গত ১৭ অক্টোবর সকালে কক্সবাজার শহর থেকে প্রায় ২৮ কিলোমিটার দক্ষিণে উখিয়ার পাটুয়ারটেক সৈকতসংলগ্ন মেরিন ড্রাইভের পাশে তিনতলা ‘টুপটুপ রেস্তোরাঁ অ্যান্ড রিসোর্টে’ আগুন লাগে। রিসোর্টের দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলার আটটি কক্ষে পর্যটকরা ছিলেন, নিচতলায় ছিল রেস্তোরাঁ ও কর্মীদের থাকার জায়গা। ঘটনাস্থল থেকে ১০ পর্যটকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশের হিসাবে আহত সাতজন হাসপাতালে চিকিৎসা নেন এবং দুজন জানালা থেকে লাফ দিয়ে প্রাণে বাঁচেন। ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট সকাল ৮টা ১৫ মিনিটের দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেছেন, সকাল সাড়ে সাতটার দিকে রিসোর্টের ভেতরে বিকট শব্দ হয়, এরপর আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। পাশের চায়ের দোকানের মালিক গিয়াস উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, বিস্ফোরণের শব্দ শুনে তিনি বাইরে এসে দেখেন রিসোর্টে আগুন জ্বলছে এবং মানুষ ছোটাছুটি করছে। ধোঁয়া ও আগুনের কারণে তখন ভেতরে ঢুকে কাউকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আতিকুর রহমান বলেছেন, গ্রেপ্তার হওয়া সহকারী ব্যবস্থাপককে জিজ্ঞাসাবাদ ও প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গেছে, নিচতলার একটি ফ্রিজে শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। এরপর রান্নাঘরের গ্যাস সিলিন্ডারে বিস্ফোরণ ঘটে এবং গুদামে রাখা দাহ্য রাসায়নিক পদার্থ, কাঠের অবকাঠামো ও জোরে বাতাসের কারণে আগুন দ্রুত ছড়ায়। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা, উপপরিদর্শক রিমন ঘোষ বলেছেন, সূত্রপাত নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য আসছে; প্রকৃত কারণ নিশ্চিত করতে আরও সময় লাগবে। গুদামে ঠিক কী ধরনের রাসায়নিক ছিল, তাও এখনো জানা যায়নি।

জেলা প্রশাসনের পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি ১৮ অক্টোবর ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। কমিটির প্রধান, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাসনীম জাহান বলেছেন, আগুনের কারণ, রিসোর্ট কর্তৃপক্ষের গাফিলতি, প্রয়োজনীয় নিবন্ধন ও নথি এবং অবকাঠামোগত সমস্যা—সব দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে। রিপোর্ট পেতে আরও সময় লাগতে পারে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান।

তদন্তে উঠে এসেছে, রিসোর্টটি শুধু জালিয়াপালং ইউনিয়ন পরিষদের ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে চলছিল। লাইসেন্সটি গত ২২ জুলাই মো. তানভীর সুলতান মিয়ার নামে দেওয়া হয়; এর মেয়াদ ১ জুলাই ২০২৬ থেকে ৩০ জুন ২০২৭ পর্যন্ত। লাইসেন্স ফি, মূল্য সংযোজন কর ও বাণিজ্যিক কর মিলিয়ে দুই হাজার টাকা নেওয়া হয়। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এস এম ছৈয়দ আলম বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেছেন, নির্ধারিত ফি নিয়েই প্রতিষ্ঠানটিকে ট্রেড লাইসেন্স দেওয়া হয়েছিল।

তবে ফায়ার সার্ভিস, পরিবেশ অধিদপ্তর ও কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কউক) অনুমোদন ছিল না। জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেছেন, রিসোর্ট নির্মাণে কউকের অনুমোদন লাগে, কিন্তু কর্তৃপক্ষ আবেদনই করেনি। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের কক্সবাজারের উপসহকারী পরিচালক সৈয়দ মোর্শেদ হোসেন জানিয়েছেন, অগ্নিনিরাপত্তার অনুমোদনও নেওয়া হয়নি এবং রিসোর্টে অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা ছিল না। ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত জুনে ফায়ার সার্ভিসের এক পরিদর্শক ভবনটিকে ঝুঁকিপূর্ণ চিহ্নিত করে ১১ জুন আনুষ্ঠানিক নোটিশ দেন; চার মাস আগেই সতর্ক করা হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

