সুন্দরবনের আকরাম পয়েন্টে প্রস্তাবিত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনাল বাতিলের দাবিতে বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) খুলনা প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন করেছে পরিবেশবাদী ও নাগরিক সংগঠনগুলো। এই কর্মসূচির আয়োজক ছিল ‘আমরাই আগামী’, ‘ক্লাইমেট কানেক্টস’, ‘রিগ্লোবাল’, ‘প্রতিবেশ ও উন্নয়ন ফোরাম, খুলনা’, ‘ক্লিন’ এবং ‘বাংলাদেশ ওয়ার্কিং গ্রুপ অন এক্সটার্নাল ডেট’ (বিডব্লিউজিইডি)।
বক্তারা বলেছেন, বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ সুন্দরবনের ভেতরে এমন অবকাঠামো হলে সামুদ্রিক ও উপকূলীয় পরিবেশ এবং জীববৈচিত্র্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়বে। তাঁদের আশঙ্কা, মাছের প্রাপ্যতা কমলে জীবিকা ও আয়ের প্রধান উৎস হারাবেন স্থানীয় জেলেরা। এতে উপকূলীয় মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক সুরক্ষাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই প্রকল্পের পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাবের পূর্ণ মূল্যায়ন ছাড়া এগোনো উচিত নয় বলে তারা জানিয়েছেন।
অর্থনৈতিক যুক্তিও দিয়েছেন আয়োজকেরা। তাদের মতে, এলএনজি আমদানিনির্ভর অবকাঠামো বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করবে। টার্মিনাল নির্মাণ, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয়ের সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ওঠানামা যোগ হলে জ্বালানি খাতে আর্থিক বোঝা বাড়বে। বিদ্যুতের প্রকৃত চাহিদা ও বিদ্যমান উৎপাদন সক্ষমতা হিসাব না করে নতুন টার্মিনাল বা গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র হলে বিনিয়োগ অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক নাও হতে পারে বলেও সতর্ক করেন তারা। বিকল্প হিসেবে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ, সোলার পার্ক এবং বিদ্যমান বিদ্যুৎ অবকাঠামোর আরও ভালো ব্যবহারের দিকে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
আকরাম পয়েন্ট সুন্দরবনের ভেতরে শিবসা ও পশুর নদীর মিলনস্থলে। এই পয়েন্টের দুই কিলোমিটারের মধ্যে একদিকে সুন্দরবন দক্ষিণ বন্য প্রাণী অভয়ারণ্য, অন্যদিকে সুন্দরবন পূর্ব বন্য প্রাণী অভয়ারণ্য; দুটিই ইউনেসকো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ। শিবসা নদী-সংলগ্ন নলিয়ান গ্রাম সুন্দরবনের অংশ না হলেও সুন্দরবনের চারপাশে ১০ কিলোমিটার এলাকা নিয়ে গঠিত প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকার অন্তর্ভুক্ত।
সরকারি পর্যায়ে প্রকল্পটি এগিয়েছে কয়েক ধাপে। গত ১৩ আগস্ট বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানান, খুলনার হিরণ পয়েন্ট, মোংলা ও পায়রায় তিনটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল হবে। এরপর ১৯ অক্টোবর রাজধানীতে ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, খুলনার কাছে ২০ মিটার ড্রাফট আছে এমন স্থানে আধুনিক টার্মিনাল তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
গত ১৬ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ, নৌপরিবহন, সড়ক, সেতু ও রেলপথমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম এবং বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরীসহ একটি প্রতিনিধিদল আকরাম পয়েন্ট, শিবসা নদী, সুন্দরবন ও মোংলা বন্দর ঘুরে দেখেন। পরে মোংলায় এক অনুষ্ঠানে শেখ রবিউল আলম বলেন, আকরাম পয়েন্টে ভাসমান এলএনজি স্টেশন হবে এবং ২৩ কিলোমিটার পাইপলাইনে গ্যাস মোংলায় এনে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহার করা হবে।
