রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুন লেগে পুরো হাসপাতাল প্রায় ছয় ঘণ্টা বিদ্যুৎবিহীন ছিল। বৃহস্পতিবার সকাল পৌনে সাতটার দিকে নিচতলার বিদ্যুৎ নিয়ন্ত্রণ কক্ষের পাশে প্রশাসনিক শাখা সংলগ্ন সুইচ বোর্ডে আগুনের সূত্রপাত হয়। কর্তব্যরত এক নার্স আগুন দেখে রংপুর ফায়ার সার্ভিসকে খবর দেন। ফায়ার সার্ভিসের একটি দল ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রায় আধা ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।
আগুনে সুইচ বোর্ডের সার্কিট ব্রেকার ও বৈদ্যুতিক তার পুড়ে যাওয়ায় হাসপাতালের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এতে দ্বিতীয় থেকে পঞ্চম তলার ওয়ার্ডে থাকা রোগী ও তাঁদের স্বজনদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেকে সিঁড়ি দিয়ে দ্রুত নিচে নামার চেষ্টা করেন। ঢাকা ট্রিবিউনের রংপুর প্রতিনিধির প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই তাড়াহুড়োয় পড়ে গিয়ে ও পদদলিত হয়ে অন্তত ৪০ জন রোগী ও স্বজন আহত হন।
ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, দ্বিতীয় তলার নেফ্রোলজি ওয়ার্ডের কিডনি রোগী সফিউল আলমকে কোলে করে নিচে নামানোর সময় তাঁর দুই ভাতিজা পড়ে যান। সফিউলও আহত হন। ওই ওয়ার্ডের অন্তত ১৫ জন রোগী তাড়াহুড়ো করে নামতে গিয়ে পদদলিত হন। তৃতীয় তলার গাইনি ওয়ার্ড থেকে নবজাতকসহ রোগীদের নামানোর সময় কয়েকজন শিশুও আহত হয়। গাইনি ওয়ার্ডের রোগী মমতাজ বেগম বলেন, পাঁচ দিন আগে তাঁর শিশু কন্যার জন্ম হয়েছে; আগুনের খবর শুনে শিশুকে নিয়ে নিচে নামতে গিয়ে তিনি আহত হন।
বিদ্যুৎ বিভ্রাটে হাসপাতালের জরুরি অপারেশন ও চিকিৎসাসেবা বন্ধ হয়ে যায়। ডায়ালাইসিস, হৃদরোগ, নেফ্রোলজি ও গাইনি ওয়ার্ড দীর্ঘ সময় অন্ধকারে ছিল। বিকেল পর্যন্ত বিভিন্ন ওয়ার্ডে বিদ্যুৎ ফিরলেও হাসপাতাল পরিচালকের কার্যালয়, হৃদরোগ বিভাগ, প্যাথলজি, চর্ম ও যৌন রোগ, কিডনি ডায়ালাইসিস ও নেফ্রোলজি ওয়ার্ড বিদ্যুৎবিহীন ছিল। ফলে গরমে ভোগান্তিতে পড়েন ভর্তি রোগীরা।
হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ডা. আব্দুল মোকাদ্দেম বলেন, বিদ্যুতের শর্টসার্কিট থেকেই আগুনের সূত্রপাত হয়েছে এবং বিদ্যুৎ সংযোগ ফেরানোর কাজ চলছে। সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) ডা. কানিজ সাবিহা বলেন, আগুন থেকে অন্য কোনো ক্ষতি হয়নি; ওয়ার্ডগুলোতে বিদ্যুৎ দেওয়া হয়েছে এবং প্রশাসনিক ভবনের সংযোগ স্বাভাবিক করতে কাজ চলছে।
দুপুর ১২টার দিকে লাইনের ত্রুটি মেরামত করে ওয়ার্ডগুলোতে বিদ্যুৎ সংযোগ পুনঃস্থাপন করা হয়। এরপর ডায়ালাইসিস, আইসিইউ ও জরুরি চিকিৎসাসেবা চালু হয়। তবে প্রশাসনিক ভবনের বিদ্যুৎ বিকেল পর্যন্ত বন্ধ ছিল। এ ঘটনায় কেউ প্রাণ হারিয়েছেন বলে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
এই ঘটনায় আহতের সংখ্যা নিয়ে সরকারি কোনো হিসাব তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ৪০ জনের হিসাবটি আলাদাভাবে নিশ্চিত করেনি; সংখ্যাটি ঢাকা ট্রিবিউনের প্রতিবেদনে রোগী, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও ফায়ার সার্ভিসের তথ্যের ভিত্তিতে এসেছে। আগুনে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ, ঘটনার তদন্তে কোনো কমিটি হয়েছে কি না এবং বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ত্রুটি কীভাবে মেরামত হবে—এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তরও এদিন পাওয়া যায়নি।
সারাবাংলার প্রতিবেদন অনুযায়ী, রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আগেও একাধিকবার অগ্নিকাণ্ড ও বিদ্যুৎ বিভ্রাটের ঘটনা ঘটেছে। হাসপাতালের ৪০টি ওয়ার্ডের মধ্যে ১২টিতে জরুরি জেনারেটর সংযোগ নেই; বিদ্যুৎ চলে গেলে এসব ওয়ার্ডে চিকিৎসক ও নার্সরা মোবাইল ফোনের আলোয় জরুরি চিকিৎসা দেন।
রংপুর বিভাগের সবচেয়ে বড় সরকারি হাসপাতালগুলোর একটি এটি। উত্তরাঞ্চলের আট জেলার রোগীরা এখানে চিকিৎসা নিতে আসেন। তাই বিদ্যুৎ বিভ্রাট বা অগ্নিকাণ্ড শুধু একটি ওয়ার্ডের ভোগান্তিতে সীমাবদ্ধ থাকে না; জরুরি সেবার পুরো ব্যবস্থাই বন্ধ হয়ে পড়ে।
এখন সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন, প্রশাসনিক ভবনসহ বাকি অংশে বিদ্যুৎ কখন পুরোপুরি ফিরবে এবং আহত রোগীদের চিকিৎসা কতটা নিশ্চিত হয়েছে। পাশাপাশি হাসপাতালের পুরোনো বৈদ্যুতিক অবকাঠামো ও জেনারেটর ব্যবস্থা কেন আগেই সংস্কার করা হয়নি—সে বিষয়েও ব্যাখ্যা চাইবেন রোগী ও তাঁদের স্বজনরা।