ঘটনার রাতে উখিয়া থানার উপপরিদর্শক আশিস সূত্রধর বাদী হয়ে মামলা করেন। মামলায় চারজনের নাম এবং অজ্ঞাত পরিচয়ের আরও ১৯ জনকে আসামি করা হয়। প্রধান আসামি রিসোর্টের মালিক মো. তানভীর সুলতান মিয়া; অন্য আসামিদের মধ্যে প্রধান ব্যবস্থাপক সাঈদ আহাম্মেদ, ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ সাঈদ ও সহকারী ব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন সুমন আছেন। জাহিদ হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে; তাঁর সাত দিনের রিমান্ড চাওয়া হলেও শুনানির তারিখ এখনো নির্ধারিত হয়নি। মো. তানভীর সুলতান মিয়া পলাতক। তদন্তসংশ্লিষ্ট এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেছেন, তিনি ইন্দোনেশিয়ায় আছেন; এই দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি। রিসোর্টের অপর মালিক নেওয়াজ মোর্শেদও আত্মগোপনে আছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।

আগুনের সময় রিসোর্টে কতজন ছিলেন, তা নিয়েও স্বজন ও পুলিশের হিসাবে পার্থক্য আছে। স্বজনদের ভাষ্য, ১৬ অক্টোবর রাতে নারী ও শিশুসহ ২১ জন পর্যটক সেখানে ছিলেন; পরদিন ভোরে দুজন সৈকতে যাওয়ায় ঘটনার সময় উপস্থিত ছিলেন ১৯ জন। তাঁদের হিসাবে ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, ছয়জন আহত হয়েছেন এবং দুজন লাফ দিয়ে বেঁচেছেন; অর্থাৎ আরও একজন নিখোঁজ। ওসি আতিকুর রহমান অবশ্য বলেছেন, পুলিশের প্রাথমিক অনুসন্ধানে ১৯ জন অতিথির মধ্যে ১০ জন মারা গেছেন, সাতজন আহত হয়েছেন এবং দুজন লাফ দিয়ে বেঁচেছেন; এই ১৯ জনের বাইরে কেউ নিখোঁজ হওয়ার লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। তাসনীম জাহান বলেছেন, একজন নিখোঁজের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে; ফায়ার সার্ভিস আবার তল্লাশি চালিয়েও আর কোনো মরদেহ পায়নি।

নিহতদের পরিচয় নিশ্চিত করতে ডিএনএ পরীক্ষার প্রয়োজন হবে, কারণ মরদেহগুলো আগুনে বিকৃত হয়েছে বলে জানিয়েছেন কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা সুবক্তগীন মাহমুদ। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর দায় নির্ধারণ ও পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে প্রশাসন। এ ছাড়া আগুনের প্রকৃত কারণ, অনুমোদন ছাড়া রিসোর্টটি কত দিন চলছিল এবং স্থানীয় পর্যায়ে তদারকি কেন ব্যর্থ হলো—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো আসেনি।

মেরিন ড্রাইভ ঘিরে গড়ে ওঠা রিসোর্ট ও কটেজের নিরাপত্তা নিয়ে ঘটনার পর নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। পোড়া রিসোর্ট দেখতে পর্যটকদের ভিড়ও দেখা গেছে। চট্টগ্রামের রাউজানের ব্যবসায়ী গফুর উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেছেন, পর্যটক টানতে সাজানো কক্ষের বিজ্ঞাপন দেওয়া হলেও দুর্ঘটনার পর দায় নেওয়ার বিষয়টি সামনে আসে না। নিরাপত্তা ও অনুমোদন নিশ্চিত না করে এমন প্রতিষ্ঠান চালু থাকলে ভবিষ্যতেও প্রাণহানির ঝুঁকি আছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।