বৃহস্পতিবার সুন্দরবন ও মোংলা বন্দর পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সেখানে মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন, বেজা প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অঞ্চল ও সুন্দরবনের পর্যটন নিয়ে আলোচনা হয়। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত প্রথম আলোকে বলেছেন, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল উন্নয়ন বঞ্চিত ছিল; এই অঞ্চলের মানুষের জীবনমান বাড়াতে শিল্পায়ন দরকার। প্রধানমন্ত্রী সরেজমিনে দেখলে বন্দর, অর্থনৈতিক অঞ্চল ও পর্যটনের বিষয়গুলো কীভাবে যুক্ত, তা বুঝতে পারবেন বলে তিনি জানান।
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেছেন, এসব কিছু করার আগে সম্ভাব্যতা যাচাই ও পরিবেশগত সমীক্ষা হবে। সবকিছু অনুকূল থাকলে প্রকল্প নিয়ে কথা বলার সুযোগ তৈরি হবে, তার আগে নয়। অর্থাৎ সরকারের অবস্থান হলো, চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে সমীক্ষার ফল দেখতে হবে।
বন বিভাগকে প্রকল্পটি সম্পর্কে আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি বলে প্রথম আলোকে জানিয়েছেন প্রধান বন সংরক্ষক মো. আমীর হোসাইন চৌধুরী। তিনি এ বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করতে রাজি হননি। এদিকে খুলনা বন সংরক্ষকের কার্যালয় থেকে বন অধিদপ্তরে উদ্বেগ জানিয়ে একটি চিঠি পাঠানো হয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, টার্মিনাল হলে শ্বাসমূলের ক্ষতি, নিয়মিত খনন এবং জাহাজ চলাচলের শব্দ ও কম্পনে ম্যানগ্রোভ গাছ, ডলফিন, বাঘ, চিত্রা হরিণ ও পরিযায়ী পাখির আবাস ঝুঁকিতে পড়বে।
বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের সহসভাপতি এম ফিরোজ আহমেদ প্রথম আলোকে বলেছেন, বনের ভেতরে কিছু নির্মাণ করলে প্রভাব অনিবার্য। সুন্দরবন যেহেতু বিশ্ব ঐতিহ্য, তাই সরকারের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা উচিত। তিনি বলেন, এলএনজি দাহ্য পদার্থ হওয়ায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকে; জাহাজ চলাচল বাড়লে তেল নিঃসরণ ও দূষণও বাড়বে।
ইউনেসকো ২০১৪ সাল থেকে সুন্দরবনের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করছে। রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়েও সংস্থাটি তীব্র আপত্তি জানিয়েছিল। ২০১৬ সালে ইউনেসকো ও আইইউসিএনের যৌথ মিশন রামপাল প্রকল্প বাতিল করে অন্যত্র সরানোর সুপারিশ করেছিল। চলতি বছরের জুলাইয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার বুসানে অনুষ্ঠিত বিশ্ব ঐতিহ্য কমিটির সভায় সুন্দরবনের জন্য কৌশলগত পরিবেশ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা নেওয়ার তাগিদ দেওয়া হয় এবং বাংলাদেশকে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সময়সীমা বাড়িয়ে ২০২৯ সালের ফেব্রুয়ারি করা হয়।
এখনো নিশ্চিত নয়, টার্মিনালের চূড়ান্ত স্থান কোনটি হবে, সম্ভাব্যতা বা পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়নের প্রতিবেদন কবে প্রকাশ হবে এবং পাইপলাইন কোন পদ্ধতিতে বসানো হবে। প্রকল্পের ব্যয়, বিনিয়োগকারী ও বাস্তবায়নের সময়সীমাও সরকার স্পষ্ট করেনি। বন বিভাগকে আনুষ্ঠানিকভাবে পরামর্শের আওতায় আনা হবে কি না, সে বিষয়েও কোনো ঘোষণা নেই।
সামনে যা দেখার বিষয়: প্রধানমন্ত্রীর সফরের পর সরকার প্রকল্পটি নিয়ে আনুষ্ঠানিক অবস্থান জানায় কি না, সম্ভাব্যতা ও পরিবেশগত সমীক্ষা শুরু হলে তার ফল প্রকাশ করা হয় কি না, এবং স্থানীয় জেলে ও পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর সঙ্গে আলোচনায় বসা হয় কি না। সুন্দরবনকে বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকা থেকে ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায় নেওয়ার প্রশ্নও ইউনেসকোর পরবর্তী প্রতিবেদনের সঙ্গে জড়িত।



