মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলায় টমেটোর চারা এখন শুধু নিজের এলাকার চাহিদা মেটাচ্ছে না, যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন জেলায়। উপজেলার আদমপুর, জালালপুর, বনগাঁও, কান্দিগাঁও, মধ্যগাঁও ও নাজাতকোনা এলাকার নার্সারিতে এসব চারা তৈরি হয়। কুমিল্লা, ময়মনসিংহ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, সুনামগঞ্জ, পটুয়াখালী, হবিগঞ্জ ও কক্সবাজারসহ আট থেকে দশটি জেলায় চারা পাঠানো হচ্ছে বলে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে। আজ বৃহস্পতিবার প্রথম আলোয় প্রকাশিত প্রতিবেদন এবং গত ২ অক্টোবর যুগান্তরে প্রকাশিত প্রতিবেদনে একই চিত্র উঠে এসেছে।
চারাটি সাধারণ টমেটোর চারা নয়—গ্রাফটিং বা জোড় কলম পদ্ধতিতে তৈরি। প্রথমে আলাদা বীজতলায় তিত বেগুন (স্থানীয় ভাষায় বনবেগুন) ও টমেটোর চারা তোলা হয়। তিত বেগুনের চারা গ্রাফটিংয়ের উপযোগী হতে সময় লাগে প্রায় ৩৫ দিন, টমেটোর চারা তৈরি হয় প্রায় ২৫ দিনে। এরপর দুই বীজতলা থেকে সমান ও সবল চারা বেছে নিয়ে তিত বেগুনের গোড়ার অংশের সঙ্গে টমেটোর ওপরের অংশ কেটে জোড়া দেওয়া হয়। জোড়ার জায়গাটি পলিথিন দিয়ে বেঁধে রাখা হয়।
তিন থেকে ছয় দিনে দুটি অংশ জুড়ে যায়। এরপর চারাগুলোকে আরও ১০ থেকে ১২ দিন পরিচর্যার ঘরে রেখে শক্ত করা হয়; এরপরই সেগুলো বিক্রির উপযোগী হয়। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. রাকিবুল ইসলাম বলেন, এ পদ্ধতিতে তৈরি গাছ সাধারণ টমেটো গাছের চেয়ে শক্ত হয়, সহজে ঢলে পড়ে না এবং রোগবালাইয়ের আক্রমণও তুলনামূলক কম হয়।
তিনি জানান, সাধারণ টমেটো গাছ তিন মাস বাঁচে, গ্রাফটিং করা গাছ বাঁচে আট মাস পর্যন্ত। এই দীর্ঘ জীবনকাল ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার কারণেই অন্য জেলার কৃষকদের মধ্যে চারার চাহিদা বাড়ছে। কৃষকদের ভাষ্য, সাধারণ একটি গাছে যেখানে ৫ থেকে ১০ কেজি টমেটো হয়, গ্রাফটিং করা গাছে ২০ থেকে ২৫ কেজি পর্যন্ত ফলন মেলে। এই ফলনের হিসাব কৃষকদের দেওয়া; স্বতন্ত্র কোনো মাঠপর্যায়ের পরীক্ষায় তা যাচাই করা যায়নি।
কৃষি অফিসের হিসাবে কমলগঞ্জে প্রতি মৌসুমে ৬৫ থেকে ৭০ লাখ গ্রাফটিং টমেটোর চারা উৎপাদন হয়। প্রতিটি চারা ১২ থেকে ১৫ টাকায় বিক্রি হয়। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জানান, শুধু চারা উৎপাদন ও বিক্রি ঘিরে এক মৌসুমে ৫ থেকে ৬ কোটি টাকার লেনদেন হয়। প্রথম আলোর প্রতিবেদনে অবশ্য বছরে ৬৫ লাখ চারা এবং ৭ কোটি টাকার বেশি লেনদেনের কথা বলা হয়েছে।
সংখ্যায় কিছুটা পার্থক্য থাকলেও দুটি প্রতিবেদনেই একটি বিষয় মিলে যায়—কমলগঞ্জে চারা উৎপাদন এখন একটি আলাদা কৃষি অর্থনীতি তৈরি করেছে। প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী উপজেলায় গ্রাফটিং চারার নার্সারির সংখ্যা প্রায় ৩০০। চলতি মৌসুমে প্রায় ৬০ হেক্টর জমিতে গ্রীষ্মকালীন টমেটোর আবাদ হয়েছে।
