বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ৩ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১১২ ডলারে দাঁড়িয়েছে। ১৮ মে-র পর এটি সর্বোচ্চ দর। সৌদি আরবে হুথি বিদ্রোহীদের হামলা এবং হরমুজ প্রণালিতে একের পর এক জাহাজে আঘাতের ঘটনায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে, যার প্রতিফলন এই দর বৃদ্ধিতে।

গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বুধবার ইরান-সমর্থিত হুথিরা সৌদি আরবের কয়েকটি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায়। দাম্মাম শহরের বেসামরিক বিমানবন্দরে এই হামলায় দুইজন নিহত ও আটজন আহত হয়েছেন। আলাদা এক ড্রোন হামলায় সৌদির একটি তেলক্ষেত্রে দুইজন নিহত হন। তাৎক্ষণিকভাবে সৌদি কর্তৃপক্ষ হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত বিবরণ দেননি।

ইরানের ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) নৌবাহিনী বলেছে, উত্তর পারস্য উপসাগরে ‘অবৈধ’ তেল স্থানান্তরে জড়িত থাকা চারটি জাহাজ তাদের নজরে আসার পর আঘাতপ্রাপ্ত হয় ও আগুন ধরে যায়। পশ্চিম হরমুজে আরও তিনটি জাহাজ মাইনে ধাক্কা খেয়েছে বলেও দাবি করেছে তারা। জাহাজগুলোর পতাকা, মালিকানা বা কেউ হতাহত হয়েছেন কি না, সে তথ্য ইরানি পক্ষ দেয়নি; ঘটনার ধরন নিয়েও স্বাধীন যাচাই প্রকাশ্যে আসেনি।

এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবে নিজেদের কূটনৈতিক মিশনের কিছু কর্মী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের দেশ ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের বরাতে গার্ডিয়ান জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের অন্য কয়েকটি মিশন থেকেও পরিবারের সদস্যদের সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা আছে। তবে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র টমি পিগট বলেছেন, বর্তমান নির্দেশ কেবল সৌদি আরবের কর্মী ও তাঁদের পরিবারের জন্য প্রযোজ্য।

রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরামকো ধাহরানের সদর দপ্তর খালি করে কর্মীদের দূর থেকে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছে। কোম্পানি বা সৌদি সরকার এই নির্দেশ সম্পর্কে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি, ফলে বিষয়টি এখনো একক সূত্রের বরাতে জানা গেছে।

সংঘাত এখন প্রায় আট মাস ধরে চলছে। চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা শুরু করার পর ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল কার্যত সীমিত করে দেয়। ওই সময় তেলের দাম ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায় এবং এপ্রিলে তা ১২৬ ডলার পর্যন্ত ওঠে। মে মাসের শেষ দিকে দাম আবার ১০০ ডলারের নিচে নামে এবং জুলাইয়ের শুরুতে ৭১ ডলারে ঠেকে। এরপর ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সমঝোতা স্মারক ভেঙে গেলে উপসাগরে নতুন সংঘাত শুরু হয় এবং দাম আবার ঊর্ধ্বমুখী হয়।

জাহাজ পর্যবেক্ষণ সংস্থা কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, পাইপলাইনে রেড সাগর ও ওমান উপসাগর হয়ে তেল পরিবহন বাড়ায় উপসাগরীয় দেশগুলোর রপ্তানি এখন যুদ্ধের আগের পর্যায়ে ফিরেছে। আল জাজিরাও একই তথ্য দিয়েছে। তবে হরমুজ দিয়ে সরাসরি পরিবহন এখনো যুদ্ধপূর্ব পর্যায়ের নিচে, আর সম্প্রতি জাহাজে হামলা বাড়ায় বাজার আবার অস্থির হয়ে উঠেছে।

ইরানের সামরিক নীতি নিয়েও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। আইআরজিসির মুখপাত্র হোসেইন মোহেবি বলেছেন, তাদের প্রতিরক্ষা নীতি আগে ‘প্রতিরক্ষামূলক’ ছিল, এখন তা ‘আক্রমণাত্মক ও অপ্রতিসম’। তাঁর দাবি, জুন ২০২৫-এর ১২ দিনের যুদ্ধের পর ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র মজুত দেড় গুণ বেড়েছে; অবশ্য সংখ্যা বা বিস্তারিত তথ্য তিনি দেননি।

