দেশে প্রতিদিন গড়ে ৬৬ জন মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান এবং ১০৪ জন স্থায়ীভাবে পঙ্গু বা প্রতিবন্ধী হয়ে পড়েন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির (এনসিডিসি) তত্ত্বাবধানে সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ, বাংলাদেশ (সিআইপিআরবি) পরিচালিত ‘জাতীয় স্বাস্থ্য ও আঘাত’ জরিপে এই হিসাব উঠে এসেছে। প্রথম আলোর প্রতিবেদনে জরিপের এসব ফলাফল তুলে ধরা হয়েছে। জরিপটি বলছে, দেশে সব ধরনের আঘাতজনিত মৃত্যুর প্রধান কারণ সড়ক দুর্ঘটনা। আজ ২২ অক্টোবর জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস; এ বছরের প্রতিপাদ্য ‘নিরাপদ সড়ক, সমৃদ্ধ দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ।’ দুর্গাপূজার ছুটির কারণে দিবসের মূল আনুষ্ঠানিকতা হচ্ছে না, তা ২৮ অক্টোবর পালিত হবে।

জরিপের তথ্য সংগ্রহ শুরু হয় ২০২৩ সালের মে মাসে, চলে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি পর্যন্ত। সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় ওই বছরের ফেব্রুয়ারিতেই। দেশের ৬৪টি জেলার ৪ লাখ ৪২ হাজার ৯৯৮ জনের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে এতে।

জরিপের হিসাবে, সড়ক দুর্ঘটনায় বছরে প্রাণ হারান ২৪ হাজার ২৩৩ জন, প্রতি লাখ মানুষের মধ্যে মৃত্যুর হার ১৪ দশমিক ৬৭। নিহতদের ৮৪ দশমিক ৬ শতাংশ পুরুষ, ১৫ দশমিক ৪ শতাংশ নারী। শহরাঞ্চলে প্রতি লাখে মৃত্যুর হার ১৬ দশমিক ৫৬, গ্রামে ১৩ দশমিক ৮১। প্রাণঘাতী নয় এমন আঘাতের শিকার হন বছরে ১ কোটি ৬৫ লাখ ৭৪ হাজার মানুষ; এর ১৮ দশমিক ৩ শতাংশ, অর্থাৎ ৩০ লাখ ৩১ হাজার ২৮ জন, সড়ক দুর্ঘটনার শিকার। প্রতি লাখে আহতের হার ১ হাজার ৮৩৫। এসব দুর্ঘটনায় বছরে ৩৮ হাজার ২৮ জন স্থায়ী পঙ্গুত্ব বা প্রতিবন্ধকতার শিকার হন, যা দেশে সব ধরনের আঘাতজনিত স্থায়ী প্রতিবন্ধকতার ২৭ দশমিক ৪ শতাংশ।

এই সংখ্যার পেছনে রয়েছে হাজারো পরিবারের ভাঙন। চট্টগ্রামের বোয়ালখালীর জাহিদুল আলম ওমানে কাজ করতেন। ২০২৪ সালের আগস্টে ছুটিতে দেশে ফেরার পর ৪ সেপ্টেম্বর মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় তাঁর হাত ও পা ভেঙে যায়, চোয়াল ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তিনটি দাঁত ভাঙে এবং মাথায় গুরুতর আঘাত লাগে। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ও পরে এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসায় জীবন বাঁচলেও পঙ্গুত্ব এড়ানো যায়নি। ২৮ বছরের জাহিদুল এখন বেঙ্গালুরুতে চিকিৎসাধীন। তাঁর পায়ে আটবার অস্ত্রোপচার হয়েছে। চিকিৎসায় খরচ হয়েছে ৬৫ লাখ টাকা, করতে হয়েছে ঋণ। তিনি বলছিলেন, জীবনের সঞ্চয় শেষ, বিদেশে ফেরা আর হচ্ছে না।

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের মো. সজীব ২০২১ সালে ঢাকা–মাওয়া মহাসড়কে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় পড়েন। বাঁ পা ভেঙে যায়, শরীরের বিভিন্ন অংশে আঘাত পান। ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালে ৩৩ দিন চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচারের পরও হাঁটাচলা স্বাভাবিক হয়নি। দুর্ঘটনার আগে কারখানায় কাজ করা সজীব প্রায় তিন বছর কাজ করতে পারেননি; এখন একটি চায়ের দোকান চালিয়ে কোনোমতে সংসার চালান। ২০২১ সালে রাজশাহীতে বাসের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষে মাইক্রোবাসে আগুন লেগে ১৭ জন নিহত হওয়ার ঘটনায় পরিবারের একমাত্র বেঁচে যাওয়া পাভেল মিয়াও দীর্ঘদিন আইসিইউতে ছিলেন; দুটি দাঁত ও ডান হাতের বুড়ো আঙুল হারিয়েছেন, পড়াশোনা আর হয়নি।

