কুমিল্লায় ১৩ বছর বয়সী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যার মামলায় চারজনের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দাখিল করেছে পুলিশ। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কুমিল্লা সদর দক্ষিণ মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) রাজিব আহমেদ গত ২০ অক্টোবর চার্জশিটটি দাখিল করেন। জেলা পুলিশের মিডিয়া কর্মকর্তা ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. লুৎফর রহমান বৃহস্পতিবার রাত ১২টা ৩০ মিনিটের দিকে বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
চার্জশিটে আসামি করা হয়েছে সাইফুল ইসলাম ওরফে তুহিন (১৯), মো. সিয়াম (১৯) এবং ১৫ ও ১৬ বছর বয়সী দুজনকে। পেনাল কোডের ৩০২, ২০১ ও ৩৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। শিশু আইন অনুযায়ী ওই দুজনকে চার্জশিটে কিশোর হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
অপ্রতিম কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাহিদা বেগমের ছেলে। সে কুমিল্লা নগরের কোটবাড়ি এলাকার গন্ধমতীতে পরিবারের সঙ্গে থাকত এবং বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। গত ১৮ সেপ্টেম্বর বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর সে নিখোঁজ হয়। পরদিন ১৯ সেপ্টেম্বর পুলিশ সদর দক্ষিণ উপজেলার বিজয়পুর ইউনিয়নের সানন্দা গ্রামে লালমাই পাহাড়ের নির্জন জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে।
পুলিশের বরাত অনুযায়ী, আইফোন ছিনতাইয়ের পরিকল্পনা করেই অপ্রতিমকে ওই নির্জন জায়গায় নেওয়া হয়। ফোনটি দিতে অস্বীকার করলে তার মাথায় বাঁশের লাঠি দিয়ে আঘাত করা হয়; ওই আঘাতে তার মৃত্যু হয়। তদন্তকারীরা বলছেন, তুহিনের শয্যার নিচ থেকে অপ্রতিমের আইফোন উদ্ধার করা হয়েছে। বিভিন্ন স্থানের সিসিটিভি ফুটেজ দেখে তুহিনকে শনাক্ত করা হয়; পরে জিজ্ঞাসাবাদে বাকি আসামিদের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যায়।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, হত্যার পরিকল্পনায় নেতৃত্ব দিয়েছে তুহিন। সিয়ামের বিরুদ্ধে পরিকল্পনা ও সহযোগিতার অভিযোগ আছে। চারজনের মধ্যে তিনজন সরাসরি হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিলেন বলে পুলিশ জানিয়েছে। তুহিন ও দুজন কিশোর আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। তদন্ত কর্মকর্তা বলেছেন, মরদেহ উদ্ধারের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আসামিদের গ্রেপ্তার করা হয় এবং পুলিশ সুপারের নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যেই ৩১ দিনে চার্জশিট দাখিল করা হয়।
অপ্রতিমের বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার মামলার বাদী। তিনি বলেছেন, তদন্ত কর্মকর্তা বৃহস্পতিবার রাত ১২টা ৩০ মিনিটের দিকে ফোন করে চার্জশিট দাখিলের খবর জানান। তিনি বলেন, অপ্রতিম ছিল তাঁদের জীবনের স্বপ্ন; খুনিরা সেই স্বপ্ন কেড়ে নিয়েছে। হত্যাকারীদের দ্রুত বিচার ও সর্বোচ্চ শাস্তি চেয়েছেন তিনি।
পরিবারটি দুই কিশোরের প্রকৃত বয়স নিয়েও শুরু থেকেই প্রশ্ন তুলেছে। প্রয়োজনে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে বয়স নির্ধারণের দাবি জানিয়েছিল তারা। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরাও এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। চার্জশিটের কপি পাওয়ার পর আইনজীবীর সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ভাবছে পরিবার।
দুর্গাপূজার সরকারি ছুটির কারণে চার্জশিট দাখিলের পরপরই আদালতের কার্যক্রম শুরু হয়নি। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, রোববার থেকে আদালতের কাজ স্বাভাবিক হওয়ার কথা। এখনও অভিযোগ গঠন হয়নি এবং বিচারের তারিখ নির্ধারিত হয়নি। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আদালতে প্রমাণ করতে হবে; ততদিন পর্যন্ত তারা নির্দোষ।
এখনও স্পষ্ট নয়, ১৫ ও ১৬ বছর বয়সী দুই আসামির বিচার শিশু আইনের আওতায় হবে কি না এবং পরিবারের বয়স যাচাইয়ের দাবি আদালত গ্রহণ করবে কি না। অভিযুক্তদের আইনজীবীর বক্তব্য এসব প্রতিবেদনে নেই। চার্জশিটের কপি পাওয়ার পর পরিবার ও তদন্তকারী পক্ষ কী যুক্তি উপস্থাপন করে, তার ওপরই পরবর্তী ধাপ নির্ভর করছে।
এখন পরিবার অপেক্ষা করছে বিচার শুরুর। চার্জশিট দাখিলের মধ্য দিয়ে তদন্তের কাজ শেষ হয়েছে; এখন আদালত অভিযোগ আমলে নিয়ে বিচারের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেবে। অপ্রতিমের বাবা বলেছেন, তাঁদের একমাত্র দাবি দ্রুত বিচার এবং দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি।