কূটনৈতিক সমাধানও সহজ হচ্ছে না। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ওয়াশিংটন এখন তেহরানের সঙ্গে আলোচনা করছে না এবং ‘শিগগিরই’ কোনো একটি পরিণতি আসবে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, শান্তি চুক্তি অত্যন্ত কঠিন এবং ইরানকে হরমুজে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা বন্ধ করতে হবে। অন্যদিকে ইরান সাত দিনের একটি প্রস্তাব দিয়েছে, যেখানে হরমুজে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার শর্ত হিসেবে ইরানের বন্দর অবরোধ শেষ করা, নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা এবং জব্দ করা সম্পদ ছেড়ে দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।

বিশ্ববাজারে এই অস্থিরতার প্রভাব শেয়ারবাজারেও পড়েছে। ইউরোপের স্টক্স ৬০০ সূচক ১ শতাংশ, ব্রিটেনের ফুটসি ১০০ শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ কমেছে। এশিয়ায় জাপানের নিক্কেই ২২৫ ২ দশমিক ৭ শতাংশ, দক্ষিণ কোরিয়ার কসপি ৩ দশমিক ৫ শতাংশ এবং হংকংয়ের হ্যাং সেং ৩ শতাংশ পড়েছে। জ্বালানি ব্যয়ের চাপে এ বছর লোকসানের আশঙ্কা জানিয়ে আমেরিকান এয়ারলাইনসের শেয়ারও প্রাক-বাজারে প্রায় ৪ শতাংশ কমেছে। কোম্পানিটি ‘ঐতিহাসিক জ্বালানি ব্যয়ের চাপের’ কথা বলেছে।

বাংলাদেশের জন্য এই মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দেশটি জ্বালানির প্রায় ৯২ শতাংশ আমদানি করে। গত ২১ সেপ্টেম্বর সরকার চারটি প্রধান জ্বালানি পণ্যের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়ায়। নতুন দামে ডিজেল ১৩৫ টাকা, অকটেন ১৬৫ টাকা, পেট্রল ১৬০ টাকা ও কেরোসিন ১৫৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়। ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই সময় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) জানায়, মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত তাদের লোকসান দাঁড়িয়েছে ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা। সরকারের হিসাবে, দাম বাড়ানোর আগে ডিজেল বিক্রিতে লিটারপ্রতি প্রায় ৮৯ টাকা লোকসান হচ্ছিল।

জ্বালানির মধ্যে ডিজেলের ভূমিকা সবচেয়ে বড়। বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে প্রায় ৪৩ লাখ ৫০ হাজার টন ডিজেল ব্যবহৃত হয়, যা মোট জ্বালানি ব্যবহারের প্রায় ৬৪ শতাংশ। এর মধ্যে পরিবহনে যায় প্রায় ৬০ শতাংশ, কৃষি সেচে ১৫ শতাংশ, বিদ্যুৎ উৎপাদনে ১০ শতাংশ এবং শিল্পে ৫ শতাংশ। তাই আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে জাহাজভাড়া ও বীমা খরচ, আমদানি ব্যয় এবং পরিবহন খরচে চাপ পড়ে।

এখনো যা স্পষ্ট নয়: সৌদি আরব ও আরামকোর নির্দেশ সম্পর্কে আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ আসবে কি না, হামলায় প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি কত, হরমুজ দিয়ে সরবরাহ স্বাভাবিক থাকবে কি না এবং যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল নতুন সামরিক পদক্ষেপ নেবে কি না। বাংলাদেশ আরেক দফা জ্বালানির দাম বাড়াবে কি না, সে বিষয়েও সরকার কিছু জানায়নি।

আগামী দিনে আইআরজিসি, মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর ও সৌদি কর্তৃপক্ষের পরবর্তী বিবৃতি, জাহাজ চলাচলের নতুন তথ্য এবং বিপিসির অর্থায়ন পরিস্থিতি নজরে রাখতে হবে। এসবই ঠিক করবে, এই দর বৃদ্ধি কয়েক দিনের অস্থিরতা নাকি দীর্ঘমেয়াদি মূল্যবৃদ্ধিতে পরিণত হয়।