চারা তৈরিতে শ্রমিকদের ব্যস্ততা বছরের বেশির ভাগ সময়ই থাকে। শ্রমিকেরা প্রতিটি চারা জোড়া দেওয়ার জন্য প্রায় এক টাকা মজুরি পান। দক্ষতার ওপর নির্ভর করে একজন শ্রমিক দিনে ৭০০ থেকে ১ হাজার ২০০টি পর্যন্ত চারা জোড়া লাগাতে পারেন। কমলগঞ্জের শ্রমিক সুমন মিয়ার সঙ্গে কথা বলে প্রথম আলো জানিয়েছে, অন্য কাজের তুলনায় এখানে মজুরি ভালো এবং পরিশ্রমও তুলনামূলক কম।
উপজেলার আরিফ হাইব্রিড টমেটো নার্সারি অ্যান্ড প্রোডাক্টসের মালিক এম এ করিমের অভিজ্ঞতা ভিন্ন। তিনি আগে সেনাবাহিনীতে চাকরি করতেন। অবসরের পর রংপুরে সেনাবাহিনীর একটি প্রকল্পে গিয়ে গ্রাফটিং টমেটোর চারা তৈরির কাজ শেখেন। পরে কমলগঞ্জে ফিরে এই কাজ শুরু করেন। তাঁর ভাষায়, শুরুতে এলাকায় কাজটি পরিচিত ছিল না; তাঁর দেখাদেখি এখন অনেক কৃষক এতে যুক্ত হয়েছেন।
এম এ করিমের নার্সারিতে সপ্তাহে প্রায় ৮০ হাজার চারা তৈরি ও বিক্রি হয়। সেখানে প্রায় ৬০ জন শ্রমিক দিন-রাত মিলিয়ে তিন শিফটে কাজ করেন। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে কৃষকেরা এসে চারা কিনে নিয়ে যান। অনেক কৃষক মৌসুম শুরুর আগেই কতটি চারা লাগবে তা জানিয়ে অর্ডার দেন; চাহিদা অনুযায়ী সময়মতো সরবরাহ করতে অনেক সময় হিমশিম খেতে হয়।
কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সন্দ্বীপ তালুকদার প্রথম আলোকে বলেন, উপজেলায় যোগদানের পর গ্রাফটিং টমেটোর চারা উৎপাদনের বিষয়টি তাঁর নজরে এসেছে এবং তিনি কয়েকটি জায়গা পরিদর্শন করেছেন। তিনি বলেন, এটি এলাকার সম্ভাবনাময় কৃষি খাত; কৃষকেরা যেন আরও ভালোভাবে চারা উৎপাদন করতে পারেন এবং অন্য জেলার কৃষকেরা সহজে চারা সংগ্রহ করতে পারেন, সে জন্য সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হবে।
কতজন কৃষক এই খাতে যুক্ত, তা নিয়ে হিসাবে পার্থক্য আছে। প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় হাজারো কৃষক এ কাজের সঙ্গে যুক্ত। যুগান্তরের প্রতিবেদনে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার বরাতে বলা হয়েছে, চলতি মৌসুমে গ্রীষ্মকালীন টমেটো চাষে যুক্ত কৃষকের সংখ্যা প্রায় ৪৮০। কোন হিসাবটি সব কৃষককে ধরে করা হয়েছে, তা প্রতিবেদনগুলোতে স্পষ্ট নয়।
এখনো যা জানা যায়নি: চারার মান নিয়ে সরকারি কোনো সার্টিফিকেশন বা নিবন্ধন ব্যবস্থা আছে কি না, তা প্রতিবেদনে বলা হয়নি। ফলনসংক্রান্ত দাবিগুলো কৃষক ও কৃষি কর্মকর্তাদের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে বলা হয়েছে, কোনো স্বাধীন মাঠপর্যায়ের তুলনামূলক পরীক্ষার ফল নয়। এছাড়া অন্য জেলায় চারা পাঠানোর পর সেখানে ফলন কেমন হচ্ছে, সে বিষয়ে কোনো সমন্বিত তথ্যও নেই।
সামনে কী: শীত ও রবি মৌসুমে টমেটোর চাহিদা বাড়ে; কমলগঞ্জের নার্সারিগুলোতেও তখন ব্যস্ততা বাড়বে। কৃষি বিভাগ বলছে, চারা উৎপাদনে কৃষকদের সহযোগিতা দেওয়া হবে। তবে চারার দাম ও টমেটোর বাজারদর কেমন থাকে, তার ওপর নির্ভর করবে এই খাতটি কতটা টিকবে। স্থানীয় চাষিরা বলছেন, এই কাজে যুক্ত কৃষকের সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে।



