সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, পানির সংকট ও কৃষি উৎপাদন কমে যাওয়ার সম্মিলিত চাপে ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের জনসংখ্যার প্রায় ৭ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ দেশের ভেতরেই জলবায়ু অভিবাসী হয়ে উঠতে পারেন। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) নতুন প্রতিবেদনে এই পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। ‘এশিয়া-প্যাসিফিক ক্লাইমেট রিপোর্ট ২০২৬: কোস্টাল রিস্কস অন দ্য রাইজ’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি বুধবার প্রকাশিত হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের উপকূলীয় বদ্বীপ অঞ্চল সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং স্থানীয়ভাবে ভূমি ডুবে যাওয়ার কারণে বাড়তি ঝুঁকিতে আছে। বদ্বীপের কিছু অংশ বছরে ৪ থেকে ৫৫ মিলিমিটার পর্যন্ত ডুবে যাচ্ছে। এতে কৃষিজমি কমছে এবং লবণাক্ত পানি ঢুকে পড়ার ঝুঁকি বাড়ছে। এসব কারণেই উপকূলের মানুষকে জীবিকা ও বসতবাড়ি ছাড়তে হতে পারে।
প্রতিবেদনে বাংলাদেশ, ভারত ও মিয়ানমারের উপকূলীয় এলাকার দরিদ্র পরিবারগুলোর ‘দ্বিগুণ বোঝা’র কথা বলা হয়েছে। বন্যাপ্রবণ এলাকার বাসিন্দারা প্রায়ই পাশের নিরাপদ এলাকার মানুষের চেয়ে বেশি দরিদ্র। ফলে দুর্যোগের আগে প্রস্তুতি, ক্ষতির সময় সামলানো এবং পরে ঘুরে দাঁড়ানোর তিনটি ধাপেই তাদের সামর্থ্য কম। এই বৈষম্য বাংলাদেশে সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দেখা যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
লবণাক্ত পানির অনুপ্রবেশ স্বাস্থ্যেও প্রভাব ফেলছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উপকূলীয় ভূগর্ভস্থ ও খাবার পানির লবণাক্ততা গর্ভাবস্থায় উচ্চ রক্তচাপ, হাইপারটেনশন ও কিডনি রোগের সঙ্গে যুক্ত। নিরাপদ পানির উৎস দূরে সরে যাওয়ায় নারীদের বেশি দূর পর্যন্ত পানি আনতে হয়। দুর্যোগের পর খাদ্যনিরাপত্তার ঝুঁকিও নারী ও মেয়েদের বেশি পড়তে হয়।
এডিবির হিসাবে, অভিযোজন ব্যবস্থা না নিলে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ৩০টি উপকূলীয় অর্থনীতিতে বার্ষিক বন্যা ক্ষতি এখনকার প্রায় ২ হাজার ৭০০ কোটি ডলার থেকে ২০৫০ সালে ১৭ হাজার ২০০ থেকে ১৯ হাজার ৯০০ কোটি ডলারে এবং ২১০০ সালে ৫২ হাজার থেকে ৭৩ হাজার ৯০০ কোটি ডলারে দাঁড়াতে পারে। ক্ষতি বর্তমান পর্যায়ে রাখতে বছরে ৯ থেকে ১৯ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রয়োজন হতে পারে; এতে বছরে ১৭৮ থেকে ৩৬০ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি এড়ানো সম্ভব বলে সংস্থাটি জানিয়েছে।
উচ্চ নির্গমন পরিস্থিতিতে (এসএসপি৫-৮.৫) বাংলাদেশের প্রায় ১ কোটি ৭৪ লাখ মানুষ ২১০০ সালের মধ্যে প্রতি বছর উপকূলীয় বন্যার মুখে পড়তে পারেন। এতে বার্ষিক অর্থনৈতিক ক্ষতি জিডিপির ১৫ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে বলে প্রতিবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। অঞ্চলটিতে ৪০ কোটিরও বেশি মানুষ সমুদ্র থেকে ১০ কিলোমিটারের মধ্যে বাস করেন।
