চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় তিব্বত স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলে ৭ মাত্রার একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার রাত ১০টা ৩৩ মিনিটে, অর্থাৎ বাংলাদেশ সময় রাত ৮টা ৩৩ মিনিটে, নাগচু শহরের বাকেন কাউন্টিতে ভূমিকম্পটি হয় বলে জানিয়েছে চায়না আর্থকোয়েক নেটওয়ার্কস সেন্টার (সিইএনসি)। রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের বরাতে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, উৎপত্তিস্থলের কাছে একটি গ্রামে অন্তত দুজন আহত হয়েছেন এবং কাছের গ্রামগুলোর কয়েকটি বাড়িতে ফাটল দেখা গেছে।
সিইএনসির তথ্য অনুযায়ী, ভূমিকম্পের কেন্দ্র ছিল ৩২ দশমিক ৪০ ডিগ্রি উত্তর অক্ষাংশ ও ৯৩ দশমিক ৭৯ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমায়, ভূপৃষ্ঠ থেকে ১০ কিলোমিটার গভীরে। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ (ইউএসজিএস) অবশ্য জানিয়েছে, কম্পনটি নাগচু থেকে ১৯১ কিলোমিটার পূর্ব-উত্তর-পূর্বে এবং এর গভীরতা ১৮ কিলোমিটার। দুটি সংস্থার হিসাবে গভীরতার পার্থক্য রয়েছে; মাত্রা দুই ক্ষেত্রেই ৭।
উৎপত্তিস্থলটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৪ হাজার ৮৬৪ মিটার উঁচু এবং জনবিরল এলাকা। তিব্বতের রাজধানী লাসা থেকে এর দূরত্ব প্রায় ৪০০ কিলোমিটার। সিইএনসি বলেছে, স্থানীয় এলাকায় কম্পনটি তীব্রভাবে অনুভূত হয়েছে। ২০২৪ সালের জানুয়ারির পর চীনে আঘাত হানা এটিই সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প।
রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমের বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, কম্পনের পর লোকজন ঘর ছেড়ে রাস্তায় ও গাড়িতে আশ্রয় নেন। একজন বাসিন্দা বলেছেন, প্রবল কম্পনে তিনি ঘুম থেকে জেগে ওঠেন এবং ঘরের কাঠামো থেকে চাপের শব্দ শুনতে পান। স্থানীয় ফায়ার সার্ভিস ও উদ্ধার দল এলাকার দিকে রওনা হয়েছে। এরপর ৩ ও ৪ মাত্রার কয়েকটি ছোট কম্পনও রেকর্ড হয়েছে।
ইউএসজিএসের প্রাথমিক মূল্যায়নে ভূমিকম্পটির সতর্কতা স্তর ‘অরেঞ্জ’। তাদের হিসাবে, উৎপত্তিস্থলের আশপাশে প্রায় ১ লাখ ১১ হাজার মানুষ মাঝারি থেকে তীব্র কম্পন অনুভব করেছেন। সংস্থাটি বলছে, এ ধরনের কম্পনে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে এবং প্রাণহানিও অসম্ভব নয়। তবে এলাকাটি জনবিরল হওয়ায় ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা নির্ভর করবে কম্পনের কেন্দ্র কতটা জনবসতির কাছে ছিল তার ওপর।
তিব্বত মালভূমি ভূমিকম্পপ্রবণ। ভারতীয় ও ইউরেশীয় প্লেটের সংঘর্ষে হিমালয় ও তিব্বত মালভূমি গড়ে উঠেছে, আর মালভূমির ভেতরে প্রসারণজনিত ফাটলরেখায় এ ধরনের কম্পন ঘটে। ইউএসজিএস জানিয়েছে, ১৯০০ সালের পর তিব্বত মালভূমি ও তার আশপাশে ৭ মাত্রার বা তার বেশি ২৯টি ভূমিকম্প হয়েছে। ১৯৫০ সালের ৮ দশমিক ৬ মাত্রার আসাম-তিব্বত ভূমিকম্পে ৪ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়। ২০১০ সালে এবারের কেন্দ্র থেকে ২৭২ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে ৬ দশমিক ৯ মাত্রার ভূমিকম্পে ২ হাজার ৫০০-এর বেশি মানুষ মারা যান।
গত আগস্টে নেপাল-তিব্বত সীমান্তে হিমবাহ ধসের জেরে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধস হয়, যেখানে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে। ওই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই এবারের ভূমিকম্পটি হলো। উঁচু পার্বত্য এলাকায় যোগাযোগ ও উদ্ধারকাজ কঠিন হওয়ায় ক্ষয়ক্ষতির চিত্র ধীরে ধীরে স্পষ্ট হতে পারে।
শুক্রবার ভোর পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা বা ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ হিসাব চীনা কর্তৃপক্ষ প্রকাশ করেনি। তথ্য মূলত রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থার বরাতে আসছে। উৎপত্তিস্থলের আশপাশের প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে, উদ্ধারকর্মীরা কখন সেখানে পৌঁছাবেন এবং আহতের সংখ্যা আর বাড়বে কি না—এসব এখনো অজানা।
উদ্ধারকর্মীরা এলাকায় পৌঁছালে ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র পাওয়া যাবে। এর মধ্যে ছোট ছোট আফটারশক চলতে থাকায় উঁচু এলাকায় থাকা বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে ইউএসজিএস। শীত ও উচ্চতার কারণে ত্রাণকাজও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।



