প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আজ বৃহস্পতিবার সুন্দরবন ও বাগেরহাটের মোংলা বন্দর পরিদর্শনে যাচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে এটিই তাঁর প্রথম সফর। সফরে মোংলা বন্দরের নতুন জেটি, চীনের সহায়তায় গড়া অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং সুন্দরবনের ইকোট্যুরিজম এলাকা তিনি ঘুরে দেখবেন।

সফরসূচি অনুযায়ী, সকাল সাড়ে আটটায় নিজ বাসভবন থেকে তেজগাঁও বিমানবন্দরের উদ্দেশে রওনা দেবেন প্রধানমন্ত্রী। সকাল নয়টায় হেলিকপ্টারে সুন্দরবনের দিকে যাত্রা করে ১০টার দিকে হিরণ পয়েন্ট ও সংলগ্ন বনাঞ্চল আকাশপথে পরিদর্শন করবেন। সাড়ে ১০টার দিকে খুলনার দাকোপ উপজেলার নলিয়ান মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে অবতরণের কথা তাঁর। সেখান থেকে নৌপথে বানৌজা মোংলার জেটিতে পৌঁছে দুপুরে ওয়ার্ড রুমে আয়োজিত সভায় অংশ নেবেন।

বিকেলে মোংলা বন্দরের কাজকর্ম ও জেটি ঘুরে দেখবেন প্রধানমন্ত্রী। বিকেল তিনটা ১৫ মিনিটে তিনি প্রস্তাবিত বেজা অর্থনৈতিক অঞ্চল পরিদর্শন করবেন। বিকেল চারটায় মোংলার হেলিপ্যাড থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হয়ে সন্ধ্যা পাঁচটায় রাজধানীতে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।

দেশের দ্বিতীয় সমুদ্রবন্দর মোংলা দীর্ঘদিন ধরে নাব্যতা ও অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতায় ভুগছে। ২০২২ সালে পদ্মা সেতু চালুর পর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ব্যবসায়ীরা বন্দরটির ওপর নতুন করে ভরসা রাখতে শুরু করেন। এই অবস্থায় বন্দরের সুবিধা বাড়াতে গত ১০ অক্টোবর বাংলাদেশ সরকার ও চীনের এক্সিম ব্যাংকের মধ্যে ৩৩৫ দশমিক ৭৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের ঋণচুক্তি হয়েছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চীন ২ দশমিক ৪০৪ বিলিয়ন আরএমবি ঋণ দেবে।

এই প্রকল্পে আধুনিক যন্ত্রপাতিসহ দুটি কন্টেইনার টার্মিনাল, কন্টেইনার ইয়ার্ড, কন্টেইনার ডেলিভারি ইয়ার্ড ও কার্গো হ্যান্ডলিং ইয়ার্ড নির্মাণের পরিকল্পনা আছে। বন্দরের প্রয়োজনীয় আধুনিকায়নও হবে। সফরে এই নতুন জেটি এলাকা পরিদর্শনকে গুরুত্বপূর্ণ বলে দেখছেন বন্দরসংশ্লিষ্টরা।

সরকারের আরেকটি পরিকল্পনা হলো সুন্দরবনের আকরাম পয়েন্টে ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বা এফএসআরইউ নির্মাণ। পাইপলাইনের মাধ্যমে ওই গ্যাস মোংলায় এনে অর্থনৈতিক অঞ্চলের কারখানায় ব্যবহারের কথা ভাবা হচ্ছে। গত আগস্ট মাসে নৌপরিবহন ও বিদ্যুৎ মন্ত্রী এবং প্রতিমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল স্থানটি পরিদর্শন করে। স্থানটি চূড়ান্ত হলে সম্ভাব্যতা যাচাইসহ পরবর্তী কাজ শুরু হবে।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ও বাগেরহাট-৩ আসনের সংসদ সদস্য শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, প্রধানমন্ত্রী বন্দরের সুবিধা ও পাশের অর্থনৈতিক অঞ্চল দেখবেন। চীনা বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা, মোংলা নদীর ওপর সেতু নির্মাণ এবং মোংলা-খুলনা সড়ক ছয় লেনে উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। ট্রানজিট সুবিধা কাজে লাগিয়ে মোংলাকে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বড় অর্থনৈতিক ও লজিস্টিক কেন্দ্রে পরিণত করার লক্ষ্যও আছে।