কেন এত দুর্ঘটনা—এই প্রশ্নের উত্তর জরিপ ও বিভিন্ন গবেষণায় একই রকম। বেপরোয়া ও অতিরিক্ত গতি, অসতর্কতা, বিপজ্জনক ওভারটেকিং, ট্রাফিক আইন না মানা, অদক্ষ চালক, ক্লান্তি ও ঘুমঘুম অবস্থায় গাড়ি চালানো এবং চলার সময় মুঠোফোন ব্যবহার প্রধান কারণ। ফিটনেসবিহীন ও ত্রুটিপূর্ণ যান, ব্রেকের সমস্যা, অতিরিক্ত যাত্রী ও পণ্য, মহাসড়কে ধীরগতির যানের অবাধ চলাচল, ঝুঁকিপূর্ণ মোটরসাইকেল ব্যবহার এবং পথচারীদের অসতর্কতাও ঝুঁকি বাড়ায়। সড়কের নকশার ত্রুটি, বিপজ্জনক বাঁক, অপর্যাপ্ত বাতি ও সাইন, বিভাজক ও নিরাপদ পারাপারের অভাব, হেলমেট-সিটবেল্টের ব্যবহার না থাকা এবং দুর্ঘটনার পর দ্রুত মানসম্মত চিকিৎসার ঘাটতিও মৃত্যু বাড়ায়।

সরকারের পক্ষ থেকে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেছেন, ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলতে দেওয়া হবে না এবং গতি নিয়ন্ত্রণে কাজ চলছে। তাঁর আশা, ২০৩০ সালের মধ্যে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি অর্ধেকে নামানো যাবে এবং ২০২৭ সালের মধ্যে প্রয়োজনীয় আইন-বিধি করা হবে। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের সড়ক নিরাপত্তা প্রকল্প ২০২৩ সালের ১৮ এপ্রিল অনুমোদিত হয়; এর ব্যয় ৪ হাজার ৯৮৮ কোটি টাকা এবং বাস্তবায়নকাল ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত।

তবে বিশেষজ্ঞদের অভিযোগ, সুনির্দিষ্ট ও বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা ছাড়া প্রতিশ্রুতি কাজে লাগবে না। বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ সামছুল হক বলছেন, যানবাহনের ফিটনেস, রুট পারমিট ও লাইসেন্স দেওয়ার প্রক্রিয়া ঠিক করতে হবে এবং মাঠ পর্যায়ে তদারকি বাড়াতে হবে। সিআইপিআরবির উপনির্বাহী পরিচালক সেলিম মাহমুদ চৌধুরীর মতে, সড়কে পঙ্গু ও নিহতদের বড় অংশ তরুণ ও নিম্ন আয়ের উপার্জনক্ষম মানুষ; ফলে দুর্ঘটনার ধাক্কা পরিবার ও রাষ্ট্র দুটোরই ওপর পড়ে। তিনি আইন প্রণয়ন, কঠোর প্রয়োগ ও সচেতনতার ওপর জোর দেন।

প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগও প্রশ্নের মুখে। সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে দেশের শীর্ষ ফোরাম জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিলের বৈঠক ছয় মাসে অন্তত একবার হওয়ার কথা থাকলেও অন্তর্বর্তী সরকারের প্রায় দেড় বছরে হয়েছে একবার। বর্তমান সরকারের আমলে কাউন্সিলের কোনো বৈঠক হয়নি। বিআরটিএ ও সওজের সড়ক নিরাপত্তা সেলের কাজও কিছু লিফলেট বিতরণ ও দিবসভিত্তিক আয়োজনে সীমিত বলে সমালোচনা আছে।

বাংলা ট্রিবিউনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্বতন্ত্র সংগঠনগুলোর হিসাবেও চিত্র উদ্বেগজনক। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সাড়ে ছয় বছরে দেশে ১৬ হাজার ৪০২টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৬ হাজার ২৭ জন নিহত ও ১৪ হাজার ৫৪৭ জন আহত হয়েছেন। সংগঠনটির হিসাবে নিবন্ধিত মোটরযানের ৭১ শতাংশই মোটরসাইকেল এবং দুর্ঘটনায় আক্রান্তদের ৫৮ শতাংশের বয়স ১৩ থেকে ৩৫ বছর। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাবে ২০১৪ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ৬৯ হাজার ৪৪৮টি দুর্ঘটনায় ৯৫ হাজার ৭৬১ জন নিহত হয়েছেন। দুটি সংগঠনের হিসাবে বছরে নিহতের সংখ্যায় বড় ফারাক থাকলেও প্রাণহানির ব্যাপকতা একইভাবে স্পষ্ট হয়।

জরিপের তথ্য ২০২৩–২৪ সালের, তাই বর্তমান পরিস্থিতি কতটা বদলেছে তা এই হিসাবেই ধরা পড়ে না। ২৮ অক্টোবরের আনুষ্ঠানিকতায় নতুন কোনো পরিকল্পনা বা সিদ্ধান্ত আসে কি না, জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিল নিয়মিত বসে কি না এবং ২০২৭ সালের মধ্যে সমন্বিত সড়ক নিরাপত্তা আইন কার্যকর হয় কি না—এসবই এখন দেখার বিষয়।