এডিবি বলছে, উপকূলীয় অঞ্চলকে রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত পরিকল্পনা দরকার। সংস্থাটির ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট বিভাগের মহাপরিচালক ইয়েভগেনি ঝুকভ বলেছেন, উপকূল অঞ্চল অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হলেও সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধি ও বাড়তে থাকা দুর্যোগের মুখে পিছিয়ে পড়ছে। তাঁর মতে, এখনই দীর্ঘমেয়াদি, অভিযোজনযোগ্য ও ঝুঁকিভিত্তিক সমাধানে যেতে হবে।
বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে বলে প্রতিবেদনে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ২০১৮ সালের বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যান ২১০০-এ উপকূলীয় ও নদী এলাকার ৮০টি অগ্রাধিকার প্রকল্পে প্রায় ৫ হাজার ২০০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ কাঠামো রয়েছে। প্রায় ৫ হাজার বহুমুখী ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র, উন্নত পূর্বাভাস ও কমিউনিটি প্রস্তুতির কারণে ঘূর্ণিঝড়ে মৃত্যু আগের তুলনায় ৯৯ শতাংশেরও বেশি কমেছে। উপকূলীয় স্কুলগুলোতে শিক্ষার্থীদের আবহাওয়ার পূর্বাভাস পড়তে ও সতর্কবার্তা পৌঁছে দিতে শেখানো হচ্ছে।
তবে এসব উদ্যোগের পরও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা, ভূমি ডুবে যাওয়া, লবণাক্ততা ও কৃষি উৎপাদন কমার ধারা অব্যাহত থাকলে উপকূল থেকে অভ্যন্তরীণ অভিবাসন বাড়তে পারে। এডিবি চারটি অগ্রাধিকার দিয়েছে: উন্নয়ন সিদ্ধান্তে অভিযোজন পরিকল্পনা যুক্ত করা, প্রতিষ্ঠান ও সুশাসন শক্তিশালী করা, অর্থায়ন জোগাড় করা এবং বাস্তবায়ন দীর্ঘমেয়াদে চালিয়ে যাওয়া। সংস্থাটি বলছে, ২০১৫ সালে বছরে প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার থাকা আন্তর্জাতিক অভিযোজন সহায়তা ২০২২-২৩ সালে বেড়ে গড়ে ১১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার হয়েছে; তবু বড় ঘাটতি রয়েছে।
প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপে অবশ্য ৭ দশমিক ৫ শতাংশের হিসাবটি কোন ভিত্তিবছর, কোন এলাকা বা অভিবাসনের কোন সংজ্ঞার ওপর দাঁড়িয়ে তৈরি, তা বিস্তারিত বলা হয়নি। বাংলাদেশের জন্য আলাদা করে ভবিষ্যৎ বন্যা ক্ষতির অঙ্কও প্রতিবেদনে নেই। এই পূর্বাভাস বর্তমান অভিযোজন কার্যক্রম কতটা ধরে নিয়েছে, তা-ও স্পষ্ট নয়। ফলে কোন জেলা থেকে কত মানুষ কোথায় যাবেন, সেই নির্দিষ্ট চিত্র এই প্রতিবেদন দিচ্ছে না।
সরকার এই প্রতিবেদনের বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া দেয়নি। সামনে দেখার বিষয় হবে, ডেল্টা প্ল্যানের বিনিয়োগ কত দ্রুত বাস্তবে রূপ নেয়, অভ্যন্তরীণ অভিবাসীদের জন্য শহর ও উপশহরে আবাসন, কাজ এবং পানি-স্বাস্থ্যসেবার প্রস্তুতি কতটা বাড়ে, আর এডিবি যে বিনিয়োগের কথা বলছে তার কতটা আসে। জলবায়ুজনিত স্থানান্তর ঠেকানো সম্ভব না হলেও পরিকল্পিত প্রস্তুতি ক্ষতির মাত্রা কমাতে পারে বলে প্রতিবেদনের বার্তা।



