দেশে প্রায় ৮০ লাখ থেকে ১ কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। বুধবার বেলা সাড়ে ১২টার দিকে রাজবাড়ী পৌরসভার মিলনায়তনে জেলা প্রশাসনের আয়োজনে সাংবাদিকদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় তিনি এ কথা বলেন।
তিতুমীর বলেন, ‘আমরা ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছি। উত্তরাধিকার সূত্রে একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি পেয়েছি। দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতির কারণে বিশেষ করে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তের ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হয়েছে। হিসাব অনুযায়ী, ৮০ লাখ থেকে ১ কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে।’ তাঁর দাবি, বিভিন্ন হিসাব ও বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এই চিত্র উঠে এসেছে।
সভায় জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা ও স্থানীয় প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমের সাংবাদিকেরা উপস্থিত ছিলেন।
উপদেষ্টার ভাষ্য অনুযায়ী, মূল্যস্ফীতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে অনেক পরিবার সঞ্চয় ভেঙেছে, অনেকে সংসার চালাতে ঋণও করেছে। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ দুর্বল হয়ে পড়ায় কর্মসংস্থান সৃষ্টি ব্যাহত হয়েছে। যুব বেকারত্ব ও শিক্ষিত বেকারত্ব উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। এর সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের সংকট ও আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি দেশের অর্থনীতিতে নতুন চাপ তৈরি করেছে।
তিনি বলেন, বিনিয়োগ বাড়াতে হলে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। জ্বালানিসংকট মোকাবিলায় সৌরবিদ্যুতের মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর সুযোগ থাকলেও আগের সরকার কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর মতে, গ্যাস অনুসন্ধান ও টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও অতীতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে সংস্কারের ওপর জোর দিয়ে রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা ও রাজস্ব আয় বাড়ানো এখন জরুরি। তাঁর হিসাবে ব্যাংক খাতের সংস্কারে ৪০ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হবে। পাশাপাশি আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার কথা বলেন তিনি।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতেও বাড়তি বিনিয়োগের পরিকল্পনার কথা জানান উপদেষ্টা। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথম শিক্ষা খাতে মোট দেশজ উৎপাদনের ২ শতাংশ ব্যয় করা হবে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে তা ধাপে ধাপে ৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। উপজেলা পর্যায়ে ১৫১ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগের কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
দারিদ্র্য মোকাবিলায় সরকার ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মতো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি চালু করেছে। এসব কর্মসূচির মাধ্যমে নতুন করে মানুষদের দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাওয়া ঠেকানো এবং দরিদ্র পরিবারের জীবনযাত্রায় স্বস্তি ফেরানোর আশা প্রকাশ করেন তিনি।
একই সভায় তিনি বলেন, বিভিন্ন সংস্থা জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির ভিন্ন ভিন্ন পূর্বাভাস দিয়েছে। এসব পূর্বাভাসকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুল ও বিকৃত তথ্য ছড়ানো হচ্ছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। তাঁর সতর্কবার্তা, প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়ন না হলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আরও কমে যেতে পারে।
তবে এই সংখ্যাটি কোনো নতুন সরকারি দারিদ্র্য জরিপের চূড়ান্ত ফল নয়। উপদেষ্টা বিভিন্ন হিসাব ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদনের বরাত দিয়েছেন, কিন্তু কোন জরিপে কত সময়ে কত মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমেছে, তার বিস্তারিত হিসাব সভায় দেননি। জেলা বা বিভাগভিত্তিক কোনো ভাঙা হিসাবও প্রকাশ করা হয়নি।
দারিদ্র্য বৃদ্ধির জন্য তিনি মূলত পূর্ববর্তী সরকারের আমলে সৃষ্ট মূল্যস্ফীতি ও দুর্বল অর্থনীতিকে দায়ী করেছেন। তবে এই বিষয়ে পূর্ববর্তী ক্ষমতাসীন দলের কিংবা স্বতন্ত্র অর্থনীতিবিদদের তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। সরকার নতুন করে আনুষ্ঠানিক দারিদ্র্য জরিপ কবে প্রকাশ করবে, সে বিষয়েও সভায় সুনির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা জানানো হয়নি।
তিতুমীর জানান, সরকার ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ ও সামাজিক সুরক্ষা জোরদারে কাজ করছে। এসব সংস্কার বাস্তবায়নের অগ্রগতি এবং ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের বাস্তবায়নই নির্ধারণ করবে, দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাওয়া মানুষের সংখ্যা আগামী দিনে কমবে কি না।
অর্থনীতিবিদদের অনেকেই বলে থাকেন, মূল্যস্ফীতি দীর্ঘ সময় ধরে চললে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো প্রথমে সঞ্চয় ভাঙে, পরে ঋণ নেয় এবং একপর্যায়ে খাবার, চিকিৎসা ও শিক্ষার খরচ কমাতে বাধ্য হয়। উপদেষ্টার বক্তব্যে সেই চিত্রই উঠে এসেছে। তবে সরকারি হিসাবে দারিদ্র্যের হার কত, তা নির্ভর করবে পরবর্তী জরিপ ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যের ওপর।



