানে তাঁকে কোন পদে রাখা হবে, তা সরকারের সিদ্ধান্ত। রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার পদে স্থায়ী নিয়োগ দেওয়া হবে কি না এবং ভিডিওর ঘটনা নিয়ে প্রশাসনিক তদন্ত হবে কি না, সে বিষয়ে এখনো কোনো ঘোষণা নেই।