মোংলা বন্দর বার্থ ও শিপ অপারেটর অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক জুলফিকার আলী বলেন, প্রধানমন্ত্রী চীনের সঙ্গে চুক্তি হওয়া নতুন জেটি নির্মাণ এলাকা দেখবেন। তাঁর দাবি, বন্দর চ্যানেল ঠিকভাবে ড্রেজিং করা হলে নাব্যতা বাড়বে এবং বড় জাহাজ এ বন্দরে আসতে পারবে।

সুন্দরবনের পর্যটন ব্যবসায়ী ও লঞ্চ বডি মালিক সমিতির সভাপতি দিদারুল আলমের আশা, জীববৈচিত্র্য ও পর্যটনের সম্ভাবনাকে প্রধানমন্ত্রী গুরুত্ব দেবেন। তাঁর মতে, আধুনিক পর্যটন অবকাঠামো গড়ে উঠলে ইকো-ট্যুরিজমে নতুন সুযোগ তৈরি হবে।

মোংলা বনিক সমিতির সভাপতি হাবিবুর রহমান বলেন, পদ্মা সেতু চালুর পর মোংলা বন্দর নিয়ে অনেক প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রীর এই সফর খুলনা ও বাগেরহাটসহ গোটা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পায়নের ক্ষেত্রে মোড় ঘোরাতে পারে বলে তিনি মনে করেন। বন্দর ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠান জাহানারা অ্যান্ড সন্সের মালিক মাহবুবুর রহমান মানিকের ভাষ্য, দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত অবকাঠামো সমস্যাগুলোর দ্রুত সমাধান হলেই এই অঞ্চলের মানুষ উপকৃত হবেন।

মোংলা শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান ক্যাপ্টেন রফিকুল ইসলাম বলেছেন, বন্দরের জেটিতে জাহাজ আসার সংখ্যা কমছে। বন্দর চ্যানেলের ড্রেজিংয়ের স্থায়ী সমাধান এবং রামপালে বিমানবন্দর নির্মাণের কাজ শুরুর দাবি জানিয়েছেন তিনি। আমদানি-রপ্তানি দ্রুত করতে অনিয়ম দূর করারও আহ্বান জানান তিনি।

মোংলা সিঅ্যান্ডএফ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোশাররফ হোসেন বলেন, মোংলা ইপিজেড ও আশপাশের শিল্প এলাকায় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা দরকার; এতে উৎপাদন খরচ কমবে। বন্দর চ্যানেলের ড্রেজিংয়ের টেকসই সমাধানের পাশাপাশি রেল ও সড়কপথ কাজে লাগিয়ে পণ্য দ্রুত ও কম খরচে ঢাকাসহ দেশের অন্যত্র পাঠানোর ব্যবস্থা চেয়েছেন তিনি।

বন্দরসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী মোহাম্মদ খোরশেদ আলমের মতে, সক্ষমতা থাকলেও আমদানি-রপ্তানিতে মোংলা এখনো চট্টগ্রাম বন্দরের অনেক পেছনে। বন্দরের কাজে হয়রানি দূর করে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির প্রতিশ্রুতি বাস্তবে রূপ দিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বিএসএস) জানিয়েছে, সফর ঘিরে বাগেরহাট ও দাকোপে বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা আনন্দ মিছিলের কর্মসূচি দিয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী চার স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েছে।

সফরে বন্দর সম্প্রসারণ, চ্যানেল ড্রেজিং বা এলএনজি টার্মিনাল নিয়ে কোনো নতুন সিদ্ধান্ত ঘোষণা হবে কি না, তা এখনো জানা যায়নি। সুন্দরবনের কাছে এলএনজি স্থাপনা নির্মাণের পরিবেশগত প্রভাব কী হবে, সে প্রশ্নও অমীমাংসিত। সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রীর ঢাকা ফেরার কথা রয়েছে; এরপর সফরের ফলাফল নিয়ে সরকারি বিবৃতি আসতে পারে।